Loading...

ফ্রেঞ্চ ডান্সিং প্লেগ: নাচতে নাচতে মৃত্যুর মুখে


ছবি: ইডি টাইমস ছবি: ইডি টাইমস

নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে তাতা থৈ থৈ।

কবির ভাষার মতো জন্ম মৃত্যু আমাদের পাছে পাছে ঘুরে বেড়ায় । কিন্তু মৃত্যু যদি নাচিয়ে ছাড়ে? হ্যাঁ, এমনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল বিশ্বের বুকে, যেখানে মানুষ নেচেই প্রাণ দিয়েছিল। এই অদ্ভুত মৃত্যুর কথা জানতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৫১৮ এর ফ্রান্সে।

নদীর তীরের এক শহর স্টার্সবার্গ। তখন সেখানে জুলাইয়ের গরম। শহরের বাজারের রাস্তাটা ধরে হঠাৎ কোত্থেকে এক মহিলা নাচতে নাচতে চলে এলো। সেই নাচা যেন থামেই না। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর হতে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা হতে রাত গড়িয়ে ভোর। চলছে তো চলছেই। বর বারণ করে, কোনো শোনা নেই। কিন্তু কেউ কি জানে ও  বেচারি যে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নাচ থামবার !

পা ফুলে গেছে, হাতে পায়ে জমে গেছে রক্ত। কিন্তু কিছুতেই থামতে পারছে না ফ্রাও। পায়ে ব্যাথা তো ঠিকই পাচ্ছে, এভাবে নেচে যাবার জন্যে পাচ্ছেন লজ্জা, ওদিকে পেটে জ্বলে যাচ্ছে খিদের আগুন, তবু থামছে না নাচ। সর্বাঙ্গ ভিজে যাচ্ছে ঘামে। এ কি জ্বালা !

শহরজুড়ে সকলের বড় কৌতূহল। কেন নাচছে এই মহিলা। কিন্তু এক দৈববলে আশেপাশের লোকের মধ্যেও ছড়িয়ে গেলো নাচ। সবাই ফ্রাও ট্রফিয়ার মতো হাত পা ছুড়ে নেচে যাচ্ছে।

টানা ছয়দিন চলল ফ্রাওয়ের নাচা। তারপরে হঠাৎ করে আচমকা হৃদযন্ত্রটা থামিয়ে দিলো সংকোচন - প্রসারণ। দেহটা লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।

এখানেই শেষ নয়। ততদিনে ফ্রাও ট্রফিয়ার মতো অনেক নাচিয়ে গজিয়ে গেছে স্টার্সবার্গে। যেমনি নাচা বাড়ল, তেমনি বাড়তে থাকলো মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়া মানুষের সংখ্যা। রোজই দলে জুটে যায় ১৫ জন করে। সেই মাসেই আক্রান্ত ছাড়ালো ৪০০ এর উপরে।

নগর কর্তৃপক্ষ পড়লো ভয়ানক মুশকিলে। কেমন করে ছাড়ানো যায় এই পাগলাটে নাচের হিড়িক ! তারা ভাবলেন আরো বেশি নাচের ব্যবস্থা করে যদি এই নাচ সাড়ানো যায়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নগরে বসানো বড় নাচের আসর । আনা হলো গাইয়ে। শহরজুড়ে বাজানদারদের ছড়াছড়ি, সকলে ঢোল, বাঁশি, বেহালা নিয়ে একদম প্রস্তুত। আসর শুরু হতেই সব পাগলা নাচিয়ে হাজির। কিন্তু যেমনটি ভাবা হলো, ঘটলো তার ঠিক উলটো। আস্তে আস্তে সবই উপরের যাওয়ার পথ ধরলো।

আগস্ট ছাড়িয়ে সেপ্টেম্বরে ঠেকলো। কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রীর সংখ্যা আর নামে না।

নাচের আসর দিয়ে বাঁচানো গেলো না, এইবারে নগরপাল বুঝলেন, এই তো যে সে ঘটনা নয় , কোনো দৈব অভিশাপ নয়তো! সেসময় সেন্ট ভাইটুকে লোকে ভারী সমীহ করে চলতো। সবাই ভাবতে শুরু করলো কোনো কারণে তিনি স্টার্টবার্গবাসীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে শাপ বর্ষণ করেছেন।

এমনই ছিল ফ্রান্সের ড্যান্স প্লেগের গল্প। এখানে নামটা প্লেগ হলেও রোগটা প্লেগের ধারকাছ দিয়ে যায় না। এখানে প্লেগ বলতে মহামারীকে বোঝায়। যাই হোক, এটা আদতে মধ্যযুগীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো অভিশাপ ছিল না। ছিল একটি মৃগী জাতীয় রোগ। কেন একটি মৃগী রোগে প্রাণ গেলো অগুনতি মানুষের সেই নিয়ে এখনো অনেক অনেক তত্ত্ব প্রচলিত। কিন্তু আসল কারণটি নিয়ে কেউই একমত নন।

একটি জনপ্রিয় মত হলো, ওই সময়ে রাইয়ে (ইউরোপে চাষ হওয়া যব জাতীয় ফসল) আরগট ছত্রাকের মড়ক লেগেছিল। এই রাইয়ের রুটি যারাই খেয়েছে ওদেরই খিঁচুনি হয়ে এই নাচুনি রোগে ধরেছে। আবার সেই সময়ের রোগতত্ত্বে হিউমরাল থিওরি প্রচলিত ছিল , যাতে বলা হয় শরীরের নানা রকম রাসায়নিক বিকারেই রোগের উৎপত্তি। এই বিদ্যায় বিশারদরা বলে যে নাচুনি রোগীদের গা গরম হয়ে রক্ত উষ্ণ হয়ে গেছিল, তাই তারা মারা গেছে। রসায়ন তত্ত্ববিদ প্যারাসেলসাস বলেন , শরীরের লাফিং শিরা উসকে শরীরে সুড়সুড়ি জাগিয়েছিল। তাই বেঁধেছিল হাত পা নাড়ানো মৃগী।

তবে এ যুগের মেডিকেল ইতিহাসবিদ জন ওয়েলার তার বই 'এ টাইম টু ডান্স, এ টাইম টু ডাই ' এ বলেন অতিরিক্ত চাপে এই মানসিক বিকারের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল , যা একটা সময় ভুক্তভোগীর মধ্যে একধরনের হ্যালুসিনেশনের জন্ম দিয়েছিল , আর তাতে সে নাচা থামাতে পারছিল না আর শরীরের সহন মাত্রা ছাড়িয়ে মারা পড়ছিল।

ইতিহাস জানায় শুধু স্টার্সবার্গ নয়, ফ্রান্স ও জার্মানি ঘেষে রিভাইন নদী যেখান দিয়ে বয়ে চলে তার অনেক অঞ্চলেই দেখা গিয়েছিল ড্যান্সিং প্লেগ।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৪র্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic