সিরিয়ায় যখন কোনো এক শিশু জীবন মরণ লড়াইয়ে আছে, জানে না যে তার স্কুল এখন বোমা হামলার শিকার, তার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত, তখন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাষ্ট্রের আরেক শিশু ভাবছে নতুন প্লে-স্টেশন কেনার। তার বাবা-মা হয়তো ভাবছে সন্তানের উজ্জল ভবিষ্যতের কথা।
জায়গভেদে এই দুই ফারাক মূলত অনেক কিছু বলে দেয়। দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, উন্নয়ন-অনুন্নয়ন তথা জীবনমানের কথা। আর এই চিত্রটিই ভেসে উঠে নাসার নাইট ইমেজ অর্থাৎ রাতের ছবির মাধ্যমে।
প্রশ্ন জাগতে পারে যে উপরে বর্ণিত ঘটনার সাথে নাইট ইমেজের কী সম্পর্ক? বিষয়টি হাস্যকরও ঠেকতে পারে অনেকের কাছে। তবে আশা করি এই লেখাটি পড়লে পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। জানা যাবে নাসার নৈশ ছবি নিছক ছবি ছাড়াও গল্পকথক বটে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ব্যবসার অবস্থা
নাসার নাইট ইমেজের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী ও বন্দর শহরগুলো বেশ আলোকিত। ছবিগুলো কিছুটা জুম করতেই বোঝা যাবে যে রাজধানী ব্যতীত অন্যান্য শহরগুলো অর্থনৈতিক ও ব্যবসার দিক থেকে কতটা পিছিয়ে।
সাধারণত প্রত্যেক দেশের রাজধানীতে এদেশের যাবতীয় অফিস আদালতের প্রধান কার্যালয় বিদ্যমান থাকে। সরকারী মূল ভবন থেকে শুরু করে ব্যবসা সংক্রান্ত কেন্দ্র এখানেই থাকে।
রাজধানীর পাশাপাশি যে অঞ্চলটি অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে থাকে তা হলো দেশের বন্দরনগরগুলো। যদি বাংলাদেশের মানচিত্রটি লক্ষ্য করা হয় তাহলে দেখা যাবে দেশের মাঝখানে অবস্থিত ঢাকা এবং দক্ষিণে চট্টগ্রামের অংশটি হলুদ রঙের। বাদবাকি পুরো দেশ এতোটা ঝলমলে নয়।
একই ছবিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যে অংশটিতে বন্দর রয়েছে খেয়াল করে দেখা যাবে সেটিও ঝলঝলে হলুদ রঙের।
কোথায় চলে যুদ্ধ আর কোথায় আছে শান্তি
নাসার নাইট ইমেজের সহায়তায় বিশ্বের যুদ্ধবিগ্রহ সম্পন্ন দেশগুলোকে চিহ্নিত করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়ায় বিগত কয়েক বছর ধরে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তার এক তুলনামূলক ব্যাখ্যা দাঁড়া করানো যায় এই নাইট ইমেজ দ্বারা।
নাসার ২০১২ ও ২০১৬ সালের দুটি নাইট ইমেজ লক্ষ্য করলেই সময়ের সাথে সিরিয়ার পরিবর্তন দৃশ্যমান। ২০১২ সালে এর রাজধানীর দামেস্ক যে পরিমাণ আলোকিত দেখা যেত চার বছরে এটি কমে প্রায় মিটিমিটি অবস্থায় আছে।
একসময়ে যে দেশটিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধুম ছিল, স্কুল, হাসপাতাল সব ছিল, এখন তা এক ধ্বংসস্তুপ থেকে কম নয়।
যে সময়ে সিরিয়া যুদ্ধাধীন ছিল ঠিক একই সময়ে নিউইয়র্ক, শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়া কিংবা ইউরোপের প্যারিস, বার্লিন সব ঝলমলে আলোয় দ্যুতি ছড়াচ্ছিলো। এই আলো প্রমাণ করে যে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের মতো নির্মম অবস্থা থেকে কতটা সুরক্ষিত। অপরদিকে সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন কতটা নিগৃহীত, সেখানের মানুষ কতটা মানবেতর জীবনযাপন করছে।
দেশের সীমানা, বন্ধু কিবা শত্রু রাষ্ট্র
ইউরোপের দেশগুলোতে বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এসব রাষ্ট্রে পারস্পরিক বন্ধুতা দেখা যায়। নাইট ইমেজে এই বিষয়টি ফুটে ওঠে। অপর দিকে আমেরিকা আর মেক্সিকো, বাংলাদেশ ও ভারত কিংবা ভারত ও চায়না এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে অধিক বাতি দেখা যায়।
ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে এতোটাই থমথমে যে দুদেশের সীমানায় যে বাতি জ্বলে তা মহাকাশ থেকে খালি চোখেই বোঝা যায়। নাসার ইমেজেরও প্রয়োজন হয় না এটি দেখতে।
উন্নত, অনুন্নত
উন্নত রাষ্ট্রেরগুলোতে আলো বেশি দেখা যায় অন্যদিকে আফ্রিকার বৃহৎ একটি অংশ সম্পূর্ণ অন্ধকার। পৃথিবীর বৈষম্য এখানে সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
আফ্রিকা মহাদেশের একদম উত্তর ও দক্ষিণ ব্যতীত আলোর ছিটেফোঁটাও নেই। অপরপদিকে ইউরোপ ও আমেরিকা পুরোটাই ঝলমলে।
দূষণ
অধিকতর উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক ব্যাপ্তির সাথে পরিবেশের দূষণ অতিরিক্ত উপকরণ হিসেবে আসে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো যে প্রতিবছর আয়োজিত হওয়া বিভিন্ন পরিবেশ সম্মেলন বা অধিবেশনে নিজেদের পরিবেশ দূষণের দায় এড়িয়ে যায় নাসার নৈশ ছবি এটি ভুল প্রমাণ করে।
শুধু তাই নয়, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে পরিবেশ দূষণ রক্ষার্থে সতর্কবার্তা দেয়া, নিজেদেরকে আরো পরিবেশ সচেতন করে গড়ে তোলার যে প্রতিজ্ঞাগুলো অধিবেশনগুলোতে করা হয় তাও ভুল প্রমাণিত হয় এই ছবিগুলোর মাধ্যমে।
নাসার একটি ছবি অর্থনীতি থেকে রাজনীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। দেশের মাঝেই যেমন উন্নয়নের বৈচিত্র্যতা কম বা বেশি দেখা যায় একই সাথে স্পষ্ট হয় বহির্বিশ্বের দৃশ্যটিও।
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
imran.tweets@gmail.com
