ইতিহাস রচনা করলেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্যরা। গতকাল সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সংস্থাটির সাধারণ পরিষদ (জেনারেল কাউন্সিল) এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়ে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেছেন।
এই নারী হলেন নাইজেরিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী ড. এনগোজি ওকোনজো-আইওয়েলা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সিকি শতাব্দীর ইতিহাসে তিনি প্রথম নারী ও আফ্রিকান মহাপরিচালক হলেন। সংস্থাটির সপ্তম মহাপরিচালক হিসেবে আগামী ১ মার্চ থেকে চার বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। যদি আরেকদফা নবায়ন করা না হয়, তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট।
ডব্লিউটিও-র সাধারণ পরিষদের বৈঠকটি করোনাভাইরাসের কারণে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হলেও জেনেভায় সংস্থাটির সচিবালয় থেকে পরিষদের সভাপতি নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ওয়াকার এটি পরিচালনা করেন। সাধারণত ডব্লিউটিও-র সদস্য দেশগুলোর জেনেভায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা সংস্থাটির সাধারণ পরিষদে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন।
ডেভিড ওয়াকার সর্বসম্মতিক্রম নতুন মহাপরিচালক নির্বাচন ও নিয়োগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে ড. এনগোজিকে অভিনন্দন জানান।
জবাবে অনলাইন ভিডিও-তে নবনিযুক্ত মহাপরিচালক বলেন, ডব্লিউটিও-র সদস্যরা তাঁকে সংস্থাটির মহাপরিচালক নিয়োগ করায় তিনি সন্মানিত বোধ করছেন। তিনি আরো বলেন যে তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার হবে কোভিড-১৯ এর নেতিবাচক প্রভাবে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাতে যে বিপর্য় দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় সদস্যদের সাথে নিয়ে কাজ করা।
এনগোজি বলেন, যদি আমরা কোভিড-১৯ মহামারীর ধ্বংসাত্মক অভিঘাত থেকে মুক্তি পেতে চাই, তাহলে একটি শক্তিশালী ডব্লিউটিও প্রয়োজন।
নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পথটি এনগোজির জন্য অবশ্য মসৃণ ছিল না। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট ডব্লিউটিও-র আগের মহাপরিচালক রবার্তো আজেভেদো তাঁর মেয়াদপূর্ণ হওযার এক বছর আগেই পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে পদটি শূন্য ছিল। তিনি অবশ্য মে মাসেই জানিয়েছিলেন যে তিনি এ পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। তারপর থেকেই নতুন মহাপরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই সাধারণ পরিষদ দুই মাস ধরে তিন ধাপে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নতুন মহাপরিচালক বাছাই করার বিষয়ে সম্মত হয়। ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই আলোচনা শুরু হয় যা শুধু সদস্যদের মধ্যেই সীমিত ছিল। এ সময়কালে সদস্যরা আটজন প্রার্থীর বক্তব্য শোনেন। সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে তাঁরা পাঁচজনকে বেছে নেন। এরপর ২৮ অক্টোবর সাধারণ পরিষদের সভাপতি সদস্যদের জানান যে এদের মধ্যে ড. এনগোজি ওকোনজো-আইওয়েলা সদস্যদের সমর্থনের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন এবং তাঁর বিষয়ে মতৈক্য হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে ১৬৪ সদস্যের মধ্যে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতে সম্মতি জানায়নি।
বস্তুত, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ডব্লিউটিও-কে অকেজো করে দেওয়ার জন্য একের পর এক অসহযোগিতা করে যাচ্ছিল। আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগ আটকে দেওয়ার পর নতুন মহাপরিচালক নিয়োগেও আপত্তি তোলে ট্রাম্প প্রশাসন। ডব্লিউটিও-র যে কোনো সদস্য কোনো বিষয়ে আপত্তি তুললে বা বাধা দিলে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখতে হয়।
ফলে পরের কয়েকমাস মহাপরিচালক হিসেবে এনগোজির নিয়োগ চূড়ান্ত করার বিষয়টি ঝুলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এসময় আরেক প্রার্থী দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রী ইউ মিয়াং-হির প্রতি সমর্থন জানায়। তবে জো বাইডেন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মহাপরিচালক নিয়োগে সম্মতি দেওয়া হয় এবং মিয়াং-হি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে এনগোজির এই পদে অভিষেক নিশ্চিত হয়ে যায়।
এনগোজি এর আগে ২৫ বছর বিশ্বব্যাংকে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি দুই দফায় (২০০৩-০৬ ও ২০১১-১৫) নাইজেরিয়ার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা জীবনে তিনি ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
asjadulk@gmail.com