ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ওষুধ খেয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার এক সপ্তাহের মাথায় পুলিশের তদন্তে ঘটনা মোড় নিয়েছে অন্যদিকে।
পুলিশ বলছে, প্যারাসিটামল সিরাপ-নাপার বিষক্রিয়ায় ওই দুই শিশুর মৃত্যু হয়নি। তাদের মা ‘মিষ্টির সঙ্গে বিষ খাইয়ে’ তাদের হত্যা করেছেন এবং এর পেছনে রয়েছে তার বিয়ে বহির্ভূত প্রেম।
শিশু দুটির মা লিমা বেগমকে বুধবার রাতে উপজেলার দুর্গাপুর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন জানান, শিশুদের বাবা ওই গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক ইসমাঈল হোসেন ওরফে সুজন খান বাদী হয়ে তার স্ত্রী লিমা এবং তার কথিত প্রেমিক সফিউল্লার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলাতেই লিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“লিমা আশুগঞ্জের একটি চালকলে কাজ করেন। সেখানে আরেক শ্রমিক সফিউল্লার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা বিয়ে করারও সিদ্ধান্ত নেয়।
“পরিকল্পনা অনুযায়ী মিষ্টির সঙ্গে বিষ খাইয়ে দুই শিশু ইয়াছিন ও মোরসালিনকে হত্যা করেন লিমা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেটা তিনি স্বীকার করেছেন।”
গত ১০ মার্চ রাতে সাত বছর বয়সী ইয়াসিন খান এবং ৫ বছর বয়সী মোরসালিন খানের মৃত্যুর পর তাদের মা দাবি করেন, ‘নাপা সিরাপ খেয়ে’ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তার দুই ছেলে।
লিমা বেগম সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, দুই ছেলের জ্বর হওয়ায় সেদিন বিকালে বাড়ির পাশের একটি ফার্মেসি থেকে তারা ‘নাপা সিরাপ’ এনে খাওয়ান। তারপর দুই ছেলেরই বমি শুরু হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাদের প্রথমে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, এরপর জেলা সদর হাসাপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতাল থেকে ‘প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে’ বাড়িতে আনার পথে ইয়াসিনের মৃত্যু হয়। আর বাড়িতে নিয়ে আসার পর রাতে মোরসালিন মারা যায় বলে পরিবারের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল।
এ ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি কমিটি করে।
সারাদেশের পাইকারি ও খুচরা দোকান পরিদর্শন করে নাপা সিরাপের একটি ব্যাচের ওষুধ পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। আশুগঞ্জের ওই পরিবারের কাছ থেকে নাপা সিরাপের বোতল নিয়ে সিআইডিতে পাঠায় স্থানীয় পুলিশ।
সোমবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, আশুগঞ্জের যে দোকান থেকে কেনা ওষুধ সেবনের পর শিশু দুটি মারা গেছে, সেই দোকান থেকে আটটি বোতল জব্দ করেছেন তারা। এছাড়া ডিপো থেকে আরও দুটি ব্যাচের নমুনাও সংগ্রহ করেছেন। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের এই প্যারাসিটামল সিরাপের তিন ব্যাচের নমুনা পরীক্ষা করে ‘ক্ষতিকর কিছু মেলেনি’।
এদিকে এর মধ্যে খবর আসে, শিশু দুটিকে নিয়ে তার পরিবারের সদস্যরা সেই রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগের টিকেট কাটলেও জরুরি বিভাগের নিবন্ধন খাতায় তাদের নাম পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের তরফ থেকে সে সময় বলা হয়, টিকেট কাটলেও স্টমাক ওয়াশের ভয়ে হয়ত পরিবারের সদস্যরা শিশু দুটিকে জরুরি বিভাগে না দেখিয়েই ফিরে যান।
লিমার আচরণে প্রথম থেকেই পুলিশের সন্দেহ হচ্ছিল জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহীন বলেন, “মৃত্যুর ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রভাহিত করার জন্য নাপা সিরাপের রিঅ্যাকশন হয়েছে বলে সে প্রচার করে।… অধিকতর জিজ্ঞাসায় সে হত্যার কথা স্বীকার করেছে।”
মামলার আরেক আসামি সফিউল্লাকেও পুলিশ গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।
