Loading...

পাকিস্তান আবারও জটিলতার আবর্তে

| Updated: April 04, 2022 17:51:45


জাতীয় পরিষদের পথে পাকিস্তানের বিরোধী দলের সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স জাতীয় পরিষদের পথে পাকিস্তানের বিরোধী দলের সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স

জন্মের ৭৫ বছর পেরিয়ে এলেও পাকিস্তানে একটি সরকারও মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি, ইমরান খানের মাধ্যমে সেই ইতিহাসই সমৃদ্ধ হল। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাব এড়াতে নাটকীয় এক পদক্ষেপে প্রেসিডেন্টকে দিয়ে পার্লামেন্ট বিলোপ করে অসম্মানজনক বিদায় এড়ালেন ইমরান।

কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে, কেননা পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

রোববার পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব ডেপুটি স্পিকার কাশিম সুরি বাতিল করে দেওয়ার পর তা সংবিধানসম্মত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরই আদালত হস্তক্ষেপ করে।

এদিকে ইমরান সরকারের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ আহমেদ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, রাজনীতির বিষয় আদালতে নেওয়া ঠিক নয়।

অন্যদিকে পাকিস্তানের রাজনীতির আসল ‘খেলোয়াড়’ হিসেবে বিবেচিত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাষ্যে বলা হয়েছে, তারা রাজনীতিতে নেই।

ক্রিকেটের নায়ক থেকে তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দল গড়ে রাজনীতিতে নামা ইমরান ২০১৮ সালে ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হলেও তার পেছনে সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ ছিল বলেই মনে করা হয়।

তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর সম্প্রতি তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর বড় প্রকাশটা হয় কয়েক মাস আগে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধান নিয়োগ নিয়ে।

বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া ওই পদে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আঞ্জুমকে নিয়োগ দিলে তা নিয়ে আপত্তি জানান ইমরান। তিনি সরাসরি জেনারেল ফয়েজ হামিদকে ওই পদে বসানোর পক্ষে বলেন।

তা নিয়ে মনকষাকষি চলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের ভিন্ন বক্তব্য আসে। ইমরান অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছে। আবার রুশ-ইউক্রেইন যুদ্ধে ইউক্রেইনের পক্ষে অবস্থান জানান জেনারেল বাজওয়া।

এদিকে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন ইমরান, তা পূরণ না হওয়ায় বিরোধীরাও সরব হয়ে ওঠে। তার ধারাবাহিকতায় পার্লামেন্টে আসে অনাস্থা প্রস্তাব।

বিরোধীরা একজোট হয়ে পড়ায় এবং সেই সঙ্গে তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির ২০ জন এমপি পদত্যাগ করলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় তার দল।

তার উপর ভিত্তি করে গত ২৮ মার্চ বিরোধী দলের নেতা শাহবাজ শরীফ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করলে ইমরানের পতন অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে।

কারণ ক্ষমতায় টিকে থাকতে ইমরান খানকে ৩৪২ আসনের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অন্তত ১৭৩ জন সদস্যের সমর্থন দেখাতে হবে। কিন্তু তার বিরোধীরা এরই মধ্যে ১৭৭ জন সদস্যের সমর্থন জড়ো করে ফেলায় হেরে অসম্মানজনক বিদায় এড়াতে অন্য কৌশল নেন ক্রিকেট মাঠের কুশলী অধিনায়ক ইমরান।

রোববার পার্লামেন্টের কার্যক্রম শুরুর আগেই বিরোধীরা স্পিকার আসাদ কাইজারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তোলেন। তাতে অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্ব নেন ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি।

আলোচনার শুরুর দিকেই তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী সংবিধানের ৫ নম্বর ধারায় থাকা ‘রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব’ উল্লেখ করে ‘বিদেশিদের চক্রান্তে’ সরকার পরিবর্তনে এই অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন জানায়, ফাওয়াদ এই ধরনের প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া উচিৎ কি না, সেই প্রশ্ন তুলে স্পিকারকে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলার পর তার বক্তব্যকে ‘যৌক্তিক’ অ্যাখ্যা দিয়ে প্রস্তাবটি বাতিল করে দেন ডেপুটি স্পিকার।

বিরোধীরা এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘোষণা দেয়।

এদিকে অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাওয়ার পরপরই ইমরান জাতির উদ্দেশে ভাষণ নিয়ে হাজির হয়ে জানান, তিনি প্রেসিডেন্টকে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে বলেছেন।

“গণতন্ত্রীদের জনগণের কাছে যাওয়া উচিত এবং নির্বাচন হওয়া উচিত; জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে তারা কাকে ক্ষমতায় চায়,” বলেন তিনি।

নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে সমর্থকদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “কোনো দুর্নীতিবাজ শক্তি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরপরই নতুন নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে।”

ইমরানের ওই ভাষণের কিছুক্ষণ পরেই প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভির কার্যালয় থেকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা আসে বলে ডন জানায়।

তবে নাটকীয়তার শেষ সেখানেই নয়। এরপরই পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্ডিয়াল স্বপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন বলে দেশটির সংবাদপত্র দি নিউজ জানায়। 

এর মধ্যে পাকিস্তানের বিরোধী নেতারাও ডেপুটি স্পিকারের ‘অসাংবিধানিক’ পদক্ষেপ আদালতের নজরে আনেন বলেও জানিয়েছে জিও নিউজ।

প্রধান বিচারপতি বান্ডিয়াল জানিয়েছেন, অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল, পার্লামেন্ট বিলোপসহ প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভির সব পদক্ষেপই তাদের আদেশের মধ্যে আসবে।

বিরোধীদের অভিযোগ শুনতে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।

“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কাল (সোমবার) এই বিষয়ে শুনানি হবে,” বলেছেন প্রধান বিচারপতি বান্ডিয়াল।

তিনি একইসঙ্গে সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, কাউকে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে দেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিতে হয়। নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা করে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন।

দি নিউজ জানিয়েছে,প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট বিলোপের পর পাকিস্তানের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রোববারই এক নোটিসে জানিয়েছে, ইমরান খান আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে নেই।

তবে সংবাদপত্রটি একই সঙ্গে লিখেছে, তার প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান হলেও সংবিধান অনুযায়ী তিনি আরও অন্তত ১৫ দিন রুটিন কাজ চালিয়ে যাবেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত।

তবে আরেক জটিলতা দেখা দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী ঠিক হবে কীভাবে? কারণ পার্লামেন্টেই তো নেই। ফলে যারা এই সরকার গঠন করবে, সরকারি দল-বিরোধী দল, তারা কেউই তো পার্লামেন্টে এখন নেই।

আর ইমরান খান আরও যে কয়েকদিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যাবেন, তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী ঠিক করার এখতিয়ার তার থাকছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে- রয়টার্সের প্রশ্নে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল বাবর ইফতেখার বলেন, “রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর কিছু করার নেই।”

তিনি একথা বললেও রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান তার ইতিহাসের অর্ধেক সময়ই সেনাশাসনে ছিল।

অসাংবিধানিকবলাটা সাংবিধানিক তো?

‘বিদেশি চক্রান্তে’ সরকার উৎখাতে চেষ্টা হচ্ছে, যা ‘অসাংবিধানিক’ বর্ণনা করে পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে উঠা অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল করে দেন ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি। কিন্তু তার সেই সিদ্ধান্ত সংবিধানসম্মত কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

যা আছে নম্বর অনুচ্ছেদে

পাকিস্তানের সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং সংবিধান ও আইন মেনে চলা পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব’।

পাকিস্তানের ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি এই অনুচ্ছেদ দেখিয়েই ‘অসাংবিধানিক’ অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল করে দেন।

এটি কতটা সংবিধানসম্মত হয়েছে- জিও টিভির প্রশ্নে আইন বিশেষজ্ঞ স্বরূপ ইজাজ বলেন, ‘‘যখন একটি অনস্থা প্রস্তাব পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয় এবং যখন অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে বলেন, অনাস্থা প্রস্তাবের উপর ভোট হবে, তখন এভাবে সেটা বাতিল করে দেয়া বরং সংবিধানের বিধানকে অবজ্ঞা করার সামিল।”

এই মুহূর্তে একমাত্র সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার রাখে।

তিনি বলেন, “যদি পার্লামেন্টের ভেতর অসৎ উদ্দেশে এবং এখতিয়ার ছাড়া কোনো কাজ হয়, তবে আদালত সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

“যদি আদালত সিদ্ধান্ত নেয় যে সত্যিই অসৎ উদ্দেশে এ কাজ হয়েছে, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আইন সভা ভেঙ্গে দেয়ার পরামর্শ বাতিল এবং অকার্যকর ঘোষণা করা হবে। কারণ, পুরো প্রক্রিয়াটির ভিত্তি এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উপস্থাপণ করা হয়েছে এবং সেটা নিয়ে ভোট হওয়ার কথা ছিল।”

যদি সুপ্রিম কোর্ট ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দেয় তবে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে উঠা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে পুনরায় ভোট হতে পারে বলে মত এই আইন বিশেষজ্ঞের।

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের আইন সভা ভেঙে দেওয়ার আহ্বানকে ‘সম্পূর্ণ অসংবিধানিক’ বলেছেন আইন বিশেষজ্ঞ মুনীব ফারুক।

আইন বিশেষজ্ঞ রীমা ওমর টুইটারে এক পোস্টে লেখেন, ‘‘এখানে কোনো যদি এবং কিন্তু নেই। স্পিকার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা চূড়ান্ত অসাংবিধানিক।

“ইমরান খানের প্রেসিডেন্টকে জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। আর এমন একজন ব্যক্তি যার এই পরামর্শ দেয়ার এখতিয়ারই নেই তার পরামর্শে আইন সভা ভেঙে দেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।”

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইন বিশেষজ্ঞ সালমান আকরাম বলেন, বিরোধীদের সামনে এখন একমাত্র পথ খোলা, সেটা হলো সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্ত হওয়া।

তিনি বলেন, ‘‘আমার মতে, একটি সাংবিধানিক পদক্ষেপের জবাবে স্পিকার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সেটা অসাংবিধানিক।

‘‘এটা সংবিধানের লঙ্ঘন এবং এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আদালত কী বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করবে। যদিও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৯ এ বলা আছে, জাতীয় পরিষদ বা সেনেটে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করবে না।”

Share if you like

Filter By Topic