নারীরা ঘরে বাইরে সমানতালে এগিয়ে চলেছে, প্রায় সব পেশাতেই নারীদের সরব অংশগ্রহণ। তবে কর্মক্ষেত্রগুলো কি এখনো নারীবান্ধব হয়ে উঠতে পেরেছে?
বাংলাদেের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন নারীর পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে পর্যাপ্ত পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বা কাজের সময়ে পিরিয়ড সংক্রান্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এমনকি কোনো নীতিনির্ধারণ নীতিমালাতেও পিরিয়ড চলাকালীন একজন নারীর জন্য কি কি সুবিধা রাখা প্রয়োজন - তার উল্লেখ নেই।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ৪৯ বছর বয়সী (সাধারণত এই বয়সসীমার নারীদের শরীরে ঋতুস্রাব হয়ে থাকে) প্রায় ১২০ কোটি নারী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে এবং এই সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
কর্মস্থলে পিরিয়ড চলাকালীন এই সময়টি নিয়ে নারীদের উপর একটি জরিপ এবং সে সংক্রান্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয় দ্য ইনডিপেন্ডেন্টে (যুক্তরাজ্য) প্রকাশিত হয়।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেকের বেশি নারী বলেছেন, ঐ সময়টাতে তাদের সহকর্মীদের কাছ থেকে নানা রকম মর্যাদা-হানিকর কথা শুনতে হয়। প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী বলেছেন পিরিয়ড নিয়ে তাদের প্রতি নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। আবার সহকর্মীরা এও বলে থাকেন “এটা তো কাজে ফাঁকি দেওয়ার অজুহাত মাত্র। এটা কি কোনো অসুস্থতা নাকি!”
আধুনিকতার যুগে বাস করেও কিছু কিছু ঘটনা স্বাভাবিক চিন্তা চেতনাকে যেনো লোপ পাইয়ে দেয়। ২০১৭ সালে অ্যাক্লু জর্জিয়াতে ঘটা একটি ঘটনা এমনটাই নির্দেশ করে।
জর্জিয়াতে ২০১৭ সালে পিরিয়ডের কারণে একজন নারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পিরিয়ড চলাকালে তার বসার চেয়ারে খানিকটা রক্তের দাগ লেগে যাওয়ার অপরাধে তাকে চাকরি হারাতে হয়।
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর ইকুইটি ইন হেলথে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৮৬ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাত অর্থাৎ শ্রমিক, মুটে, গার্মেন্টস কর্মী, হকার ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত এবং এর মধ্যে ৯১ শতাংশ হচ্ছে নারী।
কর্মরত এই বিশাল নারীগোষ্ঠীর জন্য নেই কোনো ন্যূনতম পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, হাতেগোনা কিছু কিছু জায়গায় ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে প্রবেশের অনুমতি নেই এই পেশার নারীদের।
ফলে পিরিয়ডের দিনগুলোতে এই কর্মব্যস্ত নারীদের ‘মেন্সট্রুয়াল হাইজিন ম্যানেজমেন্ট’ বা মাসিক চলাকালীন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি থেকে যায় চরমভাবে উপেক্ষিত।
কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে ব্যাপক পরিমাণে। কৃষি মাঠের আশেপাশে সাধারণত কোনো টয়লেট থাকে না বা থাকলেও সেটা অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হয়।
নির্মাণ কাজে কর্মরত নারী বা পথের ধারে বাজারের পাশে ছোট ছোট দোকান নিয়ে বসা নারীদের জন্যও নেই কোনো পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা। অথচ পিরিয়ডের সময় একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর প্যাড বদলানো জরুরি।
টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে কর্মরত নারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফ্যাক্টরির ফেলে দেওয়া টুকরো কাপড় ব্যবহার করে থাকে পিরিয়ডের দিনগুলোতে। অনেকসময় এই কাপড়গুলোতে থাকে নানা রকম রাসায়নিক পদার্থ।
আর পিরিয়ডের সময় ফ্যাক্টরির ভেতরে ব্রেক টাইমে তাদের বিশ্রামের জায়গাতেই প্যাড বা কাপড় পরিবর্তন করতে হয়, যা একই সাথে অস্বাস্থ্যকর এবং সম্মানহানিকর।
অফিস-আদালতে কাজ করার সময় নারীরা টয়লেটের সুবিধা তো পেয়ে থাকেন। তবে সেখানে পরিষ্কার পানির সুব্যবস্থা থাকে না অনেকসময় এবং ব্যবহৃত প্যাড ফেলার জন্য থাকে না কোনো ঝুড়ি বা বিনের ব্যবস্থা।
পিরিয়ডের দিনগুলোতে প্যাড খুব সযতনে ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে হয় যাতে কোনো সহকর্মীর চোখে না পড়ে। নতুবা কটাক্ষের হাসি বা তীর্যক মন্তব্য শারীরিক ব্যথার সাথে যোগ করবে মানসিক পীড়া। অথচ এটিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখার কথা।
যে বিষয়গুলো নজরে আনতে হবে
প্যাডের সহজলভ্যতা (যেখান থেকে প্রয়োজনে সহজেই প্যাড কেনা যাবে), গোপনীয়তা (একটি সুনির্দিষ্ট জায়গা যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী নারীরা প্যাড পরিবর্তন করতে পারবে), সাবান ও পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা (পিরিয়ড চলাকালে নারীরা যাতে নিজেদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ব্যবহার করতে পারেন), ঝুড়ি (প্যাড পরিবর্তনের পর যেন তা খুব সহজেই ফেলে দেয়া যায়) এবং সর্বোপরি সকলের ইতিবাচক মনোভাব।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
