উৎসবের আমেজের সাথে রসনাপূর্তির যোগাযোগ এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই। ধরনভেদে উৎসবের নামের সাথেই তাই জড়িয়ে যায় বিভিন্ন খাবারের নাম। এই জড়িয়ে যাবার গল্পগুলো সুতো বুনে দেয় সেসব উৎসবের ইতিকথার, কখনো আবার গল্পের ধুয়ো ধরে পড়তে হয় বিরাট ধন্দে।
এমনই এক গল্প আছে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিবস পহেলা বৈশাখ ও এক পাত পান্তা-ইলিশের। কেন বছর শুরুর দিনটি শুরু হয় কয়েক গ্রাস পান্তা দিয়েই, যেখানে অন্যান্য উৎসবে বিরিয়ানি-কাবাব-কোর্মা-কোপ্তাজাতীয় সব মোঘলাইপনার ছড়াছড়ি?
পান্তা খাওয়ার বাঙালির অভ্যেসটা অবশ্য রমনা বটমূল, মঙ্গল শোভাযাত্রা ইত্যাদি শহুরে উদযাপনের বহু আগের। বৈশাখের রুদ্রঝড় বা খরাময় উত্তপ্ত দিনগুলোতে কৃষকের ঘরে রাতে যে ভাত বেঁচে যেত, তাতে পানি দিয়ে রেখে দেয়া হতো সকালের নাশতা হিসেবে খাওয়ার জন্য। এর সাথে কাঁচা বা শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ ও লবণ মিশিয়ে খেয়ে দিনভর পরিশ্রমের জন্য বেরিয়ে যেতেন তারা। বিভিন্ন ধরনের ভর্তার রেয়াজও ছিল। এখনো সেই খাদ্যাভ্যাস বহাল তবিয়তে বিদ্যমান।
বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে বাংলা নববর্ষের শহুরে উদযাপনে যোগ হয় পান্তা, সাথে ইলিশ ভাজা। কিন্তু এই ইলিশ ভাজা কি সেই পান্তা খাওয়া কৃষকদের বছর শুরুর সাথে যুক্ত ছিল? এ বিষয়ে একুশে টিভির একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায় লোক গবেষক শামসুজ্জামান খানের মন্তব্য, বৈশাখে খরার মাসে যখন কোনো ফসল হতো না, তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর প্রোগ্রাম অ্যাসিস্টেন্ট সুমাইয়া তালুকদার নিজে কখনো পান্তা-ইলিশ খেয়ে উদযাপন করেন না ঠিকই, তবে ছোটবেলা থেকে ফুপুদের দেখেছেন বাংলা নববর্ষের সকালটা এই খাবার দিয়ে শুরু করতে। এই পারিবারিক প্রথার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানতে পারেন যে অনেকটা অভ্যেসের বশেই এই উদযাপনের ধরন এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিয়া ফাতিমা মনে করেন, বৈশাখের এ সময়টায় ইলিশ খাওয়াটা যে আমাদের দেশের ইলিশ প্রজননের জন্য কতটা ক্ষতিকারক, এই বোধটা জন্মানোর আগে পান্তা-ইলিশ খাওয়া হতো প্রতি বছর এবং খুবই আনন্দ নিয়ে খেতাম। চারপাশে উৎসব উৎসব অবস্থা এবং এসবের মাঝে নিজেকে জুড়ে দিতে পান্তা-ইলিশের বিকল্প খুঁজে পাওয়াটা একটু মুশকিল হতো।
তবে পান্তা-ইলিশ আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির মতো কিছু নয়। এর শুরুই হয়েছে কয়েক দশক আগে। সার্বজনীন বৈশাখী একটা খাবার হিসেবে এর প্রচলন এসে গেছে, তাই স্বাদের পাশাপাশি নববর্ষের আবহটা পেতেই আগ্রহটা বেশি কাজ করতো।
হুজুগে পড়ে হোক বা তথাকথিত বাঙালি ঐতিহ্যের পরম্পরা বয়ে নেবার ধারণা থেকেই হোক, পান্তা-ইলিশ যে বেশ ভালোভাবেই আমাদের নববর্ষের রঙ-রূপের সাথে মিশে গেছে, তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জাকির হোসেন এ বছর সকালে পান্তা-ইলিশ খেয়েই শুরু করতে চান, বাড়িতে আমি নিয়মিতই পান্তা খাই, ভালোও লাগে বেশ৷ শহরে তো সবই উৎসবকেন্দ্রিক হয়, অনেকটা স্রোতে গা ভাসানো আর কী! তবে শুনেছি ভালো দাম নেয়, বেশি দাম হলে খাব না।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।