Loading...

পাঠ্যবই তারা হাতে পাবে কবে?

| Updated: January 23, 2022 17:58:38


পাঠ্যবই তারা হাতে পাবে কবে?

শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলছেন, সময়মতো বই না পাওয়ায় মহামারীকালে পড়ালেখার ক্ষতি আরও বাড়বে। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সরকারের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিৎ ছিল। 

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, বুধবার দুপুর পর্যন্ত বিনামূল্যের বই ছাপানো বাকি ছিল ৯৪ লাখ।

এক সপ্তাহের মধ্যে এসব বই স্কুলে যাবে বলে আশাবাদ জানিয়েছে বই বিতরণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের। 

আর স্কুলগুলোর তরফে বলা হচ্ছে, ধাপে ধাপে বই দেওয়া হচ্ছে, বাকি বই এলে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।

২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিন উৎসব করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দিচ্ছে সরকার।

১১ বছর পর মহামারীর কারণে গতবছর পাঠ্যপুস্তক বিতরণের উৎসব করা যায়নি, এবারও একই পথে হাঁটতে হয়েছে।

গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ৪০১ কোটি ২৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৮টি বই বিনামূল্যে বিতরণ করেছে।

চলতি বছর ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ১৩০ কপি বই পাচ্ছে ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৬ হাজার ৮৫৬ জন শিক্ষার্থী।

পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে গিয়ে বই ছাপানোর কার্যাদেশে দেরি হওয়ায় নতুন বছরের পাঠ্যবই সময়মতো প্রস্তুত নিয়ে সংশয় ছিল আগে ধরেই।

তবে ডিসেম্বরের শেষদিকে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা সব বই পেয়ে যাবে বলে আশা দিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার খোদ রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ঘুরে দেখা যায়, তিন সপ্তাহ পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী ৪ থেকে ৫টি বই পায়নি। কোনো বই পায়নি, এমন শিক্ষার্থীরও খোঁজ মিলেছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব বিষয়ের ক্লাস নেওয়া যায়নি।

হাজারীবাগের সালেহা স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রীতিলতা প্রাতিস্বিক বাংলা সাহিত্য, ইংলিশ ফর টুডে এবং পদার্থবিজ্ঞানের বই এখনও পায়নি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সে বলে, “আমাদের ক্লাসের কেউই এই বইগুলো পায়নি। এগুলো আমরা পড়ছি না।

“ক্লাসে টিচার এই সাবজেক্টগুলো পড়াচ্ছেন না, অন্যগুলো পড়াচ্ছেন। এ বইগুলো দিবে কি না, তাও বুঝতে পারছি না। কেউ কেউ বইগুলো যোগাড় করে পড়ছে।”'

প্রীতিলতার বাবা হাসান আহমেদ মনে করেন, কোভিডের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, বই বিতরণে বিলম্ব হওয়ায় সেই ক্ষতি আরও বাড়বে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বই পেতে আরও দেরি হতে পারে- এমন শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “প্রতিটা ক্লাসেই যদি এমন হয়, তাহলে কীভাবে হবে? যে তিনটা বিষয় ওরা পেল না, সেটা তো পড়তে পারল না। পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টাই ওদের কাছে নতুন। এক সপ্তাহ দেরি হতে পারত, কিন্তু একটা মাস চলে যাচ্ছে। কবে বই পাবে তাও আমরা জানি না।

“এ বিষয়টাতে সরকারের আরও সিরিয়াস হওয়া উচিত ছিল। এমনিতেই করোনার কারণে বাচ্চাদের পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আবার ওরা বই না পাওয়ার কারণে সে বিষয়গুলো পড়তেও পারছে না।”

সাউথপয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিবাগ শাখার ইংরেজি ভার্সনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম ১৪টি বইয়ের মধ্যে পেয়েছে ১০টি। গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ইসলাম শিক্ষা বই কবে পাওয়া যাবে, তা জানেন না তার অভিভাবকরা।

তামিমের মা নূরজাহান ইসলাম জানান, স্কুলে থেকে বলা হয়েছে বই এলেই তাদের এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।    

“ওদের অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। পরশুদিন বইগুলো পেয়েছি। টিচাররা আগের বই থেকে পড়াচ্ছেন। বলছেন, বই আসামাত্র বাচ্চাদের দিয়ে দেওয়া হবে।”

মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, এমডিসি মডেল ইনস্টিটিউট, লিটল ফ্লাওয়ার্স প্রিপারেটরি স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের সব পাঠ্যবই পায়নি।

মিরপুর-২ নম্বরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের (মূল শাখা) নবম শ্রেণির ইংরেজি ভার্সনের এক শিক্ষার্থী জানান, তারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং শারীরিক শিক্ষা বই ছাড়া বাকি বইগুলো পাননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষার্থী বলেন, “দুই সপ্তাহ ধরে টিচাররা আমাদের বলছেন, বই দিবেন। কিন্তু বই পাচ্ছি না। স্কুলে নাকি বই আসেনি। কতগুলো দিন চলে গেল, কিন্তু পড়া শুরু করতে পারিনি সেভাবে।

“কেউ কেউ বই কিনে পড়ছে নিজেদের মতো। কেউ পুরনো বই পড়ছে। আমি নেট থেকে কয়েক পৃষ্ঠা প্রিন্ট করে নিয়েছি। এ মাসে বই না দিলে হয়ত কিনেই পড়তে হবে, তাছাড়া তো উপায় নেই।”

এই স্কুলের নবম শ্রেণির বাংলা ভার্সনের তাসনিয়া হক জানায়, সে পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, জীববিজ্ঞান, বাংলা সাহিত্য ও ইংলিশ ফর টুডে বই পায়নি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সে বলে, “প্রতিদিনই স্কুলে গিয়ে খবর নিচ্ছি, কিন্তু বই পাচ্ছি না। এখন তো আবার স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। কবে বই পাবো, সেটা বুঝতেছি না।”

মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আরশিয়া আয়াত মর্তুজা তিনটি বইয়ের একটিও পায়নি। তার বোন প্রিয়ন্তি আরিয়া সপ্তম শ্রেণির সবগুলো বই পেলেও গার্হস্থ্য অর্থনীতি বইটি পায়নি।

আরশিয়ার মা আসমুনা মর্তুজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাচ্চারা অনেক আশা করে থাকে নতুন বইয়ের জন্য। একটা বই পেলেও হয়ত খুশি হত, অথচ একটা বইও এখনও পায়নি। ওর কোনো বন্ধুই পায়নি।

“আমি আগের বছরের বই ম্যানেজ করে রেখেছিলাম। সেটাই এখন পড়াচ্ছি। কারণ বই না থাকলে তো পড়ার কোনো আগ্রহই থাকে না।”

মিরপুরের এমডিসি মডেল ইনস্টিটিউটের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিব আল হাসান তার ১৫টি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে ৪টি পেয়েছে।

“সপ্তবর্ণা, ইংলিশ ফর টুডে, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ছাড়া বাকি বইগুলো পাইনি। প্রতিদিন খোঁজ নিচ্ছি স্কুলে, ক্লাস না হলেও বইয়ের জন্য যাচ্ছি।”

সাউথপয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিবাগ শাখার অধ্যক্ষ অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শামসুল আলম জানান, শতভাগ বই তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে ৩ থেকে ৪টি করে বই বাকি আছে বলে জানান তিনি।

“দফায় দফায় বই আসছে। প্রতিদিনই কিছু কিছু বই আসছে, দেওয়াও হচ্ছে।”

মিরপুরের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরে আলম বলেন, “বই বিতরণের কাজ শেষ পর্যায়ে। সপ্তম, অষ্টম, নবম শ্রেণির ২-৩টা বই বাকি আছে। ওগুলো দ্রত চলে আসবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।”

কিছু প্রেস যথাসময়ে বই না দেওয়ায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তো চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং বলে যাচ্ছি- এই এক সপ্তাহের মধ্যে সব বই শিক্ষার্থীরা পেয়ে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো পারছি না।

“তবে প্রেসগুলোর সর্বশেষ ডেট ২৭ তারিখে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এরপরে বই দিতে গেলে ওদের জরিমানা গুণতে হবে। সেজন্য আমরা এখন আশা করতেই পারি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বই পেয়ে যাবে।”

দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেকের আর্থিক সমস্যা আছে। আমরা আমাদের দিক থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম। রাত জেগে কাজ করে অনেক প্রেস আমাদের বই দিয়েও দিয়েছে।

“আমরা আশা করছিলাম, ১০ তারিখের মধ্যে সব বই স্কুলে চলে যাবে। কিন্তু এর মাঝে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ ছিল এক সপ্তাহ। তখন আমাদের কাগজকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রেস কাগজের সাপ্লাই পায়নি বলে ২৮ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি বই ছাপাতে পারেনি।”

Share if you like

Filter By Topic