পাখির ঠোঁটের মতো দেখতে অদ্ভুত মুখোশ পড়া এই লোকটি অনেকের কাছেই পরিচিত মনে হতে পারে। ইনি হচ্ছেন একজন প্লেগ ডাক্তার। খুবই রহস্যময় একটি চরিত্র। বিভিন্ন সিনেমা, গেমস বা কার্টুনে রহস্যজনকভাবে উপস্থাপিত হতে দেখা যায় তাকে। প্লেগ ডাক্তারের এই রহস্যময় পোশাকের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস।
এক সময় ইউরোপে প্লেগ রোগের অনেক প্রাদুর্ভাব ছিল। বিশেষ করে ১৩৪৭ থেকে ১৩৭২ সাল - এই পঁচিশ বছরে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে ইউরোপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। আক্রান্ত রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশ কালো বর্ণ ধারণ করতো। তাই এই রোগকে তখন বলা হতো ব্ল্যাক ডেথ। এই রোগে মৃত্যুর হার এত বেশি ছিল যে ইউরোপের পথে ঘাটে মানুষের মৃতদেহ পরে থাকতে দেখা যেত।
১৬২৯ সালে ইতালি থেকে পুরো ইউরোপে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। প্লেগ এ আক্রান্ত হয়ে ভেনিসের অনেক মানুষ মারা যায়। এ সময় একদল ডাক্তারের আবির্ভাব ঘটে যারা অদ্ভুত পোশাকে ইউরোপের পথে ঘাটে ঘুরে বেড়াতো ও প্লেগ রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা করতো। তারা সম্পূর্ণ শরীর কালো পোশাকে আবৃত করে রাখতো, হাতে থাকতো চামড়ার গ্লাভস ও মাথায় গোল হ্যাট। তারা পাখির ঠোঁটের মত দেখতে অদ্ভুত এক মুখোশ পরে চলাফেরা করতো। ইতিহাসে তারা প্লেগ ডাক্তার নামে পরিচিত।
ডাক্তার চার্লস ডে লর্ম। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইনফেকশাস ডিজিজেস অনুযায়ী, প্লেগ ডাক্তারদের এই বিচিত্র পোশাক সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ডাক্তার চার্লস ডে লর্ম এর কাছ থেকে। ডে লর্ম ছিলেন একজন ফরাসি চিকিৎসক যিনি ফ্রান্সের রাজা ত্রয়োদশ লুই এর অধীনে কাজ করতেন। দাবী করা হয় তিনিই এই বিখ্যাত প্লেগ ডাক্তারের পোশাকটি তৈরি করেছিলেন।
প্লেগ ডাক্তাররা ইউরোপের শহরগুলোতে ঘুরে ঘুরে প্লেগ রোগে আক্রান্তদের খুঁজে বেড় করতো। প্রচলিত বিভিন্ন উপায়ে এ সকল রোগীদের চিকিৎসা হতো। বিশেষ করে যারা গরীব জনগোষ্ঠী ছিল তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হতো। এর পাশাপাশি তারা মৃতদেহগুলোকে সনাক্ত করার কাজ করতো, মৃতের সংখ্যা ও পরিচয় লিপিবদ্ধ করে রাখতো।
প্লেগ ডাক্তারদের এই অদ্ভুত অবয়বের পেছনে অবশ্য বেশ কিছু কারণ ছিল। এখন আমরা জানি, রোগব্যাধি ছড়ায় জীবাণুর মাধ্যমে৷ তখন মানুষ জীবাণু কী, সেটাই বুঝতো না। কারণ তখনো মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কার হয়নি৷ প্লেগ রোগীর শরীর থেকে এক প্রকার দুর্গন্ধ বের হতো। ইউরোপের চিকিৎসকরা ভাবতো এই দুর্গন্ধ থেকেই হয়তো রোগ ছড়ায়। দুর্গন্ধ থেকে রোগব্যধি ছড়ানোর এই তত্ত্বকে বলা হতো মিয়াজমা তত্ত্ব। ১৮৮০ সালে জীবাণু তত্ত্ব আবিষ্কারের পূর্বে এটিই ছিল তৎকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যপক জনপ্রিয় একটি ভুল ধারণা।
প্লেগ ডাক্তাররা দুর্গন্ধ এড়াতে তাদের শরীর থেকে শুরু করে মুখমন্ডল পর্যন্ত আবৃত করে রাখতো। তারা অনেকটা পাখির ঠোঁটের মতো দেখতে চামড়ার তৈরি মুখোশ পরে থাকতো। এই ঠোঁটের ভেতর ফাঁপা স্থান রাখা হতো যেখানে সুগন্ধি ফুল, শুকনো লতাপাতা, মধুসহ প্রায় পঞ্চাশ রকমের উপাদান দিয়ে ভর্তি করা হতো, যাতে করে ডাক্তার যখন কোনো রোগী দেখতে যান তখন তার নাকে যেন দুর্গন্ধ না আসে। তাদের হাতে থাকতো একটি লাঠি। এই লাঠি দিয়ে রোগী জীবিত আছে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করা হতো। অনেক সময় এই লাঠি আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হতো। মূলত প্লেগ ডাক্তারকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পুরো পোশাকটি তৈরি করা হয়েছিল।
তবে এই প্লেগ ডাক্তারদের চিকিৎসা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্লেগ রোগীদের সুস্থ করতে ব্যর্থ হতো। তাদের ভুল চিকিৎসার ফলে রোগী মারা যাওয়ার খবর তখন ঢালাওভাবে প্রচার করা হতো। প্লেগ ডাক্তারদের অনেকেরই পেশাগত কোনো যোগ্যতা ছিল না। অনেকে শুধু অর্থ ও সম্মানের লোভে চিকিৎসা পেশায় ঢুকে পরতো। তাই মানুষ এই প্লেগ ডাক্তারদের অনেকটা ভয় ও সন্দেহের চোখে দেখতো।
বর্তমানে পশ্চিমের দেশগুলোতে প্লেগ ডাক্তারকে একজন রহস্যময় ও ভৌতিক চরিত্র হিসেবেই বেশি উপস্থাপন করা হয়। পশ্চিমা সিনেমা, কার্টুন, ভিডিও গেমস ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে প্রায়ই দেখা মেলে এই রহস্যময় চরিত্রটির। ফ্রান্স ও ইতালির কার্নিভালগুলোতে প্লেগ ডাক্তারের মাস্ক পড়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন অনেকে। হ্যালোউইনের সময়ও এটি বেশ জনপ্রিয় একটি পোশাক। এখনো ভেনিসের অলিতে গলিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা মিলবে পাখির ঠোঁটের মত অদ্ভুত মুখোশধারী প্লেগ ডাক্তারের পোশাক পরা মানুষের।
সাজিদ আল মাহমুদ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন।
shajidmahmud11@gmail.com