Loading...

পশ্চিমি খাবারে বিশ্বে বাড়ছে দেহপ্রতিরক্ষাজনিত রোগ-ব্যাধি

| Updated: January 12, 2022 17:26:48


পশ্চিমি খাবারে বিশ্বে বাড়ছে দেহপ্রতিরক্ষাজনিত রোগ-ব্যাধি

দুনিয়ায় দেহ প্রতিরক্ষাজনিত অসুখ-বিসুখ বাড়ছে। নতুন ডিএনএ গবেষণার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ সব রোগের প্রতিকার খুঁজে পাওয়ার আশা করছেন লন্ডনের বিজ্ঞানীরা।

মন আমার দেহ ঘড়ি- না বলে যদি বলা হতো দেহ আমার অতন্দ্র প্রহরী তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশেষ ভুল হতো না। সাধারণভাবে দেহের এই প্রহরীরা সদা তৎপর। রোগ নয় স্বাস্থ্যই পরমাশ্চর্যের বিষয় বলে অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানী মনে করেন। তারা বলেন, প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথেই আধি-ব্যাধি সৃষ্টিকারী নানা অণুজীব ঢুকছে শরীরে। তারপরও আমরা স্বাস্থ্য বজায় রাখতে পারছি। বা বেশির ভাগ সময়ই স্বাস্থ্য ভালো থাকছে। কী ভাবে তা সম্ভব হচ্ছে- ভাবলে বিস্মিত হবেন আপনিও।

রোগ-জীবাণুকে ঘায়েল করছে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাদের প্রতিরক্ষার প্রাচীর ভেদ করে রোগবাহিনী দেহের আগ্রাসন চালাতে পারে না। বরং হামলার আগেই এ বাহিনী হয়ে যায়, মুখে মুখে কথিতসাফনান সাফফা, খতম।  

যুদ্ধের জগতে বলা হয় বন্ধুদের চালানো গুলি বা ফ্রেন্ডলি ফায়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দেয়। রণক্ষেত্রে এমনটি ঘটে ভুলে। দেহেও ঘটে এমনদরিয়া-অথই ভ্রান্তি। দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অতন্দ্র প্রহরীরা ভুলকাণ্ড করে। দেহের কোষরাজি আর আগ্রাসন চালাতে দেহে নানা পথে অনুপ্রবেশকারী অণুজীবগুলোর মধ্যে ভুলের ঘোরে তফাৎ করতে পারে না দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।  দেহকোষ রক্ষায় নিযুক্তপ্রতিরক্ষায় অতন্দ্রএবারে দেহ প্রতিরক্ষার এমন প্রহরীদের হামলায় পড়ে অসহায় হয়ে যায় দেহকোষরাজি। হামলার শিকার হয় দেহকোষরাজি এবং দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। দেহে দেখা দেয় বিশেষ ধরণের কিছু রোগ দেখা দেয়। এ সব রোগ চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে, দেহ প্রতিরক্ষাজনিত বা অটোইমিউন রোগ হিসেবে পরিচিত।

দুনিয়াজুড়ে দেখা দিচ্ছে দেহ প্রতিরক্ষাজনিত সংক্রান্ত রোগ। বিশ্বব্যাপী এমন রোগের প্রকোপ ঠেকাতে একাধিক আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলছে। এ গবেষণার অন্যতম প্রতিষ্ঠান হলো লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউ। দেহ প্রতিরক্ষাজনিত রোগগুলোর সুনির্দিষ্ট কারণগুলি চিহ্নিত করতে পৃথক গবেষণা গোষ্ঠী স্থাপন করেছেন এ গবেষণা সংস্থার বিশ্বখ্যাত দুই বিশেষজ্ঞ, জেমস লি এবং ক্যারোলা ভিনুসা। এমন গবেষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ব্রিটিশ দৈনিক অবজারভারের বিজ্ঞান সম্পাদক রবিন ম্যাককাই। একই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অপর ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের রোববারের অনলাইন সংস্করণ।

ক্যারোলা ভিনুসা এবং জেমস লি 

অবজারভারকে লি বলেনপশ্চিমে গত প্রায় ৪০ বছর আগে থেকেই  দেহ প্রতিরক্ষাঘটিত রোগের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।তিনি আরো বলেন, “তবে, আগে কখনো ছিল না এমন কিছু দেশে হালে এ রোগের প্রকোপ চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের নজরে আসছে।

প্রদাহদায়ক অন্ত্র রোগ ইনফ্লিমেটারি বাউল ডিজিজ বা আইবিডির কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন লি। আগে এ রোগ খুব কম দেখা গেলেও সম্প্রতি এ রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব এশিয়ায়।

দেহ প্রতিরক্ষাজনিত রোগ অটোইমিউন ডিজিজের তালিকায় টাইপ ১ ডায়াবেটিস থেকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, পেটের রোগ আইবিডি এবং স্নায়ু রোগ মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস পর্যন্ত নানা রোগ রয়েছে। প্রতি ক্ষেত্রেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তালগোল পাকিয়ে যায় আর প্রতিরক্ষা সেনারা সংক্রমণ ও রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবের বদলে দেহের সুস্থ কোষকলার ওপর হামলা করে।

এক যুক্তরাজ্যে, অন্তত ৪০ লাখ মানুষ এ সব রোগের শিকার হচ্ছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভুগছেন এ জাতীয় একাধিক রোগে। ধারণা করা হয়, দেহ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অসুখ আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানে, প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের বেশির ভাগ ধারণা করেন, এ সব রোগ বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকায় রয়েছে পরিবেশ।

শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের রিউম্যাটোলজিস্ট ডা. সুশান্ত কুমার সাহা ফিন্সানসিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে রিউম্যাটোলজি নিয়ে জরিপ হয়েছে। দেশব্যাপী এ জরিপ পরিচালনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১ শতাংশ রোগ রিউম্যাটোলজিকে ভুগছে। ১৯৯৮-২০০০ সাল থেকে রিউম্যাটোলজি দেশে আলাদা বিভাগ হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। তখন থেকে এ জাতীয় রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। রোগীও বাড়ছে। খাদ্যের সাথে তার রোগী বাড়ার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে জাতীয় কোনো জরিপ বাংলাদেশে হয়নি।

ডা. সুশান্ত কুমার সাহা

চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি আরো জানান, সাধারণ ভাবে কোনো রোগী দেহ প্রতিরক্ষাজনিত একটি রোগে আক্রান্ত হলে তার দেহে অনুরূপ আরো রোগ পাওয়া যায়।

বাড়ছে কেন রোগ-ব্যাধি?

এমন প্রশ্নের অবতারণা করা হলে বিস্মিত হননি লি। তিনি বলেন, “গত কয়েক দশকে মানুষের জিন বা বংশগতির ধারায় রদবদল হয়নি।এর আগে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন। প্রশ্নের উত্তর প্রসঙ্গে লি আরো বলেন, “কাজেই বাইরের দুনিয়ায় এমন কিছু পরিবর্তন ঘটেছে যা আমাদের দেহ প্রতিরক্ষাজনিত অসুখ-বিসুখের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে।

লিএর বক্তব্য সমর্থন করেন ভিনুসা। এর আগে তিনি অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেছেন। বিশ্বজুড়ে খাবারের অভ্যাস বদলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “পৃথিবীর দেশে দেশে পশ্চিমা খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। মানুষ আরো বেশি বেশি করে ফাস্ট ফুড কিনেছে।

ভিনুসা এবারে স্পষ্ট করেই বলেন, “খাবার হিসেবে ফাস্ট ফুডে আঁশের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক উপাদানই থাকে না। মানব দেহের নানা গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে জড়িতআমারণুজীবমণ্ডলবা মাইক্রোবায়োমি নামে পরিচিত অণুজীবমণ্ডল। এ অণুজীবমণ্ডলের আবাস হলো অন্ত্র বা পেট। আঁশের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান খাদ্যে না থাকলে এই মণ্ডলের ওপর তার প্রভাব বর্তায়।

তিনি বলেন, “দেহের অণুজীবমণ্ডলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত রদবদলই ডেকে আনে দেহ প্রতিরক্ষাজনিত অসুখ-বিসুখ। এ পর্যন্ত এ জাতীয় শতাধিক রোগের খোঁজ পাওয়া গেছে।

উভয় বিজ্ঞানীই জোর দিয়ে জানান যে ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতাগুলি এই ধরনের অসুস্থতাকে আমন্ত্রণ জানায়।  এমন অসুস্থতার  কারণে উদরীয় বা পেটের রোগের পাশাপাশি বৃক্কের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। এতে প্রদাহ বা জ্বালাযন্ত্রণা হতে পারে। হাত পা ফুলতে পারে। হৃৎপিণ্ডসহ শরীরের নানা অঙ্গেরও হতে পারে ক্ষতি।

জিনসৃষ্ট বা জেনেটিক সংবেদনশীলতা না থাকলে কারোই দেহ প্রতিরক্ষাজনিত রোগ হবে না। তা তিনি যতই বড় বড় বার্গার গিলুন  না কেন।ভিনুসা আরো বলেন, “বিশ্বব্যাপী ফাস্ট-ফুড ফ্র্যাঞ্চাইজির বিস্তার বন্ধ করার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী বা চিকিৎসক সমাজ তেমন কিছু করতে পারেন না। তার বদলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জিনের সাথে জড়িত মৌলিক প্রক্রিয়াগুলি বোঝার চেষ্টা করছেন। দেহপ্রতিরক্ষাজনিত রোগ-ব্যাধির প্রকৃতি বুঝতে চেষ্টা করছি। কিভাবে কেউ কেউ এ রোগের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে কিন্তু অন্যরা হয় না, তা বুঝতে চাইছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ সব রোগকে একেবারে গোড়াতেই মোকাবেলা করতে চাইছেন।

নতুন নতুন পদ্ধতি বের হওয়ার ফলেই ডিএনএ পর্যায়ে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে পার্থক্য আছে বিজ্ঞানীরা এখন তা শনাক্ত করতে পারছেন। এ ভাবেই দেহ প্রতিরক্ষাজনিত রোগে যারা ভুগছেন তাদের ডিএনএ পর্যায়ে অভিন্ন পার্থক্য সুচিহ্নিত করা সম্ভব হবে। লি আরো জানান, এ রোগ নিয়ে গবেষণা জীবনের শুরুতে, পেটের প্রদাহের সঙ্গে জড়িত ডিএনএর মাত্র ৬টা ধরন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল। এখন এ রকম আড়াইশর বেশি ডিএনএ চিহ্নিত করা গেছে।

জিন পর্যায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভিন্নতা কী ভাবে নানা জাতের অসুখ ডেকে আনে তাই বের করাই হলো লি এবং ভিনুসার মূল গবেষণা তৎপরতা।

দ্রুত ওষুধ দরকার 

লি বলেন, বিশ্বের দেশে দেশে দেহ প্রতিরক্ষাজনিত রোগ বাড়ছে, কাজেই এ সব রোগের চিকিৎসা এবং ওষুধের প্রয়োজন আগের তুলনায় বাড়ছে। তিনি বলেন, “আজকের দিনে দেহ প্রতিরক্ষাজনিত রোগ সারিয়ে তোলার কোনো ওষুধই নেই। এ জাতীয় রোগ সাধারণ ভাবে তরুণ বয়সিদের মধ্যেই বেশি দেখা দেয়। এ সব তরুণ নিজ শিক্ষাজীবন সুন্দর করে শেষ করার সংগ্রাম করছে, প্রথম চাকরি পাওয়ার লড়াইয়ে আছে, কেউ কেউ পরিবার গড়ার পথে পা বাড়াচ্ছে।

না থেমে লি বলে চলেন, “অবস্থাটা এমন দাঁড়াচ্ছে যে অস্ত্র-চিকিৎসা বা কদিন পরপর নিয়ম করে ইনজেকশনের ওপর নির্ভরকারী রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। তাদেরকে এমন চিকিৎসার ওপর ভর করে গোটা জীবন হয়ত কাটাতে হবে। রোগীর জন্য বেদনাদায়ক, চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টিকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে বিষয়টা। দ্রুত এবং কার্যকর চিকিৎসা পাওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

পাশাপাশি অনাবশ্যক ফাস্ট ফুড বা পশ্চিম ধাঁচের খাবার-দাবার থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করা ভালো। অন্তত এতে কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়ায় পড়ার আশঙ্কা নেই। ভালো স্বাস্থ্যের জন্য দামি আয়োজনের দরকার নেই। দরকার হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। একে অভ্যাসে পরিণত করা।

Share if you like

Filter By Topic