করোনা মহামারীর পরে যখন পুরো পৃথিবী শিল্পখাতের উন্নয়নের দিকে ঝুঁকছে ঠিক সেই সময় আলোচনায় আসছে আরেক মহা সংকট। টাকা পয়সা বা ব্যাংক রিজার্ভ নয়, বরং এনার্জি বা শক্তির সংকট।
পুরো পৃথিবীতে কয়লার সংকট আজকের কোন মহামারী থেকে কম নয়। পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট শক্তির সিংহভাগ আসে কয়লা বিদ্যুৎ থেকে। এমনকি ভারতের কিছু গণমাধ্যম থেকে বলা হচ্ছে তাদের কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুটিকয়েক দিনের কয়লা মজুদ আছে। এই অবস্থা শুধু ভারতেই নয়, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর আরো অনেক উৎপাদনশীল দেশ আজ ফসিল ফুয়েলের এক আশু সংকটের মুখোমুখি।
ফসিল ফুয়েল বা খনিজ জ্বালানি
কয়লা মূলত একটি খনিজ পদার্থ, অর্থাৎ খনি থেকে উত্তোলন করে জ্বালানিতে পরিণত করতে হয়। যেমন করতে হয় পেট্রোল, ডিজের, কেরোসিন থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি। বলাই বাহুল্য, এসব জ্বালানির মজুদ সীমাবদ্ধ। আমরা বর্তমান যে হারে খনিজ জ্বালানি ব্যাবহার করছি, এর পরিমাণ অব্যাহত থাকলে আনুমানিক ২০৬০ সাল নাগাদ বর্তমান মজুদ শেষ যাবে।
বিকল্প যেসব শক্তির উৎস নিয়ে কাজ হচ্ছে
আমাদের এই প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার কথা বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের কাছে অজানা নয়। তাই তারা অনেক আগে থেকে বিকল্প শক্তির সন্ধ্যান করছেন।
বিকল্প শক্তি হিসেবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পারমাণবিক শক্তি। পারমাণবিক শক্তি উৎপন্ন হয় কিছু তেজস্ক্রিয় মৌল থেকত, যেমন-ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম, রেডিয়াম ইত্যাদি। পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল অতি অল্প পরিমান ভরের মৌল থেকে বিশাল পরিমান শক্তি উৎপাদন করা যায়। যেটা আইন্সটাইন তার বিখ্যাত E=mc2 সুত্রে প্রমাণ করেছেন।
কিন্তু পারমাণবিক শক্তির ও রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা, এটিও অন্যান্য খনিজ জ্বালানির মতোই সীমিত। সুতরাং, অসীম সময় জুড়ে পারমণবিক শক্তি ব্যাবহার করা সম্ভব নয়। তার সাথে রয়েছে পরিবেশের ঝুঁকি। বিগত শতকের রাশিয়ার চেরনোবিল এবং এই শতকের জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, পারমানবিক শক্তি শক্তির বড় উৎস হতে পারে কিন্তু তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া এখনো পুরাপুরি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
সৌর শক্তি
বিকল্প শক্তির উৎস নিয়ে গত শতাব্দীর শেষ থেকে এখন পর্যন্ত বেশ চমৎকার কিছু গবেষণা হয়েছে; তার মধ্যে উল্ল্যেখ্যোগ্য সৌর শক্তি। সোলার প্যানেলের ওপর সূর্যের আলো পড়লে তা ফটোতড়িত প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তবে এখানেও কিছু না কিছু সমস্যা রয়েই যায়, যেমন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সূর্যের রশ্মির ওপর নির্ভর করে। এজন্য রাতে বা মেঘলা দিনে সোলার প্যানেল থেকে খুব কম শক্তি আহরণ করা সম্ভব। তাছাড়া এই শক্তি সঞ্চয় করতে ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। বর্তমান প্রযুক্তিতে ব্যাটারি এখনো ব্যয়বহুল এবং কম নির্ভরযোগ্য।
বৈদ্যুতিক গাড়ি
বর্তমানে নামীদামী অনেক কোম্পানি তাদের গাড়িগুলোকে ইলেকট্রিক যানে রূপান্তরিত করছে; এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্যেখযোগ্য নাম টেসলা। তাছাড়া অনেক বিখ্যাত অটোমোবাইল কোম্পানি তাদের প্রথাগত আই.সি ইঞ্জিন বা তেলে চলা ইঞ্জিন থেকে আরো কার্যকর ইলেক্টিক মোটর চালিত গাড়ির দিকে ঝুঁকছে। তার ভেতর ফোর্ড, বিএমডাব্লিউ, ভারতের টাটা, মাহিন্দ্রা উল্লেখ্যোগ্য। জাপানের টয়োটার মত কিছু কোম্পানি তেলের সাথে ব্যাটারিচালিত প্রযুক্তি বা হাইব্রিড কার নিয়ে কাজ করছে, যা অনেকখানি সফলতার মুখ দেখেছে।
তবে ইলেকট্রিক ভেহিকেল কি ভবিষ্যতে পরিবহনের প্রযুক্তি হতে পারে?
যদিও অনেক বড় বড় গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইভি বা ইলেক্ট্রি্ক ভেহিকেল নিয়ে গবেষণা এবং বাজারজাত করছে। তবে এগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর পেছনেও রয়েছে বেশ কিছু কারণ, যেমন একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল ফুল চার্জ নিতে গড়ে ৬-৭ ঘন্টা সময় নেয় এবং সম্পূর্ণ চার্জিত অবস্থায় কোম্পানিভেদে ১০০-৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। অন্যদিকে, ফসিল ফুয়েল কার (যেমন পেট্রোল, ডিজেল চলিত গাড়ি) সম্পূর্ণ তেল ভরতে ৫-১০ মিনিট সময় নেয় এবং ইভি'র থেকে একবার রিফিলে বেশি পথ চলতে পারে।
অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির শক্তি সঞ্চিত থাকে ব্যাটারির মধ্যে। ব্যাটারির ওজন ও এনার্জির অনুপাত ফসিল ফুয়েল থেকে কম ( অর্থাৎ এক কেজি ব্যাটারি তে গাড়ি যত পথ অতিক্রম করবে এক কেজি পেট্রোল বা ডিজেলে তার চেয়ে বেশি পথ অতিক্রম করা সম্ভব)। তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে ব্যাটারির ধারণ ক্ষমতা কমে আসে, ফলে দুই এক বছর পরপর ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হয় যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যেটা কিনা হাইব্রিড গাড়ির জন্যও সত্যি।
হাইড্রোজেন চালিত গাড়ি
বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে হাইড্রোজেন গ্যাস বেশ বড় ভূমিকা রাখতে চলেছে। হাইড্রোজেন আমাদের বায়ুমন্ডলে স্থিত একটি গ্যাস; যেটি অক্সিজেনের সংস্পর্শে শক্তি হিসেবে তাপ এবং পানি উৎপাদন করে। বর্তমানে জাপানের টয়োটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হিউন্দাই সহ আরো বেশ কিছু বড় বড় অটোমোবাইল কোম্পানি হাইড্রোজেন সেল চালিত গাড়ি বাজারজাত করছে। শুধুমাত্র ২০২০ সালের ডিসেম্বরে পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৩০ হাজারের ওপর হাইড্রোজেন সেল চালিত গাড়ি বিক্রি হয়েছে।
হাইড্রোজেন সেল অন্য যেকোনো বৈদ্যুতিক ব্যাটারির মত কাজ করে। এখানে জ্বালানি হিসেবে কম্প্রেসড বা তরল হাইড্রোজেন ব্যবহার করা হয়। যা বাতাসে উপস্থিত অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে বিদ্যুৎ এবং কিছু তাপ উৎপন্ন করে। যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর সঞ্চালনের কাজে।
তবে অন্য সব বিকল্প শক্তির উৎসের মত হাইড্রোজেন সেলেরও রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। প্রথমত, হাইড্রোজেন বেশ হালকা গ্যাস, এই গ্যাসকে তরল করতে প্রচুর শক্তি প্রয়োগ করতে হয় এবং তরল করার প্রক্রিয়ায় অনেকটা শক্তি তাপশক্তি হিসেবে অপচয় হয়। দ্বিতীয়ত, হাইড্রোজেন সেলের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলেও কিছু অতিরিক্ত তাপ উৎপাদন হয় যা পুরো সিস্টেমের কার্যক্ষমতাকে হ্রাস করে।
খনিজ জ্বালানির মজুদ শেষ হওয়ার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, তেমনি বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন বিকল্প, নির্ভরযোগ্য নতুন এক পদ্ধতির। সেই আবিষ্কার ঠিক কবে পৌঁছাবে সবার আয়ত্তে, তা বলা বেশ মুশকিলই বটে। তাই খনিজ জ্বালানির ব্যবহারে হতে হবে সাশ্রয়ী, সাথেই চালিয়ে যেতে হবে বিকল্প শক্তির খোঁজে গবেষণা।
অনিরুদ্ধ দে পিয়াস স্মার্ট ইকোসিস্টেম লিমিটেডে কম্পিউটার প্রকৌশলী পদে কর্মরত।
