নিমতলী-চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে শুরু হওয়া ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ প্রকল্পের কাজ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়েছে আরও এক বছর। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
প্রকল্প এলাকার মাটি ভরাটের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে, ২০২৩ সালের জুন নাগাদ মালিকদের প্লট হস্তান্তর করা সম্ভব হবে বলে জানাচ্ছে বিসিক।
রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, প্লট বুঝে পেলে ভবন নির্মাণ এবং অন্যান্য কাজ শেষ করতে আরও কিছু সময় লাগবে। ২০২৫ সাল নাগাদ পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গোডাউন ও অন্যান্য কারখানা সরানো শুরু হবে।
বাংলাদেশ কেমিকেল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল মোস্তফা রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্লট বুঝিয়ে দিতে পারলে এক বছরের মধ্যেই তারা পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গোডাউন সরিয়ে নিতে পারবেন।
“বিসিক যত তাড়াতাড়ি আমাদের প্লট হস্তান্তর করবে, আমাদের কাজ আমরা তত তাড়াতাড়ি শুরু করতে পারব। বিসিক আমাদের সবশেষ আশ্বাস দিয়েছিল ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্লট বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু দিতে পারেনি, এখন ২০২৩ সালের জুন মাসে দেবে বলছে। তারা প্লট দিলে সেখানে ভবন তৈরি করে, ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। এজন্যও কিছু সময় লাগবে।”
ঢাকার জিরোপয়েন্ট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-নবাবগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের বামপাশে গড়ে উঠছে ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পার্ক’।
রোববার সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল এলাকা নিয়ে প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ চলছে। দুটি পাইপ দিয়ে বালু ফেলা হচ্ছে প্রকল্প এলাকার জমিতে। এখনও কিছু জমিতে মাটি ভরাট করা বাকি আছে। পাশাপাশি সীমানা দেওয়াল নির্মাণের কাজও চলছে। মাটি সমান করা হচ্ছে এক্সকেভেটর দিয়ে।
প্রকল্প অফিসে কথা হয় বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সঙ্গে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত মাটি ভরাটের কাজ ৭০ শতাংশ হয়েছে। আগামী বছরের জুন মাস নাগাদ প্লট বরাদ্দ দেওয়া যাবে।
“আমরা প্লট রেডি করে সেখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন দিব। প্লটগুলোর বরাদ্দ হবে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে। যারা প্লট নিতে চান, তারা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করবেন।”
প্রকল্পের কাজ দেরিতে শুরু করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুরুতে এই প্রকল্পটি কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমি নিয়ে করার কথা ছিল। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর ২৪ ফেব্রুয়ারির পর আরও বড় জায়গা নিয়ে প্রকল্পটি করার প্রস্তাব আসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে।
“এছাড়া ওই সময় বিসিকের করা এক জরিপে পুরান ঢাকায় ১৫২৫টি কেমিকেল কারখানা এবং গোডাউন এবং ৬০০টি রংয়ের কারখানা এবং গোডাউন থাকার কথা জানা যায়। এসব কারখানা ও গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৫০ একর জায়গা যথেষ্ট না। ফলে ২০১৯ সালের মার্চে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব পাঠায় বিসিক।”
তিনি জানান, সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন হলে ওই বছরের জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়। জমি অধিগ্রহণ শেষ করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে জমি বিসিককে বুঝিয়ে দেয় জেলা প্রশাসন। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল মাটি ভরাটের জন্য নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২৮ এপ্রিল থেকে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
হাফিজুর রহমান বলেন, এ বছরের জানুয়ারিতে মাটি ভরাটের কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে মাটি ফেলতে গিয়ে কিছু সমস্যা হওয়ায় তা সময়মতো শেষ হচ্ছে না।
“বর্ষার সময় বড় বড় নৌযান মাটি নিয়ে আসত। কিন্তু শুকনো মৌসুমে নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় ছোট নৌযান দিয়ে মাটি নিয়ে আসতে হচ্ছে। মাটি ভরাট শেষ করতে না পারায় মেয়াদ এই বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।”
এই প্রকল্প এলাকায় ৬ একর জায়গাজুড়ে একটি খাল করা হবে, যেখানে পানি সংরক্ষণ করা হবে। প্রতিটি রাস্তায় ১০০ ফুট দূরত্বে একটি করে ফায়ার হাইড্রেন্ট রাখা হবে। প্রকল্প এলাকায় একটি ফায়ার সার্ভিস অফিস থাকবে। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় ইটিপির পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর জন্য ইনসিনারেটর রাখা হবে।
২০১০ সালে ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গোডাউন, প্লাস্টিক কারখানাসহ নানা রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা ও গোডাউন সরিয়ে নিতে উদ্যোগ নেয় সরকার।
২০১১ সালে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় ২০ একর জমি চিহ্নিত করে সেখানে ১৭ তলার কয়েকটি ভবন তৈরি করে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামের জন্য বরাদ্দ দিতে ডিপিপিও করেছিল। তবে সে প্রক্রিয়া এগোয়নি।
আট বছর পর ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী, ঢাকা’ প্রকল্প একনেকের অনুমোদন পায়। ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকায় বিসিকের এই প্রকল্পের আওতায় কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ ব্রাহ্মণকীর্ত্তা মৌজায় ৫০ একর জমি চিহ্নিত করে ৯৩৬টি প্লট করার কথা বলা হয়।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুড়িহাট্টা ট্রাজেডির পর প্রকল্পটিও সংশোধন হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ৩১০ একর জমি নিয়ে ‘বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সিগঞ্জ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বিসিক। সিরাজদিখানের কামারখান্দা, চিত্রকোট ও গোয়ালখালী মৌজায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার ১৫৪টি প্লট তৈরি হবে।
২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন দেয় একনেক। সে বছরের ১২ জুন শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৭৩ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল ২০২২ সালের জুনের মধ্যে।
রাসায়নিক গুদামের তালিকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে
পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ওই এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর হতে জরিপ চালানো হয়েছে। আমাদের পরামর্শ ও জরিপের রিপোর্ট ইতোমধ্যে আমরা সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছি।
“আমরা এই অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের ব্যবসার জন্য কোনো ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছি না। নতুন করে যেন কেউ বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারে, সেই কারণে কোন ব্যবসার অনুমতি দিচ্ছি না।”
১ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে হাই কোর্ট পুরান ঢাকার যেসব ভবনে কেমিক্যাল গোডাউন, দোকান ও কারখানাগুলো আছে, তার একটি তালিকা সরকারের কাছে চেয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) করা এক রিটে আগামী ১৭ এপ্রিলের মধ্যে এই তালিকা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশও দেয় উচ্চ আদালত।
বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল ব্যবসা পরিচালনার জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জানিয়ে মেয়র বলেন, “সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আমরা বলেছি- অতিদ্রুত পুরান ঢাকা থেকে বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল ব্যবসা স্থানান্তরের জন্য। এখানে এই ব্যবসা থাকায় আমরা অনেক রাজস্ব হারাচ্ছি।”
জরিপের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সিটি করপোরেশনের কয়েকটি টিম প্রায় ২ মাস সময় নিয়ে সে সময় দক্ষিণ সিটির কর অঞ্চল ৩, ৪ ও ৫ এ জরিপ কাজ পরিচালনা করে। পরবর্তীতে গত বছরের ২৮ এপ্রিল অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
তালিকায় অঞ্চল ৩, ৪ ও ৫ এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে ১ হাজার ৯২৪টি কেমিক্যাল গোডাউনের তথ্য সরবরাহ করা হয়। তালিকা অনুযায়ী, কর অঞ্চল-৩ এ ১৩০১টি, কর অঞ্চল-৪ এ ৫৮৫টি এবং কর অঞ্চল-৫ এ ৩৮টি রাসায়নিক গুদাম ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কর অঞ্চল-৩ এর ইসলামবাগে পাঁচশ’র মতো রাসায়নিক গুদাম ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আবু নাছের বলেন, কেমিক্যালের ধরন এবং ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় মাঝারি মানের ঝুঁকিতে থাকা কেমিক্যাল গোডাউনের সংখ্যা প্রায় ৯৮ শতাংশ, অতি ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ০.৫ শতাংশ, নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ গোডাউনের সংখ্যা প্রায় ১.৫ শতাংশ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে এসব তথ্যসহ গোডাউনে রাখা রাসায়নিক দ্রব্যাদির ধরন উল্লেখ করা হয়েছে।
যে রূপে ওয়াহিদ ম্যানশন
রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশন নামের যে ভবন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে ৭১ জনের প্রাণহানি হয়, সেটি সংস্কারের পর আবার চালু হয়েছে।
শনিবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেই ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় অতিদাহ্য প্লাস্টিক পিগমেন্টের একটি দোকান বসেছে। তবে সেখানকার দোকানি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
দোতলায় চালু হয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চুড়িহাট্টা শাখাও। ওয়াহেদ ম্যানশনের বিপরীত দিকের পুড়ে যাওয়া আরেকটি ভবন ভেঙে পুনরায় নির্মাণ করা হচ্ছে।
ওয়াহিদ ম্যানশন ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে কোনো ধরনের গোডাউন ভাড়া না দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়েছে। ওই গুদামে শত শত কার্টনে থরে থরে সাজানো ছিল প্লাস্টিকের বিভিন্ন খেলনা।
জানতে চাইলে সুমন মিয়া নামের এক কর্মচারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখানে কেমিক্যাল নাই। এগুলো সব প্লাস্টিক জাতীয় পণ্য; মূলত বাচ্চাদের খেলনা।”
গত বছরের ১৯ মে ওয়াহেদ ম্যানশন ঘুরে এসে দক্ষিণ সিটির মেয়র ফজলে নূর তাপস জানিয়েছিলেন, সংস্কার হওয়ার পর ভবনটি চালু করতে আর কোনো বাধা নেই।
