নিখুঁতের যাত্রায় থাকা যত ‘খুঁত’


সঞ্জয় দত্ত | Published: July 24, 2021 15:18:56 | Updated: July 24, 2021 17:26:37


ছবিঃ সংগৃহীত

বহুদিন ধরে ভাবছি, করেই ফেলবো এবার, শুধু ভালো দিনক্ষণটি হাতে আসুক একবার- এমন বাক্যে অতি অভ্যস্ত লোকের অভাব নেই। হয়তো আমি আপনিও। কিন্তু, কখনো কি আমরা ভাবি, কেন আসলে এমনটা ঘটে? কেন আমরা একটু অনুপ্রেরণা, শুভ তিথি, খুঁজে বেড়াই আমাদের সব কর্মে? আমরা বোধ হয় আমাদের কাজগুলোকে খুব বেশি পরিপূর্ণ দেখতে চাই। চাই, কাজটা এমনভাবে হোক, যেন মুখে মুখে মারহাবা ধ্বনি ফলুক। ফলে দুঃখজনক সত্যি এই যে, সে কর্মটি কখনো কখনো শুরুর মুখই দেখে না।

বিষয়টিকে একপ্রকার সমস্যার খাতায় রাখলে বোধ করি, দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে সে সমস্যা কাটিয়ে, এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে যারা স্থির, তাদের জন্য আজকের এই লেখা। এর বিষয়বস্তু এমনসবসময় নিখুঁত গন্তব্য খোঁজার প্রবণতা আমাদের কী দেয়, কী কেড়ে নেয়।

যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে শেষতক যা বাঁচে, তা হচ্ছে ফলাফল। কাজ হতে প্রাপ্ত ফল, হয়তো মানুষকে ভালো কিছু দেয়, নয়তো অন্যভাবে করার পথ বাতলে দেয়। কিন্তু, যখন কেউ কর্ম সম্পাদনের পর ফলাফলে যা-কিছুই ঘটুক, তীব্র হতাশা ব্যক্ত করে; উচ্চারণ করে, আরও ভালো হতে পারতো, তখন এমন প্রবণতা তাকে পরবর্তী ধাপে যেতে অনেকটাই নিরুৎসাহিত করে। তাই, সবসময়ই আমাদের কাজগুলো আরো ভালোযে হতে পারে, সেকথা কিন্তু চিরন্তন। কিন্তু যা কিছু করলাম, তা নিয়ে যে সুখ বা স্বস্তিবোধের মতো কিছুই হয়নি, এমনটা ভাবা খুব কাজের কথা নয়।

মানুষ মাত্রই সৃজনশীল। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ আলাদা স্বাদে পৃথিবীকে রাঙাতে চায়। তবে এমন মানুষও দেখা যায়, যারা কিনা কিছু একটা করে অন্যের মতামতের প্রত্যাশায় বসে থাকে। মতামত হাতে এলে, সেইমতো তার কর্মকে নানাভাবে বদলায়, ভাঙে। বিষয়টি যে খুব নেতিবাচক তা নয়। কিন্তু যখন এটি অতিমাত্রায় ব্যক্তির মগজে গেঁথে যায়, তখন তা নিয়ে ভাবা দরকার। এটিও আসলে কাজে অতিমাত্রায় পরিপূর্ণতা সন্ধানের একটি কারণ। মনে রাখতে হবে, আমরা যা কিছুই করি না, কেন তাতে আমাদের নিজের ব্যক্তিত্বের একটি ছাপ রেখে যাওয়াটা জরুরি। কিন্তু যখন কেউ অন্যের মতামতের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সে অন্য কারোর চিন্তার মধ্যেই নিজেকে গুলিয়ে ফেলে। ফলে না ঘটে আশাব্যঞ্জক কিছু, না ঘটে নতুন কিছু। আর আলোচ্য সমস্যাটিও তখন আরও জেঁকে বসে হৃদয়ে-কর্মে।

ভুল আসলে কী? খুব কি শত্রুর মতো কিছু? ইতিবাচক ভাবনায় যদি দেখি, তবে প্রতিটি ভুলই আসলে আমাদের আরও বেশি পোক্ত করে। কিন্তু এমন মানুষ নেহাত কম নয় যারা একটি ভুলে সবসময়ই সব শেষদেখতে পায়। হয়তো যারা যা দেখে, তারা আসলে তা-ই পায়। যেকোনো কাজে ভুল হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু যারা ভুল কেন হলো, কেন শতভাগ সঠিক হলো না, এমন প্রশ্নের উত্তর সন্ধান নিয়ে মোটামুটি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তারা আসলে কখনোই মূল কাজে পৌঁছুতে পারে না। তাই যথাসম্ভব, ভুল নিয়ে ভাবনায় অতিরিক্ত সময় না ব্যয় করে, কর্মে নিয়মিত হওয়া দরকার। এতে করে পরিপূর্ণতার নেশা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি, সত্যিকার অর্থে নিজ থেকে আরও দারুণ কিছু প্রাপ্তির সম্ভাবনাও তুমুল বাড়ে।

আমাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সবসময়ই আমাদের ভালো প্রত্যাশা করে। যখন আমরা কিছু একটা করি, তারা খোলা মনে তার প্রশংসা করে, চেষ্টা করে অনুপ্রেরণা দিতে। তবে আলোচ্য সমস্যাটি যখন মনে ঢুকে পড়ে, তখন যে যতো ভালোই বলুক না কেন, মনে হবে- সবাই বলার জন্য বলছে অথবা খুশি করতে বলছে। আর তাই হয়তো, সত্যি সত্যি দারুণ কিছু করে ফেলার পরও কেউ কেউ আরও ভালোর গ্যাঁড়াকলে মানসিক অস্থিরতায় পড়ে।

দু'জন মানুষের মধ্যে একজন সপ্তাহের ছ'দিন কিছু একটা করে এবং শেষদিন তা পুনরায় দেখে ভুলগুলো শুধরে নেন, অন্য ব্যক্তি সপ্তাহে সাতদিন একই জিনিস বারবার সংশোধনের মধ্য দিয়ে যান, এবার প্রশ্ন রাখা যায়, কে কতটা এগিয়ে? ত্রুটিহীন হওয়ার ইচ্ছে অবশ্যই মন্দ কিছু নয়। কিন্তু, সে ইচ্ছে যদি আপনাকে উৎপাদনক্ষম না করে বরং একই বৃত্তে ফেলে দেয়, তবে তা সবসময়ই আপনার ক্ষতির কারণ।

এবার যদি প্রশ্নোত্তরে যাই, প্রথম ব্যক্তি যে নিখুঁত হতে চাননি, ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। বরং তিনি থেমে না গিয়ে তার কর্ম অব্যাহত রেখেছেন, এবং ভুল সন্ধানের চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি এগিয়ে।

ত্রুটি শব্দটি জীবনের খুঁটির মতো। মানুষ যা কিছুই করুক না কেন, ত্রুটির উপস্থিতি থাকবেই। বলা যায়, এ এক সর্বজনীন ব্যাপার। তাই সর্বজনীন কিছুকে নিজস্ব তকমায় না ফেলাই আমাদের জন্য ভালো। আমরা বরং এটিকে সবার ভেবে মানসিক দিকে ইতিবাচক হবার চর্চা করি, এতেই মঙ্গল।

সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

sanjoydatta0001@gmail.com

Share if you like