কক্সবাজার জেলার টেকনাফের শাহপরী দ্বীপ থেকে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ফেরিঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ ১৬.১ কিলোমিটার সমুদ্র পথ নিয়ে বাংলা চ্যানেল।
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে ফটোগ্রাফার ও স্কুভা ডাইভার কাজী হামিদুল হকের নেতৃত্বে একটি দল এ পথ সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার পর হয় এই নামকরণ।
প্রতি বছর এ চ্যানেলে সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পুরো পথটি যারা সাঁতার দিয়ে পাড়ি দিতে সফল হন তাদেরকে এ প্রতিযোগিতার বিজয়ী হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিযোগীরা অংশ নিতে আসেন।
আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন মেনে এখানে অংশগ্রহণকারী সাঁতারুরা ফ্রি হ্যান্ড সুইমিং করে থাকেন। দীর্ঘ এ পথটিতে সাঁতারুরা সিঙ্গেল কিংবা ডাবল ক্রিস অতিক্রম করার সুযোগ পান।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ সাইফুল ইসলাম রাসেল বাংলা চ্যানেল ডাবল পাড়ি দেওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
ষড়জ অ্যাডভেঞ্চার ও এক্সট্রিম বাংলা কর্তৃক আয়োজিত 'ফরচুন বাংলা চ্যানেল-২০২১'- প্রতিযোগিতায় ৭৯ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন, যার মাঝে ৫২ জন এ চ্যানেল পাড়ি দিতে সক্ষম হন।
২০২১ সালে বাংলা চ্যানেল জয়ীদের মধ্যে একজন হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের ছাত্র সালাহ উদ্দিন। বিজয়ী ৫২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তার অবস্থান ছিল যৌথভাবে পঞ্চম।
তিনি জানান, এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হলে প্রথমে একটি বাছাই পর্বে অংশ নিতে হয়। বাছাই পর্বটি ঢাকার গুলশানে শাহাবুদ্দিন পার্কে অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী একজন প্রতিযোগীকে সকাল ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মোট চার ঘণ্টা পানিতে থাকতে হয়। যে এ চারঘণ্টা পানিতে থাকতে পারবে তাকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। অতঃপর প্রত্যেক প্রতিযোগীকে ১০-১২ হাজার টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হয় মূল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য।
২০ ডিসেম্বর প্রতিযোগীতায় অংশ নিই আমরা। ৮০ জন অংশগ্রহণের কথা থাকলেও ১ জন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেননি। আর সেখান থেকে ৫২ জন চ্যানেলটি পাড় দিতে সক্ষম হয়।
আর পুরো পথ জুড়ে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিযুক্ত ছিল ৪৮ টি উদ্ধারকারী বোট। প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার পরপর বোটগুলো নোঙর ফেলেছিল। এছাড়া বোটগুলোতে ছিল কিছু হালকা খাবার। কোনো প্রতিযোগী চাইলে সেখান থেকে কিছু খেয়ে নেওয়ার সু্যোগ ছিল। তবে তা খেতে হবে পানিতে থেকেই," যোগ করেন তিনি।
পুরো প্রতিযোগীতার মধ্যে প্রতিযোগীদের মনোবল কেমন ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহ উদ্দিন বলেন, যখন পুরো পথটি পাড়ি দিয়ে সেন্টমারটিন পৌঁছাই, তখন সবার মুখেই ছিল একটি উচ্ছ্বাসের প্রতিচ্ছবি। মনে হচ্ছিল এতদিন ধরে করা এত কষ্ট আজ সফল হয়েছে। তাছাড়া সমুদ্রে থাকাকালীন প্রত্যেকটি মুহূর্তও ছিল রোমাঞ্চকর।
যাত্রাপথের প্রতিকূলতা নিয়ে কথা বলেন সালাহ উদ্দিন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে অনেকসময় শরীরের মাংশপেশিতে টান লাগতো। তখন হাত ও পায়ের তালু এবং কোমরকে হালকা কসরত করে নিতাম। আর সেদিনের যাত্রাপথে ঢেউ ছিল সর্বনিম্ন ৫ ফুট এবং সর্বোচ্চ ৬-৭ ফুট। যার কারণে যাত্রাপথটি কিছুটা দীর্ঘ হয়েছিল। আর কুয়াশার কারণে আমি একবার ভুল করে মিয়ানমারের দিকে মোড় নিয়েছিলাম। পরে আবার সঠিক পথ ধরি।"
আগ্রহী কেউ যদি বাংলা চ্যানেল জয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান তাহলে কীভাবে তা করবেন জানতে চাওয়া হয় সালাহ উদ্দিনের কাছে।
বাংলা চ্যানেল সুইমিং নামক একটি ফেসবুক পেইজ রয়েছে যেখানে প্রতিযোগিতার যাবতীয় খবরাখবর দেওয়া হয়। এ পেইজটি অনুসরণ করার মাধ্যমে প্রতিযোগিতার খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানা যাবে। এছাড়া বিদেশী কেউ চাইলেও এখানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। বিদেশীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম-কানুন প্রযোজ্য হবে।"
বাংলা চ্যানেল বিজয়ীর সংখ্যা প্রত্যেক বছরই আগের বছরের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দেশীয় প্রতিযোগীর পাশাপাশি এ প্রতিযোগীতায় অংশ নিচ্ছে অনেক বিদেশী প্রতিযোগীও।
তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে আরো বেশি প্রচারণা চালানো গেলে এটি দেশি-বিদেশি মানুষের কাছে আরো বেশি জনপ্রিয়তা পাবে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
tanjimhasan001@gmail.com