চারদিকে মিষ্টি রোদের আভা এবং রাতের আকাশে অন্ধকার ও কুয়াশার চাদর ভেদ করে আসা চাঁদের মায়াবী আলো- এসবকিছু মনকে কিছুটা হলেও ভাবুক করে তোলে। দূর আকাশে সকাল-সন্ধ্যা কুয়াশার আভাস জানিয়ে দেয় শীত আসছে।
আবহাওয়াবিদরা আগেই বলেছিলেন যে এবছর অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা আগে শীত পড়বে। বাস্তবেও ঠিক তেমনটাই হলো। নভেম্বরের শুরু থেকেই বৃষ্টির সাথে সাথে প্রকৃতিতে শীতের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে শীতের মাত্রাও।
অন্যান্য বছরের ন্যায় এ বছরও বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে কিছুটা আগে শীতের আমেজ দেখা যাচ্ছে। ‘হিমালয় কন্যা’নামে খ্যাত পঞ্চগড় জেলা ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে এখন থেকেই বেশ কুয়াশা পড়ছে, ধীরে ধীরে বাড়ছে শীতের তীব্রতাও।
হেমন্তের শেষে হিমেল হাওয়ায় কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে শীত তার আগমনী বার্তা সবাইকে জানিয়ে দেয়। প্রকৃতি এসময় কিছুটা রূক্ষ হয়ে ওঠে, নদী-নালা ও খাল-বিলে পানি কমে যায়। ঝরতে থাকে গাছের পাতা।
তবে নানারকম সুস্বাদু শাকসবজি এবং বিচিত্র কিছু ফুলের সমাহার এই ঋতুটিকে সবার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
শীতের সবচেয়ে বেশি আমেজ পাওয়া যায় গ্রামে। ভোর থেকে শুরু করে সকালের প্রায় অনেকটা সময় চারপাশ কুয়াশার চাদরে আবৃত থাকে। অনেকসময় কুয়াশা এতটাই বেশি থাকে যে চারপাশের পরিবেশ অনেকটাই আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আর এই ঠান্ডার মধ্যে অনেকেই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। তবে শীতের সময় প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততাতা একটু দেরীতেই শুরু হয়।
শীত এবং শীতের পিঠাপুলি গ্রাম-বাংলার আবহমানকালের ঐতিহ্য। শীতের পিঠাগুলোর মধ্যে ভাপা পিঠা, নারিকেলপুলি, দুধপুলি, পোয়া, চিতই ইত্যাদি পিঠাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে ভাপা পিঠা ছাড়া শীতকাল যেন কল্পনাই করা যায় না। শীতের সকালে ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা যেন শীতের আমেজকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। খেজুর গুঁড়ের মধুমাখা স্বাদ তো থাকছেই।
তবে গ্রামে শীতের আরেকটি রেওয়াজ দেখা যায়- খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে সবাই মিলে আগুন পোহানোর দৃশ্য। আবার দলবেঁধে রোদ পোহানোর দৃশ্যটাও গ্রামে এ সময়টাতে অহরহ দেখা যায়।
এছাড়া শীতকালে গ্রামের টাটকা সব শাকসবজির শীতকালকে সবার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। এসময় বাজারে যত শাকসবজি পাওয়া যায় বছরের অন্য কোনো সময় সেরকম পাওয়া যায় না।
শহরেও শীতের সময় অন্যান্য সময়ের চেয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। তবে শহরে শীতের তীব্রতা গ্রামের থেকে কিছুটা কম।
চারদিকে সুউচ্চ দালানকোঠা আর স্থাপনাগুলো যেন শীতকে নগর জীবনে ঢুকতে বাঁধা দেয়। গ্রামের মাটির চুলার পাশে বসে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসে ভাপাপিঠা খাওয়ার আমেজ না থাকলেও রাস্তার পাশে ধোঁয়া ওঠা ভাপাপিঠা খেয়ে সে আমেজের কিছুটা টের পাওয়া যায়।
শহরে শীতেও জীবন ছুটে চলে আগের নিয়মে। শীতের সকালে কম্বল গায়ে আয়েস করে ঘুমাতে ইচ্ছা হলেও কর্মজীবীদের হাজিরার মাফ নেই।
কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাস্তা দিয়ে রোজকার অফিসে যাওয়া বা সহকর্মীদের সাথে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই যেন এখানকার মানুষরা শীতের আমেজ খুঁজে পায়। আবার অনেকে কিছুটা সময় বের করে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়েন।
মুদ্রার অপর পিঠে দরিদ্র-ভাসমান মানুষের দুর্দশার শেষ নেই শীতকালে। শৈত্যপ্রবাহ চলাকালে অনেকসময় দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষজন কাজে যেতে পারেন না। হাড়-কাঁপানো শীত তাদের জন্য রাতগুলোকে দীর্ঘ করে তোলে।
শীত আসে কারো কাছে কম্বল মুড়ি দিয়ে মিষ্টি আলস্যে ডুবে থাকার সময় হিসেবে, কারো কাছে আসে গুনে গুনে দিন পার করার কঠিন বাস্তবতা হিসেবে। তাই প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষের উচিৎ শীতকালে সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ানো।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com
