“সময়টা তখন ২০১৭ সাল। হঠাৎ করেই একদিন বাবাকে হারাই। আর এর পর থেকে আর্থিক এবং মানসিকভাবে চরম ভেঙে পড়ি। অনেকটা বাধ্য হয়েই তখন পড়ালেখার পাশাপাশি ছোটখাটো একটা চাকরিতে ঢুকি। মাঝে মাঝে খুব হতাশায় ভুগতাম এই ভেবে যে আমার সমবয়সীরা ঐ সময়টা অনেকটা আনন্দ করে কাটালেও আমাকে নিজের এবং পরিবারের হাল ধরতে জীবন সংগ্রামে নামতে হচ্ছে।
অথচ এত বছর পর এসে বুঝতে পারলাম সৃষ্টিকর্তা হয়তো আমার ভালোর জন্যই এমনটি করেছিলেন। কারণ অল্প বয়সে কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যাওয়ার ফলে আমি এখন কর্পোরেট দুনিয়াটাকে অনেকের চেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারি, যা আমার ক্যারিয়ারকে আরো সাফল্যময় করতে সর্বদা সাহায্য করে।”-এমনটাই বলছিলেন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রজেক্টের ডকুমেন্টস কন্ট্রোলার মাকছুরা করিম।
আসলে প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসই আমাদের কোনো না কোনো শিক্ষা দিয়ে যায়। শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের প্রত্যেকটি স্তরেই থাকে নিত্য-নতুন কিছু শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতার সমাহার। একজন মানুষ শৈশবে তার পরিবার-পরিজন অথবা কাছের মানুষ থেকে যে শিক্ষা অর্জন করে, সেটি তার পরবর্তী জীবনের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সোপান হিসেবে কাজ করে। এরপর জীবন যতই এগুতে থাকে, ততই যেন দীর্ঘ হতে থাকে শিক্ষা ও পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার বিষয়গুলো।
তবে চলার পথ সবসময় মসৃণ হয় না। বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে একজন মানুষকে তার লক্ষ্য অর্জনের দিকে চলতে হয়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনের কোনো বিষয়ই কিন্তু আসলে ফেলনা নয়। স্বভাবগতভাবেই মানুষ জীবনের সাফল্যগুলোকে তাদের অর্জন এবং ভালো লাগার মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। অথচ এই সাফল্য অর্জনের পেছনে ব্যর্থতাগুলোর অবদান ও কিন্তু কম নয়। কারণ, ব্যর্থতাই মানুষকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে শেখায়, যা সাফল্য অর্জনে বহুলাংশে সাহায্য করে।
এছাড়া, প্রত্যেক মানুষকেই দৈনন্দিন জীবনে কম-বেশি কঠিন সময় পার করতে হয়, যেগুলোকে জীবনের ব্যর্থতা না বললেও অনেকেই এসময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন- যার ফলে প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়। আবার অনেকের জীবনের এই সময়টিতেই জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়। মূলত মাথা ঠাণ্ডা রেখে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অনেকেই এই সময়টিকেই বেছে নিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে।
আর এই কঠিন সময় মানুষের কাছে আপাতদৃষ্টিতে একটু তিক্ত মনে হলেও এই সময়টিই আসলে মানুষকে মানসিকভাবে আরো পরিপক্ক হতে ও পরবর্তী জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিক্ষা প্রদান করে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইউসরা সুলতানা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন শিক্ষামূলক ক্লাবের সাথে নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করি। অথচ বেশিরভাগ জায়গাতেই রিজেকশন মেইল পাই। প্রথম দিকে কিছুটা ভেঙে পড়লেও পরবর্তীতে নিজের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করি এবং সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করি। এখন মনে হয় এগুলো আসলে ব্যর্থতা নয়, বরং আমার জীবনের জন্য কিছু দরকারি অভিজ্ঞতা ছিল। আসলে ব্যর্থতাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেগে থাকলে এই পরিশ্রমই একদিন জবাব দেবে।”
ব্যর্থতা বা জীবনের কঠিন সময়গুলোকে বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থেকে সেটিও কিন্তু জীবনের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন- ছাত্রজীবনে একজন শিক্ষার্থীকে দিনের বেশিরভাগ সময় তার শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে ব্যয় করতে হয়। আর এসময় পাঠ্যবই কিংবা পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগত- দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পাঠ্যবই একজন শিক্ষার্থীকে কর্মজীবন ও নৈতিকতার শিক্ষা দিলেও সামাজিক নিয়ম-নীতি ও বাস্তবজীবনের জন্য তৈরি হতে পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতটিও কিন্তু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক কিংবা সহপাঠীদের সাথে মেশা অথবা অবসর সময়ে বন্ধুদের সাথে কিছুটা মজার সময় কাটানো- এই সবকিছুই কিন্তু আপনাকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে শিখাবে।
ছাত্রজীবনের পরেই যে সময়টির কথা উল্লেখ করতে হয়, সেটি হল কর্মজীবনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস আর এর পর পরিবারের দায়িত্ব- এসবকিছুই আপনাকে বাস্তবতা সম্পর্কে অনেক শিক্ষা দিয়ে যাবে। কারণ, এই কর্মজীবনে আপনি একজন জীবনযোদ্ধার পাশাপাশি একজন দায়িত্ববান পিতা বা মাতা কিংবা পরিবারের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।
‘আয় বুঝে ব্যয় কর’- এই কথাটির সাথে এই সময়টিতেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত হওয়া যায়। কীভাবে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে নিজের এবং পরিবারের ছোট-বড় চাহিদাগুলোকে মেটাতে হয় কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছুটা হলেও কষ্টার্জিত অর্থকে সঞ্চয় করতে হয়- সেই শিক্ষা আপনি এই সময়টিতেই পাবেন।
তবে তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষা অর্জনের পথে প্রযুক্তির অবদান কিছুতেই বাদ দেওয়া যায় না। যেকোনো তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই হাতের নাগালে পাওয়া, কিংবা প্রিয় মানুষগুলোর সাথে যোগাযোগ করতে পারার সুযোগ কিন্তু আপনি এখন অতি সহজেই পাবেন।
আর করোনা মহামারির এই সময়ে শিক্ষার্থীরাও এখন তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের সহায়ক হিসেবে তথ্য-প্রযুক্তিকে তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী করে নিচ্ছে। তবে তথ্য-প্রযুক্তির প্রতি অনেকেই এখন অতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে, যা মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। তবে এসব নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারলে এই ডিজিটাল যুগ আমাদের জন্য আশীর্বাদই বলা যায়।
জীবনের কোনো স্তরই অপ্রয়োজনীয় নয়। প্রতিটি স্তরে অর্জিত শিক্ষাই আমাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগে। শিব খেরা যেমন বলেছিলেন, “একটি নষ্ট ঘড়িও দিনে দু’বার সঠিক সময় দেখায়”, ঠিক তেমনি আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ঘটনাই আমাদেরকে কোনো না কোনো বার্তা দিয়ে যায়। তাই প্রাত্যহিক জীবনে হতাশ না হয়ে কঠোর পরিশ্রম ও উদ্যমের মন মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে জীবনে সফলতা অবশ্যম্ভাবী।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। tanjimhasan001@gmail.com
