মেয়েদের পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০১৪ সাল হতে ২৮শে মে প্রতি বছর পালিত হয় 'মিনিস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে' বা রজঃকালীন স্বাস্থ্যবিধি দিবস। জার্মান এনজিও'ওয়াশ ইউনাইটেড' দিবসটির উদযাপন শুরু করেছিল। তারা স্বাভাবিক ঋতুচক্রের ২৮ দিনকে মাথায় রেখে ২৮ তারিখকে বেছে নিয়েছিল।
মাসিকের সময়টায় নারীরা ঠিকমতো স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করতে পারছে কিনা, সেই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি দিবসটির মূল লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই বছরের রজঃকালীন স্বাস্থ্যবিধি দিবসের স্লোগান - পিছিয়ে থাকবে না কোনো নারী।
মাসিক বা ঋতুস্রাব প্রত্যেক নারীর জীবনে স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু এই স্বাভাবিক একটি বিষয় নিয়ে রাখঢাকের কোনো সীমা নেই। এই নিয়ে সচেতন হওয়া তো দূর, প্রায়শই কথা বলাই যেন বারণ।
মাসিক বা ঋতুস্রাব বিষয়ক পরিচ্ছন্নতা প্রশ্নে অনেকেই লোকলজ্জার বাধা কাটিয়ে উঠতে পারে না।
গবেষণায় দেখা গেছে,সামাজিক রক্ষনশীলতার জন্যে বাংলাদেশে নারী স্বাস্থ্য, বিশেষ করে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য এবং পিরিয়ড বা মাসিকের সময়ে পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা অনেকখানি বিঘ্নিত। শত শত কুসংস্কারের মাঝে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নানা রকম ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
পিল খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রাখছেন বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা - সম্প্রতি এমন একটি খবর ভাইরাল হয়েছে। মাসিক চলাকালীন সময়ে তারা যে পুরানো কাপড় ব্যবহার করে, দাবদাহে পানির অভাবে তা ধুতে হয় নালা বা ডোবার নোংরা আর লবনাক্ত পানিতে। কেউ আবার পুরানো কাপড়ে বালু ভরে ব্যবহার করেন। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় জটিল রোগের ভয়ে তারা পিল সেবন করছেন পিরিয়ড থেকে বাঁচতে। কিন্তু এটি উল্টোতাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই চিত্রটি নতুন নয়। রোগ থেকে বাঁচতে সুরক্ষা পণ্যের কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু এইস্যানিটারি পণ্যগুলো অনেকেরই ক্রয় ক্ষমতার বাইরে । তাই এই সুবিধা থেকে যারা দূরে আছেন তারা পোহাচ্ছেন জরায়ুর ক্যানসার, ইউরিনারি ট্রাক্ট ও জেনিটাল ইনফেকশন, অনিয়মিত মাসিক, মাসিক জটিলতা ওঅনুর্বরতার মতো নানা স্বাস্থ্য সমস্যা।
সময়ের অঙ্কে জীবনের সাত বছরের মতো সময় প্রত্যেক নারী মাসিকে অতিবাহিত করে। কেননা একজন নারী তারজীবনকালে ৯ বছর থেকে ৫০ বছর বয়স অব্দি ঋতুমতী হতে পারে। ইউরোপভিত্তিক একটি সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, প্রতি মাসেস্যানিটারি পণ্যে নারীদের ব্যয় করতে হচ্ছে ৮ ইউরো করে। এভাবে টানা ৪০ বছর ধরে প্রতি মাসে কতো কতো খরচ!
আমাদের দেশে প্রতি মাসে ব্যবহৃত সুরক্ষা সামগ্রীর পেছনে মোটামুটি গুনতে হয় আড়াইশো টাকার মতো। যা কখনোই স্বল্পবৃত্তীয়দের পক্ষে যোগান দেয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।এভাবেই ঝুঁকির মুখে রয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ৭.৮ কোটি নারী। বিশ্বব্যাংকের মতে ৫০০ মিলিয়ন নারী পর্যাপ্ত ঋতুকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত।
স্যানিটারি পণ্যগুলি সবার জন্য যোগান না দিতে পারাকে বৈশ্বিকভাবে বলা হচ্ছে 'পিরিয়ড পোভার্টি' ।
বেশ কিছু দেশ এই পিরিয়ডকালীন পণ্যগুলোর সহজলভ্যতা বাড়াতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই দেশগুলোরর মধ্যে অগ্রগামী হয়েছে স্কটল্যান্ড। ২০১৭ সাল হতে সে দেশে স্কুলে পিরিয়ড পণ্য বিতরণ করা শুরু হয়। 'ফ্রি পিরিয়ড প্রোডাক্ট' বিল পাস হওয়ার মধ্যে দিয়ে ২০২০ সালের নভেম্বর হতে এখন যেকোনো মহিলা বিনামূল্যে এই সুবিধা পাচ্ছেন। তারা সহজেই ফার্মেসী বা ক্লাব থেকে সংগ্রহ করছেন অতি প্রয়োজনীয় পণ্য সমূহ।
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডেন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্কুলগুলোতে স্যানিটারি প্যাড ও ট্যাম্পন বিতরণের ঘোষণা দেন, যাতে করে মাসিকের সময়টাতে কিশোরীদের স্কুলে উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত হতে পারে। ২০১৮ হতে অস্ট্রিলিয়ান সরকার পাবলিক স্কুলে ফ্রি প্যাড দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেটি ২০২০ সালে প্রথম ভিক্টোরিয়া প্রদেশে চালু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন, ভার্জিনিয়া, নিউ ইয়র্ক, নিউ হ্যাম্পশায়ার অঞ্চলে স্কুলে স্কুলে বিনামূল্যে ট্যাম্পন ও স্যানিটারি প্যাড ইস্তফা চালু আছে।ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিনামূল্যে স্যানিটারি পণ্য বিতরণের নীতিমালা হাতে নিয়েছে, ২০২০ এর ডিসেম্বর থেকে।
যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোতে যে রোগীর প্রয়োজন তাকে স্যানিটারি প্যাড প্রদান করা হয়, কোনোরকম অর্থের বিনিময় ছাড়া।
শুধু উন্নত বিশ্বের দেশ নয়, 'পিরিয়ড পোভার্টি' দূর করতে পিছিয়ে নেই কেনিয়া, বোতসোয়ানা, উগান্ডা, জাম্বিয়ার মতো স্বল্প আয়ের আফ্রিকার দেশও। কেনিয়ার সরকার বিনামূল্যে প্যাড সরবরাহ চালু করতে কুখ্যাত 'ট্যাম্পন ট্যাক্স' বাতিল করে দিয়েছে, যা বিশ্বের প্রথম নজির।
এশীয় দেশগুলোর মধ্যে চীনে মিস জিহাঙ পিরিয়ড পোভার্টির বিরুদ্ধে সরব ভূমিকা রাখতে স্ট্যান্ড বাই হার ক্যাম্পেইন চালু করেছেন। এই আন্দোলনে মাসিক সম্পর্কিত কুসংস্কারগুলো দূর করার পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ করে বিনামূল্যে স্কুল হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্যাড সরবরাহ করার মহৎ পরিকল্পনা সাধিত হয়েছে, ঠিক তখনই যখন দেশটি কোভিড মহামারীকে একটু একটু করে জয় করে ফেলছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশে ওয়াশ এলায়েন্স, পিরিয়ড ও রিসারজেন্স নামে কিছু বেসরকারি সংস্থা ও কিছু অলাভজনক প্রতিষ্ঠান 'পিরিয়ড পোভার্টি' মোকাবেলায় ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কাজ করে যাচ্ছে।
আশা করা যাচ্ছে বাংলাদেশ একদিন পারবে বৃহৎ পরিসরে নারীর স্বাস্থ্য নিরুদ্বিগ্ন করতে। কিন্তু সেটি কত দিনে সম্ভব, সেই উত্তরটার খোঁজ পুরোপুরি ভবিষ্যতের গর্ভে না রেখে বিশিষ্ট জনেরা কি একটু চিন্তিত হতে পারেন না?
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com