প্রাণের দামে মেলে বাংলা ভাষা: আসামের বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদেরা


সুস্মিতা রায় | Published: February 22, 2022 16:05:17 | Updated: February 22, 2022 18:38:47


প্রাণের দামে মেলে বাংলা ভাষা: আসামের বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদেরা

মাতভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি সকলের দাবি আজন্ম। মাতৃভূমি মায়ের মতো আপন। রবি ঠাকুরের বাণীতে মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম, শিশুর মতো সকলের তাতে অধিকার।

পৃথিবীতে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা আজ প্রায় সাড়ে আটাশ কোটি। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে রক্ত স্নান করেছিল ঢাকার রাজপথ । লড়াইয়ে নেমেছিলেন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তরুণ ছাত্ররা। সালাম , বরকত , রফিক , শফিউর, ,জব্বারের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষার অধিকার। এই ভাষা আন্দোলন ছিল আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টির অঙ্কুরোদগম।

তবে বাংলা ভাষার প্রতি শুধু পাকিস্তান সরকার রক্তচক্ষু দিয়ে তাকায়নি। আরো তাকিয়েছিল আসামের কেন্দ্র সরকার। এদের করালগ্রাস হতে বাঁচতে আসামের বাংলাভাষীরা পালিয়ে যাচ্ছিলো দিগ্বিদিক। কিন্তু সবখানেই কিছু অকুতোভয় থাকেন, যারা অদম্য সাহসে বেরিয়ে পড়ে ন্যায় ছিনিয়ে আনতে।

বাংলাদেশের সাথে লাগোয়া দক্ষিণ আসামের বরাক নদী বিধৌত অঞ্চল বরাক উপত্যকা নামে পরিচিত। কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা ছিল বাংলা।

কিন্তু আসাম সরকার অবদমিত করতে চেয়েছিল বরাক উপত্যকার বাঙালিদের।

১০ অক্টোবর, ১৯৬০। মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা বৃহৎ সংখ্যক বাঙালি থাকা সত্ত্বেও ঘোষণা দেন আসামের একমাত্র ভাষা হবে অসমীয়া । ২৪ শে অক্টোবর বিধান সভায় প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।আসাম শিক্ষা পরিষদ জানান দেয় আসামে থাকতে গেলে শিখতে হবে অসমীয়া ভাষা ।

'Assam for Assamese '- (আসাম শুধু অসমিয়াদের) এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ১৯৬১ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি গড়ে ওঠে কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ। ১৪ এপ্রিল পালিত হয় সংকল্প দিবস। ২৪ এপ্রিল হতে এক পক্ষকালীন (১৫ দিন) দীর্ঘ পদযাত্রা বের করে প্রতিবাদকারীরা।

১৯৬১ সালের ১৯মে, সময়নাট্যে ইতিহাসের আবার ফিরে আসা। ২১ শে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হওয়া আরেকটি বলিদানের সাক্ষী হয় বরাক উপত্যকা।

'মোদের গরব , মোদের আশা , আ মরি বাংলা ভাষা ' - এই মন্ত্রই সেদিনও উজ্জীবিত করছিল ইতিহাসের পাতা।

বাংলা ভাষা রক্ষায় বরাকের তীরে সেদিন হরতালের ডাক দিয়েছিল বিদ্রোহীরা, সরকারি কার্যালয়ে করেছিল পিকেটিং। হঠাৎ মিছিল চলাকালে আসাম রাইফেলসের গুলিবর্ষণ শুরু হয় নির্বিচারে।

এগারোটি তাজা প্রাণ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন সেদিন। তারা ছিলেন সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, কুমুদরঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দেব, সুকোমল পুরকায়স্থ, কমলা ভট্টাচার্য ও শচীন্দ্র মোহন পাল।

তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ও একমাত্র নারী ভাষা শহীদ ১৬ বছরের বীর কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য । অদম্য কমলা সেদিন দিদির শাড়ি পরে পিকেটিং এ বেরিয়েছিল মেয়েদের দলের সাথে । মা অশ্রু চোখে এক টুকরো কাপড় হাতে দিয়ে বলেছিলেন কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়লে বেঁধে নিতে চোখে।

কমলার আর ঘরে ফেরা হয়নি। কমলার প্রাণদান গোটা বিশ্বকে জানান ভাষা শুধু পুরুষের নয়, ভাষা নারীরও। তাই ভাষা রক্ষায় আততায়ীর বুলেটেও তার সমঅধিকার।

আন্দোলনকারীরা আরো ফুঁসে ওঠে। ২০ মে বের হয় শবদেহ নিয়ে মিছিল। তাদের কোনোভাবে দমাতে না পেরে শেষমেশ সেই সরকারী ঘোষণা প্রত্যাহার হয়েছিল। বরাকের বাঙালিরা ফিরে পেয়েছিল তাদের ভাষার অধিকার।

ওরা যেন আর কেউ নয় , ৫২'এর ভাষা শহীদদের পদচিহ্নে পা ফেলে যাওয়া উত্তরসূরি। যাদের রক্তে বাংলা মায়ের শাশ্বত জ্যোতিরেখা বিশ্ববুকে আরো প্রোজ্জ্বল হয়েছে। এদের ত্যাগে আজ বাংলার আলপথ এতোখানি মসৃণ হতে পেরেছে। বাঙালি পরিচয়ে আমরা সবাই এক। বাংলাদেশ আর আসামের ভাষা আন্দোলন একই সূত্রে গাঁথা।

২০১৬ সালে আসাম ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিলচর স্টেশনের নাম ভাষা শহীদ স্টেশন করা হয়। প্রতি বছর ১৯ মে আসাম প্রদেশে পালিত হয় বাংলা ভাষা শহীদ দিবস।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com

Share if you like