দৈনন্দিন জীবনে দূষণ এড়াই


অদ্রি বর্মন | Published: August 11, 2021 09:46:44 | Updated: August 11, 2021 15:28:02


দৈনন্দিন জীবনে দূষণ এড়াই

মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণে করা নানান কাজের মধ্য থেকে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন দূষণ। মানুষ অনেকসময় নিজের অজান্তেই নানা কাজ করে থাকে, যা ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। মাটি, পানি, বায়ুর মতো পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান প্রতিনিয়তই নষ্ট হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের একটি জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ মারা যায় পরিবেশ দূষণের কারণে। পরিবেশ দূষণের কারণে ২০১৫ সালে শহরাঞ্চলে প্রায় ৮০ হাজার ২৯৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বায়ু দূষণের কারণ ও ৩৪ হাজার মানুষের প্রাণ যায় পানি ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনের কারণে।

দূষণের নানান দিক

মানব জীবনে পরিবেশ দূষণের অনেকগুলো ভাগ রয়েছে । তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু হলো- খাদ্য দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, শব্দ দূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, বায়ু দূষণ।

বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা এবং প্রিভেনটিভ ডা. লেলিন চৌধুরী (মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) খাদ্য দূষণ নিয়ে বলেছেন, কিছু কিছু ক্ষতি আছে যা প্রত্যক্ষভাবে হয় যেমন- কীটনাশক মেশানো লিচু খেয়ে শিশু মৃত্যু বা বিষাক্ত মাছ খেয়ে অসুস্থ হওয়া। আবার কিছু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আছে যেমন- রাসায়নিক বা কীটনাশক, বিষাক্ত খাবার খেয়ে কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া।

বাঙালিদের বলা হয় মাছে ভাতে বাঙালি। বাংলাদেশে প্রচুর নদী ও ছোট ছোট খাল-বিল রয়েছে আর সেই জায়গায় রয়েছে প্রচুর মাছ। এর মধ্যে অনেক স্থানে জেলেরা জাল দিয়ে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় বিষ পানিতে দিয়ে মাছ ধরেন। এসব মাছ খেয়ে জনমানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে প্রতিনিয়তই।

দূষণের পক্ষে যারা

সুনামগঞ্জ হাওর অঞ্চলের কিছু কৃষকদের কাছে ফসল পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে যে ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে রথি বাবু (ছদ্মনাম) বলেন, এমনিতেই ফসলের ফলন কমে গেছে, তার মধ্যে যদি পোকায় ফসল নষ্ট করে ফেলে- সেজন্য কিছু বিষ দিয়ে পোকা মারতে হয়। অনেক আগে নিম পাতার রস ব্যবহার করে পোকা তাড়াতাম, কিন্তু এখন নিম গাছই পাওয়া যায় না। এর জন্য ক্ষতি জেনেও বিষ ব্যবহার করতে হয়।

স্নায়ুর সমস্যা, মাথাব্যথা, হাইপার টেনশন ও হার্টের সমস্যা- এসব রোগের একটি প্রধান কারণ শব্দ দূষণ। প্রতিদিন বিনা কারণে যানবাহনের হর্ন, অতিরিক্ত ভলিউম দিয়ে গান শোনা, জনসমাবেশে মাত্রাতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে শব্দ দূষণ হয়।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন- জন্মদিন, থার্টি ফাস্ট নাইট, হ্যাপি নিউ ইয়ার ইত্যাদি দিনে পাড়া-মহল্লায় এসব শব্দ দূষণের মূল কারিগর ডিজে পার্টি নিয়ে রবিন (ছদ্মনাম) নামক এক যুবককে জিজ্ঞেস করলে বলেন, সমস্যা তো কিছুটা হয় কিন্তু বছরে এক দুইদিনই তো আনন্দ-ফূর্তি করব, একটু কষ্ট করে সহ্য করলেই তো হয়।

আমাদের করণীয়

দৈনন্দিন জীবনে দূষণ এড়াতে শ্রীমঙ্গলের সেন্ট মার্থাস উচ্চ বিদ্যালয়ের এস.এস.সি পরীক্ষর্থী অন্বেষা দেবনাথ দোলা বলেন, আমার মা প্রতিদিন ঘরের খাবার রান্না করার সময় তরিতরকারির যে খোসা বের হয়, তা একটা নিদিষ্ট জায়গায় ফেলেন এবং কিছুদিন পর তা বাসার সবজি বাগানে দিয়ে দেন। এর ফলে আমরা কীটনাশকবিহীন কিছু শাক-সবজি খেতে পারি।

বর্ডার গার্ড পাব্লিক হাই স্কুল, শ্রীমঙ্গলের এস.এস.সি. পরীক্ষার্থী নুর সিদ্দিক চৌধুরী চা বাগান এলাকায় থাকেন। তিনি জানান, চা বাগান সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু বিভিন্ন মানুষ যখন বাগানে বেড়াতে যায়, তখন বাগানের পরিবেশ নষ্ট করে।

শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী পূর্ণা গোস্বামী বলেছেন, নিজেদের ঘরের বাজার করার জন্য প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার না করের আমরা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে পারি এবং প্লাস্টিক যেখানে সেখানে না ফেলে এক জায়গায় সংরক্ষণ করে ভাঙারিওলার কাছে বিক্রি করতে পারি । এতে করে প্লাস্টিক রিসাইকেলের মাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণ কমানো যাবে।

ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলা হলে তা পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ায় আর বায়ু দূষণের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে সিলেটের এক যুবক উদ্যোক্তা রহিম (ছদ্মনাম) বলেন, আমি বাড়িতে হাঁস পালন করি। হাঁসের প্রিয় খাবার মাছ। তাই বাড়িতে যে মাছ কাটা হয়, তার বাড়তি বর্জ্য হাঁসকে খেতে দিই। এর ফলে তা বাইরে পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় না আর হাঁসের ডিমও তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। এর ফলে বায়ু দূষণও কিছুটা রোধ করা যায়।

পক্ষ-বিপক্ষে ইচ্ছেমতো যুক্তি অবশ্যই স্থাপন করা যায়, তবে ক্ষতিটা শুধু এক পক্ষের হচ্ছে না, সবারই হচ্ছে।

"ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা

ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

ও সে সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি"

পরিবেশের এই নানা ধরনের দূষণ একসাথে দূর করা সম্ভব নয়, যদি সবাই নিজ নিজ জায়গায় সচেতন না হয়। তাই কবির সেই স্বপ্নের দেশ গড়তে সবাইকে সচেতন হয়ে দূষণ এড়াতে হবে, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে চেষ্টা করতে হবে ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে দূষণ রোধের।

অদ্রি বর্মন বর্তমানে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে সম্মান চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

audribormon@gmail.com

Share if you like