সম্প্রতি নীলক্ষেতের লাভলী হোটেল থেকে সূত্রপাত হয় ভয়াবহ এক অগ্নিদুর্ঘটনার। এতে বাকুশাহ মার্কেট সংলগ্ন প্রচুর দোকান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। পুড়ে গেছে কোটি কোটি টাকার বই।
ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা অনেক ব্যবসায়ী। সামাজিক যোগায্যগমাধ্যমে চলছে বইপ্রেমিদের হাহাকার। তবে সৌভাগ্যক্রমে কিছু কিছু দোকান বেঁচে গেছে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে।
বাকুশাহ মার্কেট কিংবা ইসলামিয়া মার্কেট থেকে সোজা আরেকটু সামনে গেলে মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের একটু আগে সিগনালের জায়গাটায় দেখা মেলে বিশাল এক উন্মুক্ত বইয়ের দোকানের।
নীলক্ষেত মোড় থেকে আরেকটু সামনে গেলে 'মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ' এর কিছুটা আগে এই দোকানের অবস্থান। এখানে আছে প্রায় সব জনরার পুরাতন বা নতুন বই। বেশিরভাগই সেকেন্ড হ্যান্ড। আবার কিছু বই আছে নতুন। সবমিলিয়ে হাজারেরও বেশি বইয়ের এক বিপুল সংগ্রহ।
এর ভেতর বাংলা বই যেমন আছে, তেমন আছে ইংরেজি বই। সাহিত্যের পাশাপাশি আছে পাঠ্যপুস্তক কিংবা নোট-গাইড। জনপ্রিয় বই যেমন আছে, তেমনি আছে হারিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া অনেক বই। দুষ্প্রাপ্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ কিংবা ক্লাসিক অনেক বইও আছে এখানে।
রয়েল তেহারী হাউস থেকে কিছুটা সামনে গেলে দোকানের শুরু। প্রথমেই চোখে পড়ে মাসুদ রানার বিভিন্ন সেকেন্ড হ্যান্ড বই। এগুলো প্রতি কপি বিক্রি হয় ২০-৩০ টাকা করে। তুলনামূলক বড় বইগুলোর দাম ৫০ টাকা করে রাখা হয়।
সেবা প্রকাশনী ছাড়াও হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক; ওপার বাংলার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বই সংখ্যায় বেশি। প্রায় সবই সেকেন্ড-হ্যান্ড। সেসব বইয়ের ভাঁজে মিশে আছে অনেক রকম স্মৃতিময় আখ্যান।
যেমন- কোনো বইয়ে দেখা যাচ্ছে, মা তার মেয়েকে জন্মদিনের উপহার দিয়েছেন; কোনো বই বইমেলায় বন্ধু উপহার দিয়েছিলো আরেক বন্ধুকে, আবার কোনো বইয়ে আছে চাকরির প্রথম বেতনে প্রেমিকাকে দেয়া প্রেমিকের ভালোবাসাময় উপহারের চিহ্ন।
কোনো বই হারিয়ে যায়, কোনো বই হয়ত কেউ ধার নিয়ে ফেরত দেয়না, আবার কখনো কখনো ভালোবাসার সম্পর্কগুলো পূর্ণতা পায়না। উপহারের এমন অনেক বই তখন এসে জমা হয় এখানে। আবার অনেক পাঠক পাঠাগারের বই নিয়ে আর ফেরত দেননা। অনেকসময় পাঠাগার বন্ধ হয়ে যায়। সেরকম পাঠাগারের সিলসমেত সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়েরও দেখা মেলে এখানে।
নীলক্ষেতে এই দোকানটি আছে বছর ষোলর মতো। দোকান মালিক নুরুল হুদা জানালেন, "বইয়ের এই ব্যবসায় সেই কিশোর বয়স থেকে আছি। আমার বাপের সাথে শুরু সেই ১৯৭৫ সালের শেষদিকে। তখন অল্পকিছু বই নিয়ে আমরা বসতাম বলাকায়, হলটার সামনে।”
“তারপর আস্তে আস্তে দোকান আকারে বাড়লো। অনেকে পুরাতন বই বিক্রি করে। আমরা অর্ধেক বা তারচেয়ে একটু কম দামে কিনতাম। এইভাবেই আরকি বড় হতে হতে পরে ২০০৫-০৬ সালের দিকে নীলক্ষেতের এইখানে বড় জায়গা নিয়ে বসলাম।"

বইগুলো এখানেই থাকে। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান চলে। বাকিসময় কাপড় বা পলিথিনে সযত্নে ঢেকে রাখা হয় বইগুলো। ঝড়-বৃষ্টিতেও যাতে কোনো ক্ষতি না হয়।
শুধু সাহিত্য নয়, আরো সামনে গেলে দেখা যাবে প্রচুর মেডিকেল বই ও ইন্টারের বিভিন্ন সেকেন্ড হ্যান্ড বোর্ডবই ও নোট-গাইড। এছাড়া সেকেন্ড হ্যান্ড ইংরেজি সাহিত্যের বইও প্রচুর আছে এখানে।
সব পাঠক সাহিত্য পড়েন এমন নয়। অনেকসময় শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পুরাতন বই বা গাইড কিনতেও আসেন। তাই তাদের সুবিধার কথা ভেবে এসব বইও রাখা। মূলত সব রকমের বইকেই ঠাঁই দিয়েছেন তারা। পাঠক বেছে নিক সেখান থেকে নিজ নিজ পছন্দমত।
বইয়ের স্তুপের মাঝামাঝি জায়গায় সারি করে সাজানো সাম্প্রতিক কিছু বাংলা সাহিত্যও চোখে পড়লো। বেশিরভাগই কোলকাতার বই। এগুলো সেকেন্ড হ্যান্ড নয়।
নুরুল হুদা বললেন, "মানুষের রিকুয়েস্ট অনুযায়ী বই আনাই। ভিতরে পরিচিত পার্টি (দোকান) আছে। তারা দিয়ে যায়।"
জানা গেলো, কোলকাতার বইয়ের ভেতর সাম্প্রতিক সময়ে কল্লোল লাহিড়ীর ' ইন্দুবালা ভাতের হোটেল,' বিভূতিভূষণ বন্দ্যেপাধ্যায়ের 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' এর মতো বইগুলো ভালো চলছে। বাংলাদেশের তরুণ লেখকদের বইয়ের ফ্রেশ কপি সে তুলনায় চোখে পড়লো না তেমন।
করোনা পরিস্থিতিতে মাঝে দীর্ঘদিন দোকান বসাতে পারেননি তারা। ফলে আর্থিকভাবে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। তবু প্রায় পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ নুরুল হুদা এই ব্যবসা ত্যাগ করেননি।
কিশোর বয়স থেকে বাবার সাথে রোপণ করা চারাগাছ এখন এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। যেখান থেকে অগণিত পাঠক তাদের রুচিমত স্বল্পদামে বেছে নিতে পারেন সুপ্রাপ্য-দুষ্প্রাপ্য বিভিন্ন বই।
সাম্প্রতিক অগ্নিদুর্ঘটনা ব্যথিত করেছে তাকে। নিজ দোকান নিরাপদে থাকলেও সামগ্রিকভাবে এটা বইব্যবসায় অনেক বড় ধাক্কা বলে মনে করেন তিনি। তার ধারণা, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেকটা সময় লেগে যাবে।
mahmudnewaz939@gmail.com
