বই হচ্ছে অনুভূতি ও জীবনবোধের সেই মই যা বেয়ে আমরা পৌঁছুতে পারি জীবনের সমস্ত অলিগলি। হোক একাকিত্ব কিংবা মন খারাপ, বই পড়ুয়াদের কাছে বই যেন এক অতি আপন কিছু। যে বা যারা দৈনন্দিন বই পড়ায় অভ্যস্ত নয়, তারা নিশ্চিতভাবে নানাবিধ সুন্দর থেকে বঞ্চিত হয়। আজকের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আলোকপাত করব— রোজকার বই পড়ার সুফলগুলো নিয়ে।
মানসিক উদ্দীপনা
হয় ব্যবহার করুন, নয়তো খুইয়ে ফেলুন। মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এ কথাটি যেন খুব বেশি খাটে। মূলত আমাদের শরীরের প্রতিটি অংশের জন্যই আলাদা কিছু চর্চা প্রয়োজন, যা কিনা সবসময়ই আমাদের শারীরিক এবং মানসিকভাবে সতেজ ও মসৃণ রাখে। তেমনি, মস্তিষ্কের সবচেয়ে ভালো চর্চা হয়— নতুন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন এবং ওগুলোকে ভাবনার আসনে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে। আর এর পুরোটাই সম্ভব প্রতিদিন নিত্যনতুন বিষয়ে বই পড়ার মাধ্যমে।
দুশ্চিন্তা লাঘবে
মানুষ মাত্রই চিন্তাশীল, চেয়ে না চেয়ে আমরা সবাই-ই কমবেশি দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকি। কিন্তু, পীড়াদায়ক চিন্তায় মশগুল থাকাকালে যদি আমরা একটি অনবদ্য গল্প কিংবা উপন্যাসে ঢুঁ মারি, তাহলে কেমন হয় ব্যাপারটা? নিশ্চয়ই অনবদ্য! আর এতে করে খুব সহজেই কিন্তু দুশ্চিন্তা থেকে সরে আসা যায়।
সমৃদ্ধির পথে
পৃথিবীর পথে পথে নিজেকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে, জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। আর এ ব্যাপারে আমাদের বই-বন্ধু এক এবং অদ্বিতীয়। যেকোনো বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ একটি বই আমাদের মস্তিষ্কে জায়গা করে দিতে পারে নতুন জ্ঞানের জানালার, যার মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত আরো সমৃদ্ধ হতে পারি, সমৃদ্ধি যোগ করতে পারি আমাদের ব্যক্তিত্বে।
নিত্যনতুন শব্দ
আপনি যত বেশি পড়বেন, তত বেশি নতুন নতুন শব্দে জ্ঞানের ঝুলি ভারি হতে থাকবে। ফলে, ব্যক্তিগত উন্নয়নেও চমকপ্রদ সাফল্য পরিলক্ষিত হয়। নতুন নতুন শব্দ যখন আমাদের কথাবার্তায় ঢুকে পড়ে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো শুনতে আরও বেশি ছিমছাম লাগে।
স্মরণ ক্ষমতা
প্রতিদিন বই পড়লে স্মরণ ক্ষমতাও বেশ বৃদ্ধি পায় ৷ বইয়ে থাকা বিভিন্ন ধরনের তথ্য আমাদের মস্তিষ্ককে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে, যার ফলে মনে রাখার পথটিও প্রতিনিয়ত চওড়া হতে থাকে। এর প্রভাব জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ইতিবাচকতা বয়ে আনে। কর্মক্ষেত্রেও এর সুফল ভোগ করা যায়।
বিশ্লেষণাত্মক ভাবনা
একটি বিষয়কে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সম্ভব। কিন্তু সবার দৃষ্টি সব বিষয়ের অতলে যেতে পারে না। এই না পারার অন্যতম কারণ হতে পারে— প্রতিদিন বই না পড়া। যারা রোজ বিভিন্ন বিষয়ে কিঞ্চিৎ হলেও জানবার চেষ্টা করে, তাদের যেকোনো বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতাও অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হয়।
মনোযোগ ও স্থিরতা
হুটহাট কোনো কিছু শুরু করার চাইতে অনেক বেশি কঠিন হচ্ছে—একাগ্রচিত্তে সে কাজে লেগে থাকা। মানুষের সব সাফল্যের দোর স্থিরতা বা মনোযোগ ধরে রাখার মধ্যেই নিহিত। প্রশ্ন হতে পারে, কোথায় পাই মনোযোগের কবজ? কারণ, বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই এর প্রচণ্ড সংকট রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রবি ঠাকুরের কবিতা হতে নেওয়া বিখ্যাত চরণটি উদ্ধৃত করা খুব প্রাসঙ্গিক— সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ। না, প্রতিদিন বই পড়লে এ সংকটেও আমাদের ম্রিয়মাণ হবার কোনো অবকাশ থাকে না।
আধ্যাত্মিকতা
মানবজীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে আত্মার সাথে গভীর সংযোগ। কোনো মানুষ যদি তার আত্মার সান্নিধ্যে যেতে পারে, তবে তার জীবনে বিষণ্নতা বলে কোনোকিছু স্থায়ী হয় না। আর গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারটিতেও বই আমাদের ভীষণভাবে সাহায্য করে। ব্যক্তি যখন গভীর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন কোনো বইয়ে তার চোখ রাখে, তখন ধীরে ধীরে তার গভীর ধ্যানধারণার উন্নতি ঘটে, এ উন্নতি তাকে শেষতক তার আত্মার সাহচর্যে নিয়ে যেতে অত্যন্ত সহায়ক হয়।
বিনোদন
মন খুলে হাসতে এবং ভালোভাবে বাঁচতে বিনোদনের কাছে যাওয়া ছাড়া মানুষের আর উপায় নেই। কিন্তু, পুঁজিবাদী জগতে নিজেকে বিনোদিত করতে চাইলেও গুনতে হয় কাড়ি কাড়ি অর্থ। খাদ্যের যোগাড় যেখানে মুশকিল সেখানে বিপুল অর্থ খরচায় ক'জন পারে নিজেকে বিনোদনের সঙ্গে হালনাগাদ রাখতে? এমন দুর্দিনেও বই তার বিশাল হাত বাড়িয়ে আমাদের কাছে ডেকে নেয়, দেয় অনস্বীকার্য বিনোদন, যাতে খরচাও হয় খুব অল্প।
কফির মগ কিংবা চায়ের পেয়ালা হাতে, দিন কিংবা গভীর রাতে, প্রতিটি হৃদয় করিডোরে বই হতে পারে আলো আর আলো। তাই নিজেকে আলোর সঙ্গে রাখতে, নিজের ভেতরে থাকা সব মশালে বারুদ ঠুকে দিতে; আমরা যেন বইয়ে রাখি চোখ, বইয়ে রাখি মন। আর এমনি করেই কেটে যাবে একদিন জাগতিক সব শোক।
সঞ্জয় দত্ত বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com
