Loading...

নক্সী কাঁথার নক্শাকথন

| Updated: July 17, 2021 18:43:42


ছবি: সংগৃহীত ছবি: সংগৃহীত

‘নক্সী-কাঁথাটি বিছাইয়া সাজু সারারাত আঁকে ছবি

ও যেন তাহার গোপন ব্যথার বিরহিয়া এক কবি’

নক্সী কাঁথার মাঠ, জসীমউদ্দীন

 

পাঠ্যবইয়ের পাতায় আশৈশব পড়ে আসা নকশিকাঁথার সংজ্ঞা যেন মিলেই যায় কবির ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এর কাহিনীপটের সাথে; ঐ যে লেখা ‘নকশিকাঁথার নকশায় জড়িয়ে থাকে অনেক গল্প, হাজারো গল্প বোনা হয় গ্রামীণ নারীদের হাতে বোনা এই কাঁথার রঙবেরঙের সুতার কারুকাজে’-র সাথে। কবির রচনায় সাজু ও রুপাইয়ের বিচ্ছেদের গল্পে মূল চরিত্র অলংকৃত করে যেন নকশিকাঁথাই। কাঁথার বুননের রঙিন সুতার ফোঁড় বলে চলছে সাজুর স্মৃতি, কাঁথার জমিনে এভাবে ফুটে উঠেছিল ভালোবাসা ও বিরহ-বেদনার গল্প।

নকশিকাঁথার প্রতিটি নকশায় জড়িয়ে থাকে গল্প, যার প্রধান গল্পকার গ্রামীণ নারীরা। সুতোর বুননে পটু এই শিল্পের শিল্পীরা হরেক রঙের সুতোর বুননে রূপকথার মতো ফুটিয়ে তুলছেন অদ্ভুত সুন্দর সব কারুকাজ। সাধারণ কাঁথার উপর নানা ধরনের সুতোর বুননে নকশা ফুটিয়ে অসাধারণ শিল্পসৃষ্টির ইতিহাস মোটেই নতুন নয়, গ্রামবাংলার নারীরা শত শত বছর ধরে এই শিল্পে নিজেদের হাত পাকিয়েছেন। বলা হয়ে আসছে, বর্ষাকালে দীর্ঘসময় ঘরবন্দী থেকে নারীরা দল বেঁধে একেকটি কাঁথা সেলাই করতেন, চলত সুখ-দুঃখের আলাপ, হাজারো গল্পের আনাগোনা; যার ঠাঁই হয়ে যেত সেই কাঁথার গায়ের নকশায়।

নকশিকাঁথার ইতিহাস প্রাচীন, বাংলায় এর উদ্ভব হয়ে থাকতে পারে খ্রিস্টপূর্বকালেও- এমনটাই ধারণা করেন গবেষকেরা। পাণিনির ব্যাকরণ কিংবা অন্যান্য পালি ও সংস্কৃত বইপত্রে, মৈমনসিং গীতিকায়, নাথসাহিত্যে এ কাঁথার উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নকশিকাঁথার ভৌগোলিক স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশেরই বেশিরভাগ অঞ্চলে এটি তৈরি হয় বেশি। পুরো বাংলাদেশেই এ শিল্পচর্চা হলেও ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর নকশিকাঁথার জন্য বিখ্যাত।

জায়গাভেদে নকশাবৈচিত্র্য

নকশিকাঁথার মূল উপাদানই হল সুতোর বুনটে নকশা। এই নকশাগুলোতে সংস্কৃতি `ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব স্পষ্ট, যদিও কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা নয় শিল্পীর সৃজনশীলতা। তবে গল্প, লোকগাঁথা, গ্রামীণ পুঁথির কাহিনী যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অনুরাগ থেকে ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতীকও নকশায় বৈচিত্র্য আনতে পারে।

তবে কিছু নকশার ঐতিহ্য পুরাতন হয়ে যায়নি, বাংলার গ্রামেগঞ্জে বছরের পর বছর শেকড় ধরে আছে এর ছাঁচগুলো। এগুলো কোনো নিয়মসিদ্ধ প্রথার রক্ষণের ধারায় নয়, সংরক্ষিত হয়ে এসেছে সৌন্দর্য ও পারিবারিক বন্ধনের পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যে। নকশা সংরক্ষণে ছোট রুমালের আকারের কাপড়ে কিছু নকশার ছাঁচ তুলে রাখা হতো এবং পরবর্তী প্রজন্মে সেই নকশা আরো সমৃদ্ধ হয়ে কাঁথায় ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে নকশিকাঁথার ধরনে তারতম্য দেখা যায়, হরেক রকম নকশার দেখা মেলে। খুলনা, ফরিদপুর ও যশোর অঞ্চলের কাঁথা- ‘সাজের কাঁথা’ তুলনামূলক পাতলা ও আকারেও বড় নয়। সূক্ষ্ম সেলাইয়ের ফোঁড়ে মানুষ ও পশুপাখির নকশাই বেশি দেখা যায় এ অঞ্চলে। ‘সাজের কাঁথা’ নামের মহিমা রাখতেই সুন্দর করে নানা রঙিন সুতোয় সাজানো হয় কাঁথাগুলোকে। আবার কুষ্টিয়া ও বগুড়া অঞ্চলের কাঁথা আকারে বেশ বড় এবং পুরু। ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার এসব কাঁথার সৌন্দর্য নয়নাভিরাম।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের নকশিকাঁথার নাম ‘ফুলের কাঁথা’। নামই বলে দেয়, বিভিন্ন ধরনের রঙিন ফুলের নকশায় সুঁই ফোটানো হয় এই কাঁথাগুলোয়। সাধারণত কাঁথার জমিনটা থাকে সাদা, তাতে চলে নানা রঙের সুতোর কাজ। রাজশাহী অঞ্চলের ‘লহরি’ কাঁথার লহর বা ঢেউয়ের মতো নকশার জন্য সুখ্যাতি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ঢেউয়ের নকশা (কেউটের খুপি, বরফি, সোজা, তারা- ঢেউয়ের নাম) দিয়ে বিন্যস্ত থাকে নকশাগুলো। লহরি, সুজনি কাঁথা, লিক কাঁথা, কার্পেট কাঁথা ও ছোপটানা কাঁথা- এই পাঁচ ধরনের কাঁথা রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের বিশেষত্ব।

রংপুর-দিনাজপুরের কাঁথাগুলোয় শাড়ির রঙিন পাড় ব্যবহার করা হয় কাঁথার পাড় হিসেবে, এতে নকশায় আসে বৈচিত্র্য। সেই পাড়কে মূলে রেখেই জ্যামিতিক কারুকাজ করা হয়ে থাকে, বরফি নকশারই প্রাধান্য চোখে পড়ে। সমস্ত কাঁথা জুড়ে থাকে ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার কারুকাজ; এটাও এ অঞ্চলের কাঁথার বৈশিষ্ট্য।

নকশার রকমফের

নকশিকাঁথার সবটাই তার নকশায়, আর এর নানা রঙের সুতার ফোঁড়ে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ‘মোটিফ’ ফুটিয়ে তোলা হয়। প্রচলিত কিছু নকশার খোঁজ মেলে গ্রামীণ এই কারিগরদের নকশিকাঁথার বুননে। এমন কয়েকটি হলো,

পদ্ম নকশা: নকশি কাঁথাগুলোতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় এ নকশা। পুরাতন প্রায় প্রতিটি কাঁথার মাঝখানে নিত্যই খুঁজে পাওয়া যেত একটি ফুটন্ত পদ্ম। একটি বৃত্তকে কেন্দ্র করে পদ্মের মত পাতার বাহার কিংবা চাকার নকশা হরহামেশাই চোখে পড়ে ভারতীয় স্থাপত্যকলায়। দেশি নকশির কাঁথার নকশাতেও মেলে এর সন্ধান।

সূর্য নকশা: পদ্ম নকশার কাছাকাছি এ নকশায় সূর্যের অবয়বে কাঁথার কেন্দ্র থেকে নকশা বাইরের দিকে ছড়িয়ে করা হয়। সূর্যের জীবনদায়ক ক্ষমতার সাথে এর সংযোগ আছে বলে ধারণা করা হয়।

জীবনবৃক্ষ নকশা: সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে মানুষেরা পিপুল গাছকে জীবনবৃক্ষ হিসেবে ধারণা করত, যেমনটা বুদ্ধের বোধিপ্রাপ্তির স্থান হিসেবে এক পিপুল বৃক্ষের পবিত্রতা রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে। ভারতের সেই সংস্কৃতি নানা পালাবদলের পরেও স্থান করে রেখেছে নকশিকাঁথার নকশায়।

কলকা নকশা: কল্কা বা কলকা নকশার জন্ম পারস্য ও কাশ্মীর অঞ্চলে হলেও মুঘল আমল থেকেই উপমহাদেশের যেকোনো নকশার অবিচ্ছেদ্য অংশ এটি, নকশিকাঁথাও এর ব্যতিক্রম নয়।

লতাপাতা নকশা: গাছ-লতাপাতার নকশা নকশি কাঁথার সবচেয়ে পরিচিত নকশার মাঝে একটি। লতাপাতার সাথে যোগ হয় ঘোড়া, ময়ূর ও আরো অনেক ছবি। লতাপাতার নকশার সাথে দেখা যায় প্রিয়জনের নাম জুড়ে দেওয়ার চলও।

এছাড়াও চাকা, স্বস্তিকা, বুটি, পালকি, পর্বত, বিবাহ, নববধূ-বর, ময়ূর, মাছ, গ্রামীণ জীবনের অবয়ব, স্মৃতির কোনো চিত্রপট- এসব মোটিফের উল্লেখ না করলেই নয়। সুদক্ষ হাতে গ্রামীণ নারীরা নৈপুণ্যের সাথে কাঁথার জমিনে ফুটিয়ে তোলেন এসব মোটিফ। কখনো জীবনের কোনো গল্প, কখনোবা গ্রাম্য পুঁথির সুন্দর কোনো চরিত্রের গল্পই সূঁচ দিয়ে কাঁথার গায়ে বিঁধে চলেন তারা।

নানা রকম ফোঁড়

নকশিকাঁথা সেলাইয়ের জন্য রয়েছে নানান রকম ফোঁড়। ফোঁড়গুলোর নৈপুণ্য ও সূক্ষ্মতার ওপর কাঁথার নকশার নান্দনিকতা নির্ভর করে সবচেয়ে বেশি। রান ফোঁড়, ডবল রান ফোঁড়, ডারনিং ফোঁড়, বখেয়া ফোঁড়, বেঁকি ফোঁড়, বোতামঘর, চেইন ফোঁড়, ডাল সেলাই, ক্রস সেলাই, উল্টো ক্রস সেলাই, পখুরি, তারা ফোঁড়, কাশ্মীরি সেলাই ইত্যাদি ফোঁড়ের মাধ্যমে নকশিকাঁথার জমিন ভরে ওঠে।

নকশিকাঁথার ফোঁড়গুলোয় একসময় মিশে থাকত গ্রাম-বাংলার গ্রামীণ বধূদের মৃদুস্বরে গল্পের ধুয়া ও  পানের বাটার শব্দ। থাকত লণ্ঠনের মৃদু আলোয় জীবনস্মৃতির আনাগোনার গল্প, বর্ষাকালের ঝুমবৃষ্টিতে দলবেঁধে আড্ডায় সন্ধ্যা করে দেওয়া সেই দুপুরগুলোর সেলাইয়ের বাক্সের রঙিন সুতোর ছড়াছড়ি। বাড়িতে বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানে অতিথিদের নতুন কাঁথায় বরণ করে নেওয়ার রীতি, নবজাতকের আগমনীতে ছোট্ট নতুন কাঁথার ফরমায়েশ বা নববধূর সাথে শ্বশুরবাড়িতে উপহারের বাক্সে নকশিকাঁথা- এসবের চল এখন প্রায় উঠেই যাচ্ছে এখন। তা বলে থেমে নেই এই শিল্পসৃষ্টি। গ্রামবাংলার নারীদের হাতেই টিকে আছে এখনো, পরিচিত হচ্ছে বিশ্বদরবারে। এখনো কোনো মুগ্ধ বিদেশিনী দেশে ফিরে সাথে নিয়ে যাওয়া এই মায়াবী নকশিকাঁথার উচ্ছল নকশিকথন শোনাবে তার প্রিয়জনদের, হাতে তার ওম নিয়ে।

 

তাহসীন নাওয়ার বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। amipurbo@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic