মানুষ মাত্রই খেতে ভালোবাসে। কেউ কেউ আবার প্রচন্ড রকম বা ব্যাপক পরিমাণে খেতে পছন্দ করে। লোকে মানুষের এমন অভ্যাসকে হাসি মুখেই গ্রহণ করে। তবে স্বাভাবিক খাবার নয় এমন কিছু খাওয়ার প্রতি তীব্র ঝোঁক বা অভ্যাসকে ঠিক স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা যায় না।
সংখ্যার হিসেবে নগণ্য হলেও এমন অনেকে রয়েছেন যাদের স্বাভাবিকের তুলনায় অতিমাত্রায় বরফ খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এটি একটি বিশেষ ধরনের রোগ যাকে বলা হয় প্যাগোফেগিয়া। প্যাগোফেগিয়ায় আক্রান্ত একজন রোগী বরফ চিবিয়ে খাওয়ার প্রতি তীব্র আকর্ষণবোধ করেন এবং নিয়মিত একসাথে প্রচুর বরফ খেয়ে থাকেন।
সকলেই তো কমবেশি বরফ খেয়ে থাকে তবে কেউ কেউ কেনো অস্বাভাবিক মাত্রায় বরফ খাওয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে উঠে?
আয়রন স্বল্পতাজনিত রক্তশূন্যতা
আয়রন স্বল্পতাজনিত রক্তশূন্যতার কারণে প্যাগোফেগিয়া হতে পারে। ২০১৪ সালে জাপানে একটি গবেষনায় ৮১ জন আয়রন স্বল্পতাজনিত রক্তশূন্যতা রোগীর সাথে তাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কথা বলা হয়। আলোচনা শেষে দেখা যায়, এর মধ্যে শতকরা ১৬% রোগী প্যাগোফেগিয়ায় আক্রান্ত।
ক্যাথেরিন ব্রুম, তিনি জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের একজন হেমাটোলজিস্ট। তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমার অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই দেখেছি যারা আয়রন স্বল্পতায় ভুগছে তাদের প্যাগোফেগিয়ার সমস্যা রয়েছে।
মনস্তাত্বিক সমস্যা
টার্কিশ জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটি কেস স্টাডির তথ্য অনুযায়ী, ৪৪ বছর বয়সী একজন নারী দীর্ঘদিন যাবত হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। সমস্যাটি শুরু হয়েছিল যখন তার বয়স ৩৩ বছর। বিষণ্ণতা এবং দাম্পত্য কলহ থেকে তার মানসিক যাতনা শুরু হয়। সমস্যার তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বরফের টুকরো খাওয়ার প্রতি তিনি এক অদ্ভূত আগ্রহ বোধ করতে শুরু করেন।
ব্যাপারটি তিনি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। তিনি বরফ বা বরফ কুঁচিযুক্ত প্রচন্ড হিম শীতল ঠান্ডা পানীয় খেতে শুরু করলেন এবং দেখলেন যে বরফ খাওয়ার পর তিনি এক ধরনের শান্তি অনুভব করেন। তার এই বিষয়টি ভালো লাগে! শুরুতে তিনি প্রতিদিন প্রায় ২৫০-৫০০ গ্রাম বরফ খেতে আরম্ভ করলেন এবং সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এই পরিমাণ ক্রমশ যেন বাড়তে থাকে। একটা সময় তিনি প্রতিদিন ১০-১২ কেজি করে বরফ খেতে থাকলেন, যা কেবল অস্বাভাবিকই নয় বরং স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ ক্ষতিকর প্রমাণ হয়।
ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা
শরীরে ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা থাকলে প্যাগোফেগিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
মুখের শুষ্কতা
অনেকের মুখ ঘন ঘন শুকিয়ে যায়। মুখের শুষ্ক ভাব দূর করতে তাই কেউ কেউ বরফ চিবিয়ে খেতে অভ্যস্ত পড়েন। উদ্দ্যেশ্য মুখের শুষ্কতা রোধ হলেও বারবার একই কাজ করার ফলে একসময় মানুষ বরফ খাওয়ার প্রতি অনেকটা আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে অবশ্য মনস্তাত্বিক কারণও উল্লেখযোগ্য প্রভাবক হিসেবে থাকে।
এই প্রধাণ কারণগুলির পাশাপাশি প্যাগোফগিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য দায়ী আরো কিছু ঝুঁকির কারণ রয়েছে, যেমন- নিজের শারীরিক গঠন বা চেহারা নিয়ে মনের মধ্যে ক্ষোভ বা দুঃখ, উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা, কোনো ঘটনায় আকস্মিক মানসিক আঘাত, বুলিইং-এর শিকার হওয়া, পরিবারে পূর্বে কারো এমন অভ্যাস, আত্মসম্মান বোধের অভাব বা গর্ভাবস্থা। এই কারণগুলো একজন স্বাভাবিক মানুষকে এই অস্বাভাবিক অভ্যাসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্যাগোফেগিয়ার ফলে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে, যেমন-দাঁতের সমস্যা, হৃদরোগ, গর্ভাবস্থাকালীন জটিলতা এবং সংক্রমণ।
এই রোগ কি নিরাময় সম্ভব?
এই এই রোগের চিকিৎসা কিছুটা সময় সাপেক্ষ এবং রোগীর সাথে নিয়মিত কাউন্সেলিং করতে হয়। রোগী ভেদে চিকিৎসক যে কারণ খুঁজে পাবেন সেই অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রদান করা হয়ে থাকে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com