দেখতে দেখতে শেষের দিকে চলে এসেছে পবিত্র রমজান মাস। দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞে ব্যাপক পরিবর্তন আনা এ মাসের প্রতিটি দিনেই যেন দুটি ছোটখাটো উৎসব হয়ে যায় - একটি ইফতারে আর একটি সেহেরিতে।
সেহেরিতে যেমন তেমন, ইফতারে বাহারি খাবারের পসরা না নিয়ে বসলে যেন মন ভরে না কারোরই।
স্থানপার্থক্যে রোজা পালনে ভিন্নতা না থাকলেও রয়েছে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রমজান সংস্কৃতি। সেই অনুযায়ী দেশে দেশে বাহারি সব খাদ্য থাকে ইফতার কিংবা সেহেরির মেনুতে । মুসল্লিরা সাধারণত যার যার দেশের প্রধান খাদ্যগুলিকেই বেছে নেয় ।
দেশে দেশে ইফতারি
ইফতারের খাবার যেমনি থাকে আকর্ষণীয় তেমনি হয় মুখরোচক। দেশে দেশে নানা পদের বাহারি ইফতারের জগতে ঘুরে আসা যাক তবে!
আসিদা
আসিদা উত্তর - পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য। অনেকটা পুডিং জাতীয় খাদ্য যেটা তৈরি হয় গরম পানির সাথে গমের ময়দার মিশেলে খামির বানিয়ে। এটি সাধারণত মাখন বা মধু যোগে খাওয়া হয়, কিন্তু দেশভেদে পরিবেশনে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
লিবিয়াতে খেজুরের মিষ্টি রসের সিরায় আসিদা পরিবেশিত হয়। তিউনিশিয়ার মানুষ হারিসা নামে পাকা মরিচ আর গোলমরিচের একটি ঝাল - ঝাল মিশ্রণের সাথে মাখিয়ে খেয়ে থাকে।

ইথিওপিয়ানদের কাছে এই খাবারটিই জেনফো বা ওরোমো নামে পরিচিত। তারা এটা ইথিওপিয়ায় তৈরি বিশেষ ঘি (ঢাধার) সাথে মশলার পাক দিয়ে পরিবেশিত করে দই কিংবা দুধের সাথে।
ইয়েমেনের পরিবেশনাটি সবার থেকে আলাদা। তারা আসিদার খামিরের মাঝের অংশটা ফাঁকা রেখে নীচে দাবিয়ে দেয় কিছুটা। ওই অংশে প্রথমে টমেটোর একটা ঘন মিশ্রণ রাখে যেটা ঝাল মশলা আর মেথি সহযোগে প্রস্তুত করা হয়। তারপরে আসিদার চারপাশে মুরগি কিংবা ভেড়ার মাংস সিদ্ধের পানি ছড়িয়ে দেয়। এভাবে গরম গরম পরিবেশন করা হয়।
শরবা
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সুরুয়া জাতীয় খাদ্য হলো শরবা। এটি খেতে হয় রুটির সাথে। শরবা তৈরির মূল উপকরণে থাকে আলু, শিম আর মাংস। এই খাবারটি হজমে উপাদেয়। ইফতারিতে এটি রুচিবর্ধক হিসেবে কাজ করে।
মাহশি
মিশর ফারাওদের দেশ। মিশরের রান্না কুড়িয়েছে সারা বিশ্বের প্রশংসা। সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় আছে, এই রান্না ভারতীয় রান্নার মামাতো বোন। তাই খাবারগুলোর যেমন আছে রাজসিক ঢং, তেমনি আছে মিল প্রচুর।

মিশরের এই মাহশি হলো আমাদের চিরচেনা দোলমার মতোই একটা পদ। ধুন্দল (জুকিনি) কিংবা বেগুনের মাঝখানটায় গর্ত করে অন্য সবজি কিংবা মাংসের কিমা মশলা সহযোগে ভর্তি করা হয় । কখনো কখনো ভাত মেশানো থাকে পুরে। গর্ত করা তরকারিতে পুর ভর্তি করে তারপরে চাপানো হয় রান্নায়। তাবুইলে বা জাজিকি সসের সাথে খেতে হয়।
তাবৌলে
তাবৌলে হলো একটি সালাদ জাতীয় পরিবেশনা। তৈরি হয় পার্সলে, টমেটো, পেঁয়াজ, শসা, সেদ্ধ করা বালজার গমে জলপাই তেল, নুন আর লেবুর রস মাখিয়ে। খাদ্যটির জনপ্রিয়তা রয়েছে লেভেন্টে। অর্থাৎ আক্রটিরি, সাইপ্রাস, ইসরাইল, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, প্যালেস্টাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে গঠিত ভৌগোলিক অঞ্চলে।

হরীরা
এটি উত্তর আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্য। কিন্তু মরক্কো ও আলজেরিয়াতেও বহুল জনপ্রিয়। এটা দিয়ে ইফতারির পরিবেশনা শুরু হয়। হরীরা রান্নার উপকরণে থাকে মসুর ডাল, মটর ডাল, টমেটোর ঘন ক্বাথ, শিম, চা, ডিম, গরু, ভেড়া কিংবা মুরগির মাংস, পেঁয়াজ আর জলপাই তেল। অনেকটাই আমাদের হালিমের মতোই পরিবেশনা। স্বাদে বৃদ্ধি পায় যদি আগের রাতে রেঁধে পরের দিনে খাওয়া হয়। সারাদিনের রোজার পরে এটি একটি সরেস পরিবেশনা।

মাকলুবা
এক কথায় ইরাক, লেবানন আর জর্দানের রুসুইঘরের বিরিয়ানি। এই বিরিয়ানিতে মাংসের সাথে থাকে ভাজা আলু, ফুলকপি, বেগুন আর টমেটো । সবটা একটা বড় পাত্রে ভরে কেকের মতো আকার দেয়া হয়। আর উপর থেকে ছড়িয়ে দেয়া হয় পাইন বাদাম আর পার্সলে কুচি। মাহফিলে পরিবেশিত হয় সালাদ আর টক দইয়ের সাথে।

মানসফ
আরব অঞ্চলের জিভে জল আনা একটি পদ। ভেড়া বা ছাগলের দুধ এক ধরনের শক্ত দই তৈরি হয়, যাকে বলে জামিদ। এই জামিদ দিয়ে মাখিয়ে দুম্বা, উট কিংবা ভেড়ার মাংস রাঁধা হয়। এই পদটিই হলো মানসফ। রান্না শেষে উপর থেকে অনেকটা পরিমাণে কাঠবাদাম আর পাইন বাদামের কুচি ছিটিয়ে দেয়া হয়। আর জামিদের তরল সস ঢালা হয়। খাওয়া হয় ভাত কিংবা রুটির সাথে। এটি জর্দানের জাতীয় খাবার।

হারিস
মাংসের টুকরা মিলিয়ে গম সেদ্ধ করে রান্না হয় হারিস। এটি কাতারের বহুল জনপ্রিয় একটি স্বাস্থ্যকর খাবার, কেননা রোজাদারদের বেশ ক্যালোরি জুগিয়ে থাকে। তাছাড়া খাবারটি উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্যে উপকারী।

শামী কাবাব
পাকিস্তানের যেকোনো ইফতারের টেবিলে শামী কাবাবের জায়গাটা যেন বেশ স্থির। তন্দুর রোটি বা চাপাটির সাথে বেশ জুতসই। পশ্চিম থেকেই আমাদের ইফতারিতে আমদানিকৃত , যেকোনো কাবাবপ্রেমীর কাছে বেশ লোভনীয়।
বিরিয়ানি
মুঘলদের ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানির পরিবেশনা ছাড়া ভারতের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলির ইফতারি পরিবেশনা যেন অপূর্ণ। লাখনাউ, কলকাতা, বোম্বাই, হায়দ্রাবাদি, সিন্ধি - সব বিরিয়ানি এক কথায় লাজবাব। রসনার পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তি।
দেশে দেশে সেহেরি
সেহেরির জন্যে থাকে হালকা খাবার , কিন্তু খাবার গুলি আমিষ আর শর্করার ভালো উৎস হিসেবে কাজ করে।
ডিম ব্রিক
ব্রিক ডিম দিয়ে তৈরি পেস্ট্রির মতো একটা খাবার। মালসুকা নামে আটায় তৈরি রুমালের মতো পাতলা শীট থাকে। এটাকে ত্রিকোনাকারে ভাঁজ করা হয়। ভাঁজের মাঝটা ভরা হয় পেঁয়াজ কুচি, পার্সলে কুচি, টুনা মাছের কিমা আর হারিসা দিয়ে। তার উপর আস্ত একটা ডিম ভেঙে দিয়ে উপরে ভাঁজটা ফেলে দেয়া হয়। এবার গরম তেলে ভেজে নিলেই ডিম ব্রেক প্রস্তুত। তিউনেশিয়ানদের খুব প্রিয় খাবার ব্রিক। ডিমের তৈরি বলে মোটামুটি ভালো শক্তির উৎস, তাই সেহেরির জন্যে আদর্শ।

আফগানি বোলানি
বোলানি হলো পুর দেয়া রুটি। পুরে থাকে মাংসের কিমা, আলু, পেঁয়াজ কলি, মসুর ডাল, কুমড়া, লিক তরকারি। পুর ভরে রুটি গড়ে আগুনে শেকা হয়। খাওয়া টক দই বা দই দিয়ে পুদিনার চাটনি বানিয়ে। সাথে পানীয় হিসেবে রাখা হয় ডুঘ, যেটা তৈরি হয় দই দিয়ে।

আলু কি ভুজিয়া
পাকিস্তানিদের সেহেরির পরিবেশনাতে থাকে আলু ভাজি, স্থানীয় ভাষায় পরিচিত আলু কি ভুজিয়া নামে।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com
