ফোনের পর্দার বাইরের জগতটাও দরকারি


অদ্রি বর্মন | Published: August 31, 2021 17:07:49 | Updated: August 31, 2021 19:50:33


Representational Image

এই দুনিয়া মায়ার জালে বান্ধা...

সকালে ঘুম ভেঙে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুম আসার আগপর্যন্ত আমরা বর্তমানে যে বস্তুটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি, সেটি আমাদের প্রিয় মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোনের উদ্ভবটা যদিও কথা বলার জন্য শুরু হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যাকে ছাড়া এক মূহূর্ত কল্পনা করাও দুষ্কর। প্রায় মানুষই মোবাইল ফোনের মায়ার জালে আটকা পড়ে আছে, যা তারা নিজেও বুঝতে পারছে না।

মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুফলের পাশাপাশি কুফল যে দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা আমাদের অনেকেরই অজানা। দৈনন্দিন জীবনে অনেক জিনিসপত্রের আলাদা ব্যবহার কমিয়ে এনে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করেছে মোবাইল ফোন। সময় দেখার জন্য ঘড়ি, ঘুম ভাঙানোর জন্য অ্যার্লাম, হিসাব করার জন্য ক্যালকুলেটর, নিত্যদিনের ছবি তোলার ক্যামেরা ইত্যাদির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এখন মোবাইল ফোন। জিনিসের আলাদা ব্যবহার কমিয়ে সময় বাঁচিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার পরিবর্তে বেড়েছে অকারণে ফোন ব্যবহারের পরিমাণও। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের সমস্যা।

দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের ফলে দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন সমস্যা সম্মুখীন হতে হয় মানুষের। এমনই একজন শ্রীমঙ্গল শহরের বাসিন্দা দিশারি (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হয় এই ফোন নিয়ে। অফিস থেকে এসে আমার স্বামী সারাক্ষণ ফেসবুক নিয়ে বসে থাকে। এমনকি খাওয়ার টেবিলেও ফোন নিয়ে যায়। আমার মনে হয় বউ আমি না, বউ তার ফোন। ফোনের কারণে এমন দাম্পত্য কলহের ঘটনা নগণ্য নয়।

একটি শিশুর মানবিক বিকাশ গড়ে ওঠে তার মা-বাবার কাছ থেকে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে বাবা-মা দুজনেই নিত্যদিনের কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের কারণে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না শিশুদের। শিশুদের কান্না থামানোর জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে সেই মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদি ইলেকট্রনিক ডিভাইস। যার ফলে শিশুদের দৃষ্টিশক্তিতেও ছোটবেলা থেকেই অনেক ক্ষতি হচ্ছে।

জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও তরুণদের মাত্রাতিরিক্ত ফোনের পর্দায় সময় কাটালে তাদের বাইরে কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যায়, যার ফলে স্থুলতার মতো সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

বয়স যা-ই হোক না কেন, যেকোনো বয়সের মানুষ অতিরিক্ত মোবাইল স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে মায়োপিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত হলে দূরের কিছু দেখতে সমস্যা হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোয় না থাকায় ও মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারনে এই রোগে শিশু ও অল্প বয়সের মানুষরা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

অন্তত আঠারো মাস বয়সের আগে শিশুদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্ক্রিন দেখানো উচিত নয়। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা বলেছেন, যেসব শিশুদের এর আগে থেকে এসব স্ক্রিন দেখানো হয়, তাদের কথা বলা শিখতে ও মানুষের সাথে মিশতে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদুর রহমান বিবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদন বলেন, মানুষ যত বেশি মোবাইল স্ক্রিনের সামনে থাকে, তার মধ্যে একপ্রকার পরোক্ষ গ্রহীতার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে তার সামনে যদি এমন সব কন্টেন্ট থাকে, যা নিয়ে তার বিশেষ কিছু চিন্তা করতে হয় না এবং তা যদি সে গ্রহণ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তার স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা কমে যায়। আর একসময় সে বিভিন্ন জটিল কাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়।

শ্রীমঙ্গলের ছেলে জয়দ্বীপ চৌধুরী পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার। তিনি বলেন, কাজের জন্য ফোন ব্যবহার করতে হয়। অনেকসময় দেখা যায় কাজের মধ্যেই কেউ এসএমএস দিয়েছে বা নোটিফিকেশনের শব্দ এসে বারবার মনোযোগ নষ্ট করছে। সে সময় যদি একবার সেগুলো দেখতে যাওয়া যায়, তাহলে সেখান থেকে ফিরে আসতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে। এর ফলে কাজের গতি অনেকটাই কমে যায়।

মানুষ সামাজিক জীব। তবে, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও দেখা যাচ্ছে, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যে যার মতো মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত আছে। এভাবে একের প্রতি অপরের আন্তরিকতার সুতোও কোথায় যেন ঢিলে হয়ে যাচ্ছে।

এই সকল সমস্যা সমাধানের একটাই উপায়, মোবাইল ফোন ও স্ক্রিন টাইমের ব্যবহার কমিয়ে আনা, নিজ পরিবারের সাথে সময় কাটানো, বই পড়ায় মনোযোগী হওয়া, বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়া এবং অবসর সময়ে নিজের শখের কাজে সময় ব্যয় করা।

মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী অনামিকা শর্মা বলেন, কল আসা-যাওয়া ব্যাতীত খুবই কম সময় ফোন ব্যবহার করে থাকি আমি। তিনি মনে করেন, ফোন ব্যবহার কম থাকার কারণে বিভিন্ন কাজ করতে ঝামেলা হয় না, আরাম করে কাজ শেষ করা যায়। পরিবারকে যথেষ্ট সময় দেওয়া যায়। তিনি আরো বলেন, সবাই মিলে একসাথে বসে আড্ডা দিলে পারিবারিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়।

প্রয়োজনের সময় মোবাইল ফোন না ব্যবহার করে আজকের যুগে টিকে থাকা বেশ কঠিন। তবে এই ব্যবহার যেন অতি ব্যবহারে না পরিণত হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত না ঘটায়, সেক্ষেত্রে সতর্ক হওয়াই সমীচীন। এভাবেই আমরা নিজেদের ও নিজের পরিবারকে এই আসক্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারি।

অদ্রি বর্মন বর্তমানে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে সম্মান চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। audribormon@gmail.com

Share if you like