Loading...

নাসিমার কাগজের তৈরি পরিবেশবান্ধব কলম


ছবি: কলম বানাচ্ছেন নাসিমা আখতার ছবি: কলম বানাচ্ছেন নাসিমা আখতার

পড়াশোনা বেশিদূর করতে পারেননি তিনি, চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর পড়া হয়নি। এরপর বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছেন।

খুব অল্প বয়সে নাসিমা আখতারের বিয়ে হয়ে যায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্য মীর রবিউল আলমের সাথে। সেটা ১৯৯২ সালের কথা। তারপর ঘরে এলো দুই সন্তান। ২০০০ সালে স্বামীর অবসরের পর যশোরের কোতোয়ালী থানায় লোন অফিস কলোনিতে পরিবার নিয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। 

ছোটবেলায় মাটিতে দাগ কেটে কেটে ছবি আঁকতেন, কাগজ পেঁচিয়ে কলম তৈরি করার চেষ্টা করতেন। হাতের কাজ ও সেলাইয়ের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল তার। কাঁথা সেলাই করতেন, কাপড়ে নকশায় ফুটিয়ে তুলতেন ফুল, পাখি কিংবা 'ভুলনা আমায়' এর মতো স্মৃতিময় লেখা।

২০০০ সালে শ্রবণপ্রতিবন্ধী স্বামীর অবসরের পর থেকে ভাতা থেকে প্রাপ্ত অল্প কিছু টাকাতেই তাদের সংসার চলত। এ সময় কাঁথা বা কাপড় সেলাই, কাপড়ে ফুলের নকশার কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। তবে ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের খরচও বাড়তে থাকে।

২০১৭ সালের দিকে নাসিমার মাথায় আসে কাগজ দিয়ে কলম তৈরির কথা। প্লাস্টিকের তৈরি কলম বা বোতল পরিবেশের বেশ ক্ষতি করে থাকে। প্রতিবছর সাগরেও যাচ্ছে প্রচুর প্লাস্টিক বর্জ্য। তিনি পত্রিকা পড়েন, সে সূত্রে এসব জেনেছেন। তাই ঠিক করেন প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজ দিয়ে কলম বানাবেন। ছোটবেলায় শখবশত খেলার ছলে করতেন। এবার ঠিক করলেন নিয়মিতভাবে কাগজ দিয়ে কলম তৈরি করবেন।

ছবি: নাসিমার পরিবেশবান্ধব কলম

পরিকল্পনামত প্রথমে একশর বেশি কলম বানিয়ে স্থানীয় একটি কলেজের প্রিন্সিপালকে জানান। কলেজে কলমগুলো বিক্রি হয়ে যায় সেদিনই। তার ভাবনা বেশ অভিনব লেগেছিলো কলেজ অধ্যক্ষের কাছে। তিনি নাসিমাকে পরামর্শ দেন কলমের গায়ে 'পরিবেশবান্ধব কলম' লেখা স্টিকার ব্যবহার করতে। এতে কলমটি আরো পরিচিত হয়ে ওঠে মানুষের কাছে।

এরপর যশোরের এম এম কলেজ, সরকারি কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে তিনি কলম নিয়ে গেছেন। তখন প্রতিটি কলমের দাম ছিলো ৫ টাকা। দিনে দেড়শ-দুইশ  কলম বিক্রি হতো। 

এর ভেতর করোনা পরিস্থিতির কারণে স্কুল-কলেজ দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নাসিমা পড়ে যান জীবিকার সংকটে। এ সময় তিনি জানতে পারেন যশোরের পুলিশ সুপার এম আশরাফ হোসেন ( পিপিএম)-এর কথা। অত্র এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। তিনি দেখা করেন জনাব আশরাফের সাথে।

সেদিনই তার কাছ থেকে বেশকিছু কলম কিনে নেন পুলিশ সুপার। সহকর্মীদেরও উপহার দেন। তার কলম প্রায় সবার কাছেই প্রশংসিত হয়।

কাগজের কলমের এই অভিনব উদ্যোগের কথা প্রচারের উদ্যোগ নেয় কোতোয়ালি থানা।

পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের জানান। পাশাপাশি পুলিশ লাইন্স স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ও স্টেশনারি দোকানে যোগাযোগ করিয়ে দেন। ফলে তার এই পরিবেশবান্ধব কলমের বিক্রি অনেক বেড়ে যায়। 

এ বছর অমর একুশে বইমেলাতেও এই কলম নিয়ে এসেছিলেন তার ছেলে মীর নাইমুল আলম। মা-কে কলম তৈরির কাজে তিনিই মূলত সাহায্য করে থাকেন।

দুই সন্তানের ভেতর নাইম ছোট, এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন কেবল। আর নাসিমার বড় মেয়ে রেবেকা সুলতানা ঢাকার একটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পড়ছেন। নাইম এই কলম নিয়ে বইমেলায় বিক্রি শুরু করার পর বিষয়টি নিয়ে সাড়া পড়ে যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে এই পরিবেশবান্ধব কলমের বিষয়টি। এরপর সারাদেশের মানুষের কাছেই পরিচিতি পায় এই কলম। এভাবে স্থানীয় থেকে জাতীয় পরিচিতি অর্জন করেছে নাসিমার 'পরিবেশবান্ধব কলম।'

নাসিমার এই কলম তৈরিতে কাগজের পাশাপাশি আঠা, কালির রিফিল আর স্টিকার ব্যবহৃত হয়। ফলে প্লাস্টিকবর্জ্যের ঝুঁকি থাকছে না, পাশাপাশি কালি শেষ হয়ে গেলে কলম ফেলে দিলে পঁচে মাটিতে মিশে যায়।

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে ৫ টাকার কলমগুলো অবশ্য এখন তিনি ১০ টাকা করে বিক্রি করছেন। প্রতিদিন কলমের বিক্রি বাড়ছেই। একুশে বইমেলাতে দিনে দুইশতাধিক কলম বিক্রি করেছিলেন তার ছেলে। যশোর ও আশপাশের জেলাতেও এখন তার পরিবেশবান্ধব কলম হয়ে উঠেছে পরিচিত। দৈনিক ২০০-২৫০ টির মত বিক্রি হয়েই থাকে।

এভাবে একজন নাসিমা তার পরিবারের অভাব যেমন দূর করেছেন, তেমনি অভিনব এক ভাবনায় খুলে দিয়েছেন পরিবেশবান্ধব কলম উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার।

 

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic