২০০৯ সাল থেকে বারবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনআরবি) থেকে বলা হলেও অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের দোকানগুলো স্বয়ংক্রিয় আর্থিক লেনদেনের যন্ত্রটি স্থাপন করেনি।
অনেক দোকান বৈদ্যুতিক আর্থিক যন্ত্র (ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা ইএফডি) ব্যবহারের পরিবর্তে প্রথাগত পদ্ধতিতে লেনদেন করছে এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রদান করা থেকে বিরত থাকছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশ জুড়ে ২২ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের দোকান রয়েছে। তন্মধ্যে, এনবিআর কেবল ১৩০০ দোকান ইএফডি স্থাপন করেছে।
রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ পর্যন্ত বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র আকারের সর্বমোট ২,৩৬,০০০ ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এর আগে এনবিআর-এর ভ্যাট বিভাগ ধারণা করেছিল, সারা দেশে ৪০ লক্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইএফডি স্থাপনের আওতায় পড়ে।
সরকারিভাবে বলা হয়েছে, মোট ভ্যাটের মাত্র ৩.০ শতাংশ আসে অভ্যন্তরীণ খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে।
২০০৯ সালে লেনদেনের যন্ত্রটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে এনএবিআর এ ভ্যাটের পরিমাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১০-১৫ শতাংশ।
প্রাথমিকভাবে সংস্থাটি নগদ অর্থ লেনদেনের যন্ত্র (ইসিআর) ব্যবহা বাধ্যতামূলক করে।
বোর্ড এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ৯ বছর পর তা বাতিল করেছে, কারণ কেন্দ্রীয় সার্ভার ছাড়া ইসিআর-এর চালানগুলো পর্যবেক্ষণ করা দুরূহ হয়ে পড়েছিল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০০৯ সালে ইসিআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিল এবং পরে ৯ আগস্ট, ২০১৮ তারিখে ইসিআর-এর পরিবর্তে ইএফডি ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এ সময়ের মধ্যে সরকারি আদেশ পালনের পাশাপাশি যন্ত্রটির ব্যবহারকে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে ১,২০০ জন ব্যবসায়ী ইসিআর ক্রয় করেছিল।
গত ২৫ আগস্ট থেকে যেসকল ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় ৫০ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে, তাদেরকে রাজস্ব বোর্ড বিনামূল্যে ইএফডি প্রদান করেছে।
প্রতিটি দোকানে স্থাপনের মূল্যসহ একেকটি ইএফডির মূল্য ২২,০০০ টাকা।
দেখা গেছে, ব্যবসায়ীদের কাছে ইএফডি সহজলভ্য না হওয়ার কারণে অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রথাগত লেনদেন ব্যবস্থাই মেনে চলছে।
ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের জন্য ইসিআর ব্যবহার আর বাধ্যতামূলক নয়, যদিও রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে ইএফডি-এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার চলছে।
পরীক্ষামূলকভাবে, রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে প্রথম পর্যায়ে ১০০টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১,২০০টি ইএফডি প্রদান করা হয়েছে।
এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য জানিয়েছেন, ভ্যাট বিভাগ ৩০ জুন নাগাদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিনামূল্যে ১০,০০০টি ইএফডি প্রদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
“বিপুল পরিমাণে ইএফডি বাজারজাত করার আগে আমরা যন্ত্রটির কর্মক্ষমতা এবং এটি ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়াগুলো যাচাই করছি।”
ইএফডি স্থাপন করা রয়েছে এমন দোকান থেকে ক্রয়ের জন্য গ্রাহকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে লটারির মাধ্যমে নগদ অর্থ পুরষ্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে এনবিআর ।
তিনি আরো বলেন, ক্রেতা এবং বিক্রেতা যান্ত্রিক আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে সচেতন না হওয়া পর্যন্ত এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দোকান এবং অন্যান্য আউটলেটের জন্য সরকার প্রায় ২ লক্ষ ইএফডি আমদানি করবে।
ইতোমধ্যে ৩১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লক্ষ ইএফডি আমদানি করার লক্ষ্যে টেন্ডার জারি করা হয়েছে।
অভিজ্ঞদের মতে, বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ভ্যাট সংগ্রহের প্রাক-পর্যায়ে গাফিলতির কারণে ২০২০-২১, চলতি অর্থ বছরে ভ্যাট সংগ্রহের পরিমাণ খুবই নগণ্য।
দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ভ্যাট সংগ্রহে ব্যাপক মাত্রায় পিছিয়ে পড়ার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম অর্ধাংশে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বোর্ডের খসড়া তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্যাট বিভাগে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি রয়েছে ১৬.৫৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতে অর্থ লেনদেনকে স্বয়ংক্রিয় করতে অসফল করার কারণ হিসেবে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং ডিজিটালাইজেশনের ধীর গতিকে দায়ী করেছেন।
দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যবসায়ী অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকদেরকে ছাড় প্রদান করে ইএফডি ইনভয়েস ছাড়াই পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করছে, যদিও এক্ষেত্রে রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্ব হচ্ছে ইএফডি-এর সঠিক ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা।
বেইলি রোড এবং কলাবাগান এলাকায় কিছু দোকান পরিদর্শনকালে জনৈক সংবাদদাতা এমন অসদাচারণের কথা জানিয়েছেন এবং এর কারণ হিসেবে চরম মাত্রায় গ্রাহকদের অসচেতনতা এবং কিছু ভ্যাট কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করেছেন।
দোকানগুলোতে ইএফডি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা রয়েছে এবং তাদের সকল লেনদেন সমূহ প্রতিনিয়ত রেকর্ড হচ্ছে।
যন্ত্রটির মাধ্যমে লেনদেন সম্পূর্ণ করার জন্য সিস্টেম থেকে অথোরাইজেশন কোডের প্রয়োজন হয় এবং বিক্রেতারা সিস্টেম থেকে কোড পাওয়ার পরই কেবলমাত্র লেনদেন সম্পূর্ণ করতে পারবে। বিক্রেতারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনুমোদিত কোড ছাড়া রশিদ প্রিন্ট করতে পারবে না।
যেসকল দোকান এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ইএফডি বা এসডিসি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, আসবাবপত্রের দোকান, কাপড়ের দোকান, ঘরের কাজে লাগে এমন ইলেকট্রনিক/ইলেকট্রিক্যাল পণ্য বিক্রয়কারী দোকান, সুপার শপ, জুয়েলারি দোকান, সিনেমা হল এবং কোচিং সেন্টার।
সিটি কর্পোরেশন এবং মূল জেলা শহরগুলোতে অবস্থিত বিলাসবহুল শপিং মলের দোকান ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য বড় ও মাঝারি আকারের পাইকারি ও খুচরা দোকানগুলোকে এ নিয়মের আওতায় আনা হয়েছে।
একটি বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের (বিআইএন) অধীনে প্রতিটি ইএফডিকে নিবন্ধন করতে হবে। একই দোকানে বিভিন্ন কাউন্টারে অনেকগুলো ইএফডি ব্যবহারের ক্ষেত্রে, সব ডিভাইসকে একটি মূল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের অধীনে নিবন্ধন করতে হবে।
ব্যবসায়ীদেরকে কমপক্ষে ছয় বছরের জন্য ইএফডি বা ইএফপি তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি আদেশ অনুযায়ী, ইএফডির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে ভ্যাট কর্মকর্তাগণ যেকোনো সময় সশরীরে যেকোনো দোকান পরিদর্শনে যেতে পারেন এবং পরিদর্শনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
পরিদর্শনকালে ভ্যাট কর্মকর্তাগণ ইএফডি স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অসঙ্গতি দেখতে পেলে, কর্তৃপক্ষ ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা জরিমানা আরোপ করতে পারে এবং একই ধরনের অপরাধ বারবার করলে সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার লক করে দেওয়া হতে পারে।
এনবিআর চাইনিজ সংস্থা এসজেডজেডটি থেকে ইএফডি আমদানি করবে এবং সিনেসিস আইটি সংস্থার কাছ থেকে ইনস্টলের ব্যাপারে প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ করবে।
পুর্বে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রেরিত একটি চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, মোট দেশীয় পণ্যে (জিডিপি) খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের অবদান প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা, বা শতকরা হিসেবে বললে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ শতাংশ।
কিন্তু, কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতার কারণে এ ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অপরদিকে, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি জনাব হেলাল উদ্দিন অভিযোগ করেছেন, কোভিড-১৯ মহামারিতে স্বল্প ব্যবসায়ের পরেও ব্যবসায়ীদের ইএফডিতে বিক্রয় দেখাতে বাধ্য করছেন কিছু ভ্যাট কর্মকর্তা ।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, মুন্সীগঞ্জে প্রায় ৪০০ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য বাধ্য করা হয়েছে, যদিও প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক লেনদেন ৫০ লক্ষ টাকার নীচে।
তিনি আরো বলেন, “আমি ইএফডি ইন্সটলেশনের বিপক্ষে নই, কিন্তু যেসকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইএফডি ব্যবহারের আওতায় পড়ে না, ভ্যাট কর্তৃপক্ষের উচিত নয় তাদেরকে এ ব্যাপারে হেনস্তা করা।”
