নজরুলের বুলবুল, বুলবুলের নজরুল 


তাহসীন প্রাচী  | Published: May 24, 2022 17:11:02 | Updated: May 25, 2022 13:40:29


ছবি: আনন্দবাজার

ঢের কেঁদেছি ঢের সেধেছি,
আর পারিনে, যেতে দে তায়।
গললো না যে চোখের জলে
গলবে কি সে মুখের কথায়।।

-গীতিগ্রন্থ, সুর সাকী (১৯৩২)

ভালোবাসা পৌঁছে দিতে কাছে পাওয়া কি জরুরি? প্রিয়জনের প্রস্থানে কি ভালোবাসা নাই হয়ে যেতে পারে? মৃত্যু মানেই কি ভালোবাসার পরিসমাপ্তি?

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩ তম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করা যাক একজন ভিন্ন নজরুলকে, যিনি বিচ্ছেদে শোকে বেদনায় এসে মিলেছেন হৃদয়ে ক্ষত হয়ে থাকা মানুষের কাতারে। একজন পিতা নজরুলকে দেখা যায় যেখানে, যৌক্তিকতা পেরিয়ে শোক যেখানে আধ্যাত্মিকতার বাহন হয়ে ওঠে।

কবিকে মানুষ মনে রেখেছেন বিদ্রোহী কবি হিসেবেই অনেকখানি, তবে তিনি ছিলেন প্রেমের কবিও। চিরায়ত আদর্শ ভাব রোমান্টিকতা অতিক্রম করে নজরুলের গানে কবিতায় মেলে বাস্তবতার সুর। তার স্পর্শে বাংলা গান হয়ে ওঠে আধুনিক, প্রেমের প্রকাশকে তিনি অনুভব করিয়েছেন কর্মের প্রেরণায়, শোকের সান্ত্বনায়। তবে শুধু নরনারীর শ্বাশত প্রেমের আখ্যান নয়, নজরুলের কলমে রচিত হয়েছে প্রেমের গভীরতম কাহিনীগুলোর কিছু রূপ যাতে গাঁথা হয়েছে ঈশ্বরপ্রেম, মানবপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের স্বরূপ।

নজরুলের জীবন ছিল বড়ই অদ্ভূত, অভাব অনটন, দুঃখের সাথে যুক্ত হয় পুত্রশোকের অসহনীয় যন্ত্রণা। ১৯৩০ সালে তার মেজ ছেলে অরিন্দম খালেদ মারা যান মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে। তাকে কবি ডাকতেন বুলবুল নামে। তার এই ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন কবি, পরিচিতজনেরা যে-ই দেখেছেন, শুনেছেন বুলবুলকে তারা সবাই বলতেন বুলবুল হবে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী।

সেই বুলবুল যখন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন তখন বাবা নজরুল ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য সবকিছু করেও ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে পারেননি। কবি তার বিশ্বস্ত দুই সঙ্গী খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন আর শান্তিপদ সিংহকে পাঠান দমদমের এক বিখ্যাত সাধুকে নিয়ে আসার জন্য, তিনি যদি তার প্রাণের বুলবুলি পাখিকে ঠিক করতে পারেন!

মঈনুদ্দীন তার যুগ স্রষ্টা নজরুল বইয়ে লিখেছেন, কবির বাড়িতে যখন সাধুকে নিয়ে এলাম, তখন বেশ রাত হয়েছে। সাড়া পেয়ে কবি ছুটে এলেন। বুকে জড়িয়ে ভেঙ্গে পড়লেন কান্নায়। বললেন, ওরে মঈনুদ্দীন, সাধু কি মরদেহে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে? কবি আমার কাঁধ বারবার ঝাঁকাতে লাগলেন। আর একই কথা বারবার বলতে লাগলেন। তার ঠিক দশ মিনিট আগেই বুলবুল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।

বুলবুলের মৃত্যু কবিকে বিধ্বস্ত করে দেয়, বিদ্রোহী কবিতার তেজোদ্দীপ্ত তরুণ নজরুল পুত্রশোকের ভারে নুয়ে পড়েন। অভাবের সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন একমনে, এবার আসে প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক সামলানোর পালা। প্রিয়পুত্রের মৃত্যু তাকে বিদ্ধ করে চলছিল গরম লোহার ছুরির ফলার মতো, এর মাঝেও তিনি লিখলেন চন্দ্রবিন্দুর মতো কাব্যগ্রন্থ।

পুত্রশোকে পাগলপ্রায় কবি তার মৃত্যুর পর রচনা করেন হৃদয়ভেদী এই কথামালা,

ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে,
আমার গানের বুলবুলি
করুন চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।

বুলবুল যখন শেষশয্যায় তখন কবি ছেলের শিয়র ছেড়ে উঠতেন না। সেখানে বসেই তিনি অনুবাদ করেন রুবাইয়াত ই হাফিজ, যা প্রকাশিত হয় জুলাইয়ে। ছেলেকেই তা উৎসর্গ করলেন। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখলেন,

তোমার মৃত্যু শিয়রে বসে বুলবুল ই সিরাজ হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি আমার কাননের বুলবুলি, উড়ে গেছ। যে দেশে গেছ সে কি বুলবুলিস্তান, ইরানের চেয়েও সুন্দর? জানি না তুমি কোথায়। যে লোকেই থাকো, তোমার শোক - সন্তপ্ত পিতার এই শেষদান শেষ চুম্বন বলে গ্রহণ করো।

বুলবুলের মৃত্যুখবর জানানো হলো নলিনী সরকারকে। পুত্রহারা নজরুলের অবস্থা সম্পর্কে তিনি লিখলেন, আমাকে দেখে অতবড় দুর্দম বিদ্রোহী নজরুল আমার বুলবুল উড়ে গেছে নলিনীদা বলে আমার সামনে আছড়ে পড়লো। কবি জসীমউদ্দীন লিখলেন, তিনি একদিন কবিকে খুঁজে পেলেন ডিএম লাইব্রেরির এককোণে। পুত্রশোক ভোলার জন্য তিনি হাসির কবিতা লিখছেন আর কেঁদে চলেছেন। তার চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে জবাফুলের মতো লাল করে ফেলেছেন।

কবিপুত্র বুলবুলের শখ ছিল ভোঁ-গাড়িতে চড়ার, তার ছোট্ট দেহখানি মোটরযানে করে গোরস্থানে নিয়ে যান শোকদগ্ধ কবি।

কবির জীবনে বেদনাদায়ক অনেক গল্পের এখানেই শেষ নয়।

পঞ্চানন ঘোষাল তখন কলকাতার তরুণ পুলিশ অফিসার। তার এক লেখায় এই ঘটনার বর্ণনা মেলে। একবার কবির বাসায় তল্লাশীর হুকুম এল উপর থেকে এবং পঞ্চননকে দায়িত্ব দেয়া হল সে দলে থাকার। নজরুলকে তিনি বেশ ভালোবাসতেন , তার সাথে প্রায়ই গল্প করতেন।

গোয়েন্দারা তাকে নিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল কবির ঘরের, কবি দরজা খুলে দিলেন এবং সঙ্গত কারণে এই তরুণ অফিসার এবং কবি দুজনই পরস্পরকে না চেনার ভান করে রইলেন।

গোয়েন্দা পুলিশের দল কবির ঘরে সবকিছু তছনছ করে তল্লাশী চালাচ্ছে, কবিও তাদেরকে যথাসম্ভব বাক্স খুলে খুলে দেখিয়ে চলেছেন। হঠাৎ ঘরের কোণে উঠিয়ে রাখা একটি বাক্সে নজর পড়ল তাদের, বাক্স রাখার ধরনেই যেন আছে ভিন্নতা।

তারা সেটি খুলে দেখতে চাইলেন। কবি অসহায়ের মতো দাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলে উঠলেন, বাক্সটি যাতে না খোলা হয়। কবির বিচলিত মুখভঙ্গি দেখে পুলিশদের সন্দেহ আরো তীব্র হলো।

তাদের একজন সজোরে সেটি খুলতেই সেই বাক্সটি থেকে নিচে পড়লো কিছু খেলনা আর ছোট ছোট জামা কাপড়সহ বাচ্চাদের অন্যান্য সামগ্রী। এভাবে সেগুলো আছড়ে মাটিতে পড়তে দেখে কবির দুই চোখ পানিতে ভরে উঠলো, ঝরঝর করে তিনি কেঁদে দিলেন সবার সামনে। দ্রোহের কবির সুদৃঢ় মুখখানা দেখাতে লাগলো দুঃখ ও ব্যাথায় জর্জরিত। এ খেলনা ও ব্যবহার্য সামগ্রীগুলো ছিল কবির আদরের ধন ছোট বুলবুলের।

তার মৃত্যুর পর এসব বুকে জড়িয়ে কবি তার ঘুমিয়ে থাকা পুত্রকে খুঁজে পেতেন, আদর আর চুমু পৌঁছে দিতেন বুলবুলের গালে।

একসময় অফিসার পঞ্চনন ঘোষাল তার লেখায় নিজেকে অত্যন্ত ব্যর্থ ও লজ্জিত উল্লেখ করে লিখেছেন, এরপর কত মানুষের কত ঘর সার্চ করেছি, কিন্তু সেদিনের মতো এমন কষ্ট আর কোথাও পাইনি।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের কাছে পরিচিত দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি হিসেবে। তবে বেদনার নীলে মাখা বাংলাদেশের জাতীয় কবির জীবনের শেষ অংশের প্রবল অর্থাভাব, প্রিয় জীবনসঙ্গীর মৃত্যু এসবই প্রায় ঢাকা পরে গিয়েছে তার অসাধারণ সব সংগীতের মূর্ছনায়, কবিতার তেজোদ্দীপ্তিতে।

গজল থেকে শুরু করে শিশুতোষ সংগীতে ঈশ্বরের সন্ধান, সেই ঈশ্বরের সামনে দুই ধর্মের মানুষের একই রক্তের বহমানতা ও সাম্যের গান গেয়ে চলেছেন কবি, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় একতাবদ্ধ করেছেন বাংলার হিন্দু মুসলমানকে। সেই কবির জীবনের বেদনাবিধুরতা, মানুষের অবহেলা ও অপমান এই সবকিছু কোনোদিনও নজরুলের সৃষ্টিকে দমাতে পারেনি। তার এঁকে যাওয়া প্রেমের ছবি, প্রয়াণের ছবি, শোকের শক্তি যেন হারানো মানুষের স্মৃতিতে, স্মরণে প্রতিদিন বানানো উপকথার মতো গান রচিয়ে যায় বিশ্বমানুষের মনে, যেমনটা ছিলেন একজন পিতা নজরুল।

তাহসীন প্রাচী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

amipurbo@gmail.com

Share if you like