নেত্রকোণায় ৬৮ শতাংশ ধান গোলায়, বাঁধ রক্ষার চেষ্টা


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: April 19, 2022 15:24:35 | Updated: April 19, 2022 22:14:54


নেত্রকোণায় ৬৮ শতাংশ ধান গোলায়, বাঁধ রক্ষার চেষ্টা

উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির মধ্যেই একটু একটু করে নেত্রকোণার হাওরের কৃষক প্রায় ৬৮ শতাংশ ধান কেটে গোলায় তুলে ফেলেছেন; যদিও বাকি ফসল পেতে ফসল রক্ষা বাঁধগুলো রক্ষায় দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা।

নেত্রকোণায় হাওরের প্রধান নদী ধনুর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে খালিয়জুরী উপজেলার বিভিন্ন বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কৃষক সম্মিলিতভাবে বাঁধে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ কীর্তনখোলা বাঁধ। হাওরের এই বাঁধটি ভেঙে গেলে উপজেলার অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

মঙ্গলবার সকাল ৯টা নাগাদ ধনুর পানি খালিয়াজুরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে বলে জেলা পাউবোর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান।

প্রকৌশলী বলেন, বাঁধ রক্ষায় পাউবোর গঠন করা ১০টি দলের সবাই বাঁধ এলাকায় দিনরাত কাজ করছেন। টিম সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার সচেতন মানুষও তৎপর আছে। পানির ব্যাপক চাপ থাকলেও এখন নাগাদ জেলার ৩৬৫ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নিরাপদ রাখা সম্ভব হয়েছে।

কীর্তনখোলা বাঁধে সোমবার নতুন করে চারটি ফাটল দেখা দিলে তা তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা হয় বলে জানান তিনি।

এ অবস্থায় হাওরজুড়ে জোরকদমে ফসল কাটায় মঙ্গলবার সকাল ৮টা নাগাদ আবাদের ৬৮ শতাংশ ক্ষেতের ধান কৃষক ঘরে তুলেছেন বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এফ এম মোবারক আলী জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, এবার এ জেলায় সরকারি ৩৯৪টি হারভেস্টার যন্ত্র দিয়ে ধান কাটার কাজ চলছে। জেলার বাইরে থেকে আসা শ্রমিকেরাও ধান কাটছেন। তাছাড়া অনেক কৃষক দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভাড়ায় হারভেস্টার মেশিন এনে ধান কাটছেন। এবার কৃষকরা একরপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ মণ ধান পাচ্ছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার হাওর এলাকায় এবার ৪০ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিত বোরো আবাদ হয়েছে। উফশী ব্রি-২৮ চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জামিতে। হাইব্রিড ১১ হাজার ৯০০, ব্রি-২৯ চাষ হয়েছে সাত হাজার হেক্টর জমিতে। বাকি জমিতে চাষ হয়েছে স্থানীয় ধান।

এবার উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে দুই লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ধান। তার মধ্যে উফশীতে হেক্টরপ্রতি গড়ে ধরা হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ১৫ মেট্রিক টন, হাইব্রিড ৭ দশমিক ৩৭ মেট্রিক টন আর স্থানীয় জাত ধরা হয়েছে তিন মেট্রিক টন।

কৃষি কর্মকর্তা মোবারক আলী জানান, জমিতে আগাম জাতের ব্রি-২৮ কাটা শেষ হয়েছে। জমিতে রয়ে গেছে ব্রি-২৯ ও হাইব্রিড। এই ধান পাকতে শুরু করেছে। আগামী ২৫ এপ্রিলের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরে হাওরে পানি বাড়লে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।

প্রথম দফা উজানের ঢলে নেত্রকোণার হাওরের প্রধান নদী ধনুর পানি বেড়ে খালিয়াজুরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে ৬৫০ জন কৃষকরে ১০৭ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয় বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য।

জেলা প্রশাসক কাজি মো. আব্দুর রহমান জানান, এরই মধ্যে বাঁধে দেখা দেওয়া ফাটল মেরামত ও মজবুত করতে বাঁশের খুঁটি, চাটাই ও বস্তায় ভরে মাটি দিয়ে বাঁধ রক্ষায় ১২ হাজার সিনথেটিক ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক মেরামতের জন্যে আরও ২০ হাজার ব্যাগ, বাঁশ, চাটাই মজুদ রাখা হয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাঁধে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। নির্দেশনা দেওয়া আছে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা সমাধান করার।

সম্প্রতি ভারতের মেঘালয়ে অতিবৃষ্টির ফলে পানির চাপ বেড়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন হাওরে। কোথাও কোথাও ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ভরাডুবি হয়েছে অনেক কৃষকের। তাই ৮০ শতাংশের বেশি ধান পেকে গেলেই তারা শুরু করছেন ফসল ঘরে তোলার কাজ।

জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের নুর উদ্দিন বলেন, হাওরের পানি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তাছে। পানি বাড়া দেইখ্যা মনডায় ভয় লাগে। রাইতেও বান্দে গিয়া বইয়া থাহি। যদি কিচু অইয়া যায় তাইলে তা ফিরানি লাগব। অহনও ক্ষেতের মধ্যে ব্রি-২৯ ধান রইছে। এইগুলা আর পাঁচ-ছয়ডা দিন গেলেই কাইট্যালাম।

একই উপজেলার গছিখাই গ্রামের আব্দুল আহাদ বলেন, কীর্তনখোলা বানডাই আমরার জীবন। এই বানডা ভাঙলে পাঁচটা ইউনিয়নের সব হাওরে পানি ঢুইক্যা পড়ব। অহনও হাইব্রিড আর ব্রি-২৯ জাতের ধানডা রইয়া গেছে ক্ষেতে। ঠিকমতো পাকে নাই। কয়েকটা দিন লাগব। এই সময়ডা লাগাত বানডা ঠিহানি লাগবো। তাইলেই মনে করুইন, আমরার বেবাক ধান ঘরে লইয়া আইয়া ফালাম।

Share if you like