Loading...

নয়া বিশ্বব্যবস্থার দৌড়ে কে থাকবে এগিয়ে?

| Updated: January 30, 2022 11:04:41


নয়া বিশ্বব্যবস্থার দৌড়ে কে থাকবে এগিয়ে?

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা নিয়ে চীন এবং রাশিয়ার অভিযোগ প্রায় একই। এর বিরুদ্ধে দেশ দুইটি প্রায় একই ভাবে সরব। পশ্চিমাদের কাছে এ সবই প্রবাদের সেই – সব শেয়ালের এক রা’র বার্তাই হয়ত দেয়। কিন্তু তারপরও তফাৎ আছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে কী ভাবে এগোতে হবে – তা নিয়ে দুই রাজধানীর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ রয়েছে। এখন চীনের চেয়ে রাশিয়া যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে বেশি ইচ্ছুক।

এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ত অনেক বেশি সীমিত হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দাবি করেছিলেন, রাশিয়া এখন একটি আঞ্চলিক শক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। সিরিয়া, ইউক্রেন এবং অন্যান্য স্থানে সামরিক বল প্রয়োগ করাই ওবামার এ দাবিকে নাকচের একটি পথ বলে ধরে নিচ্ছে রাশিয়া। মস্কোর কার্নেগি সেন্টারের দিমিত্রি ট্রেনিনের মতে, “রাশিয়া যদি একটি বৃহৎ শক্তি না হয়, তবে দেশটির নেতাদের কাছে তার আর কোনো মূল্য নেই।”

রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অন্যদিকে  তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের প্রধান শক্তির আসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার হিসাব কষছে চীন। দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকোর্ডিং টু চায়না নামের বইয়ের লেখক এলিজাবেথ ইকোনমি বলেন যে বেইজিং “আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাইছে।” চীনের ইচ্ছে হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে  প্রশান্ত মহাসাগর থেকে হটিয়ে দেওয়া এবং দেশটিকে নিছক আটলান্টিক শক্তিতে পরিণত করবে।” ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আজকের বিশ্বের অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফলে আমেরিকার দৃশ্যপট থেকে হটিয়ে দেওয়া গেলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চীনই “পয়লা নম্বরের” হয়ে উঠবে। হোয়াইট হাউজে কর্মরত চীনা পণ্ডিত রুশ দোশি ‘দ্যা লং গেম’ নামের বইয়ে একই দাবি করেন। চীনের নানা সূত্রের বরাত দিয়ে দোশি দাবি করেন, বেইজিং এখন মার্কিনি ঢং অনুসরণ করে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে।

করতলে বিশ্ব-কসরতের শেষ নেই

বিশ্বকে করতলে নিয়ে আসার কসরতে ভিন্নতা রয়েছে চীন এবং রাশিয়ার। দেশ দুইটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্তে পার্থক্য রয়েছে। তারই ছায়া পড়েছে তাদের প্রয়াসে। রাশিয়ার অর্থনীতি এখন আকারে মোটামুটি ইতালির আধাআধি হবে।  বিশ্বকে করতলে পুরে রাখার বা দুনিয়া জুড়ে আধিপত্য বিস্তারের মতো  সম্পদের আবশ্যকীয় জোর নেই রাশিয়ার। বিপরীতে কোনো কোনো মানদণ্ডে চীনকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এ ছাড়া, সর্ববৃহৎ নির্মাতা এবং রপ্তানিকারকও চীন। চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি এবং রাশিয়ার চেয়ে ১০গুণ বেশি। সব মিলিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশ হয়ে ওঠার ইচ্ছাই চীনের জন্য স্বাভাবিক।

অর্থনৈতিক দিগন্তে রাশিয়া ও চীনের এই বিশাল ফারাকই পুতিনের তুলনায় শিকে আরো বেশি উচ্চাভিলাষী হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে। পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদে তাকে আরো বেশি সতর্ক, আরো গুণে পা ফেলতে শিখিয়েছে। পুতিন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে চাইছেন। তাঁর এ ইচ্ছার মধ্যে হতাশায় নিমজ্জিত জুয়াড়ির চূড়ান্ত প্রয়াসের প্রতিচ্ছবির দেখা মিলতে পারে। ট্রেনিনের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সোভিয়েত জোটের  অনেকাংশে বিস্তার লাভ করেছে ন্যাটো। এ বাস্তবতার নিরিখে ইউক্রেনকে তার “শেষ অবস্থান” হিসেবে গ্রহণ করেছেন পুতিন।

এর উল্টো পিঠে, বেইজিং জোরালভাবেই মনে করে যে সময় এবং ইতিহাস রয়েছে চীনের অনুকূলে। দুনিয়াব্যাপী প্রভাব বিস্তারের অর্থনৈতিক উপকরণে সমৃদ্ধ হয়েছে চীন। রুশদের জন্য এ সব উপকরণ মোটেও সহজলভ্য নয়। বছরের পর বছর ধরে উল্লেখযোগ্য এবং বৈশিষ্টমণ্ডিত প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন শি। এটি হলো, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) যা চীনা-অর্থায়নে গড়ে ওঠা অবকাঠামোর বিশাল এক আন্তর্জাতিক কর্মসূচি।  মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকায় চলে এসেছে এর কর্মসূচির আওতায়।

আমেরিকা ধীরে ধীরে আরো রক্ষণবাদী হয়ে উঠেছে আর চীন নিজ  বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে বাণিজ্য শক্তি ব্যবহার করেছে। চলতি  মাসেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিশাল নতুন মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) চালু  করেছে চীন। এতে রয়েছে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো আমেরিকার বেশ কয়েকটি কৌশলগত মিত্র দেশ। তবে এতে যোগ দেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।  চীনা বাজারকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারছে বেইজিং। কোনো দেশকে এ বাজারে  প্রবেশাধিকার মঞ্জুর করে বা কাউকে বাজারে ঢুকতে না দিয়ে এ কাজ করতে পারছে চীন। কিন্তু মস্কো সহজেই অমন কোনো হাতিয়ার তুলে নিতে পারছে না। 

প্রশ্নটি হলো, ধীরে ধীরে হিসেব কষে এগোনোর এ প্রক্রিয়া শেষ অবধি সুফল এনে দেবে?  নাকি কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ অর্থাৎ নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরির জন্য জন্য  রাশিয়া এবং চীনকে কোন ধরনের নাটকীয় মুহূর্তের প্রতীক্ষা করতে হবে? 

ইতিহাস বলছে, গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো বড় মাপের রাজনৈতিক ভূমিকম্পের পরই  বিশ্বে নতুন ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বেশিরভাগ নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্যের আবির্ভাব হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি  বা এর পরবর্তীকালে।  জাতিসংঘ (ইউএন), বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এ সব সংস্থার সদর দফতর স্থাপিত হয় আমেরিকায়। শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি (গ্যাট) কার্যকর হয় ১৯৪৮ সালে । ন্যাটো গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৫১সালে সই করা হলো মার্কিন-জাপান নিরাপত্তা চুক্তি । ইউরোপীয় ইউনিয়নের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে। শীতল যুদ্ধের সমাপ্তির পথ ধরে ওয়ারশ চুক্তির মতো প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলো বিলীন হয়ে যায়। ন্যাটো এবং ইইউ রাশিয়ার সীমানা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। চীন গ্যাটের উত্তরসূরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগদান করে ২০০১ সালে।

চীন ও রাশিয়ার বহুল কাম্য ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’ বাস্তবায়িত করতে হলে একটি যুদ্ধের দরকার। সে যুদ্ধ কবে কোথায় হবে সেটাই বড় জিজ্ঞাসা। পরমাণু যুগে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ হবে বিপজ্জনক। সবপক্ষ হিসাব কষতে বড় ধরণের ভুল না করলে সে রকম মহাযুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা নেই।(তবে এ ধরণের ভুল করার আশঙ্কা সব সময়ই থাকছে।)

সরাসরি যুদ্ধ না হলেও  ‘বদলিযুদ্ধ’ বা প্রক্সিযুদ্ধ বিশ্বসাধ পূরণে সহায়ক হতে পারে বলেই ভাবছে রাশিয়া এবং চীন। ইউক্রেনে নির্বিবাদে রাশিয়া জয় অর্জন করতে পারলে বোঝানো যাবে পতন ঘটেছে ইউরোপে নব নিরাপত্তা ব্যবস্থার। এর মধ্য দিয়ে কার্যত “রুশ প্রভাব বলয়”ই বাড়ছে এবং তৎপর রয়েছে।

অন্যদিকে তাইওয়ানে যদি চীন সক্ষম হামলা চালাতে পারে তবে ধরে নেওয়া হবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দিন ফুরাল আমেরিকার। পরিস্থিতি এমন মোড় ফিরলে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যে সব দেশ আমেরিকার  দিকে তাকিয়ে থাকত তারাও তাদের দিক পরিবর্তন করবে। চীনের আধিপত্যমূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে এগিয়ে যাবে।

সবুর ছাড়াও মিলতে পারে যে মেওয়া!

বিকল্প পথেও, ওয়াশিংটনের মৌন সম্মতির ভিত্তিতেও, নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। ইউক্রেন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শেষ মুহূর্তের কিছু নাটকীয় ছাড় না পেলে বাইডেন প্রশাসনের ক্ষমতায় থাকা  অবধি সে ধরণের  ফল লাভের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসতে পারেন। অন্তত কথার ধরণ থেকেই অনুমান করা যায় যে রাশিয়া-চীনের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির দিকগুলোর প্রতি তাঁর সহানুভূতি রয়েছে।

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনো কখনো ন্যাটোর নিন্দা করেছেন। মার্কিন এশিয় মিত্ররা বিনে পয়সায় সুবিধা নিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। আমেরিকা বিশ্ব জুড়ে স্বাধীনতাকে সমর্থন করার জন্য যে বয়ান দিতো ট্রাম্প তাঁর “আমেরিকা ফার্স্ট” দর্শনে সে ভাষা ত্যাগ করেছেন। শি এবং পুতিন উভয়ের প্রশংসা করার ক্ষেত্রেও অকপট ছিলেন ট্রাম্প। স্ব-ঘোষিত চুক্তিকারক হিসাবে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বলয়ের প্রতি খানিক সহানুভূতিও দেখিয়েছেন ট্রাম্প।

এমন মেওয়া ফলার আসায় সবুর করবে না রাশিয়া এবং চীন। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার জন্য তারা সবুর করতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। দেশ দুইটি ভালো ভাবেই জানে যে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিতে অনেক যুদ্ধবাজ আছে যাঁরা রাশিয়া এবং চীন উভয়ের সাথেই লড়াইয়ের অভিপ্রায়ে মুখিয়ে আছে। সে যাই হোক না কেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত  ঘটতে পারে অনেক কিছু।

ইউক্রেন সঙ্কট জোরদার করার জন্য পুতিনের প্রচেষ্টাই রাশিয়ার ধৈর্যহীনতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। ইউক্রেন নিয়ে পুতিন যে বাজি ধরেছে তা  কাজ করে কিনা তার উপর নির্ভর করছে নতুন বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাবনা। এ নতুন বিশ্বব্যবস্থা রাশিয়ার জন্য বয়ে আনতে পারে আরো অনুকূল বার্তা। কিন্তু পুতিন ইউক্রেনে তাঁর লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলেও, মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা বিরুদ্ধে বিরাজমান হুমকি দূর হবে না। উচ্চাভিলাষী প্রেসিডেন্ট শির নেতৃত্বাধীন উদীয়মান শক্তি চীন এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন: রাশিয়া এবং চীন নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার পরিকল্পনায় মগ্ন

Share if you like

Filter By Topic