দু’টি বাদে দেশের সব ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্প তাদের কাজ সম্পাদনের সময়সীমা অতিক্রম করেছে, যা ব্যাপক হারে খরচ বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে জানা যায়।
এখনো পর্যন্ত পদ্মা সেতু এবং এর রেল সংযোগ, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর সম্প্রসারণ, দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ এবং মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিকল্পনায় বিভিন্ন কারণে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৬ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প - এই দু’টি ফাস্ট-ট্র্যাক মেগা-প্রকল্পের কাজ পরিকল্পনা মাফিক হয়েছে, কোনো পরিমার্জনার দরকার হয়নি।
পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প সবচেয়ে পুরনো ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি যা ২০০৭ সালের আগস্টে অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মোট খরচের পরিমাণ ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেক বাকবিতণ্ডার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (ইসিএনইসি) প্রকল্পটিকে অনুমোদন দেয়।
বিশ্ব ব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশিদারদের সাথে তহবিলজনিত সমস্যার কারণে প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক বিলম্ব হয়।
২০১৪ সালের নভেম্বরে ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় প্রকৃত আনুমানিক বাজেটের (১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা) দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ (২০ হাজার ৫০২ কোটি) নিয়ে। নতুন সময়সীমা হিসেবে নির্ধারিত হয় ২০১৫ সালের নভেম্বর মাস।
২০১৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রকল্পে পরিবর্তন আসে, যেখানে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় এবং সময়সীমা গড়ায় ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত।
এর পরেরবার তৃতীয় পরিবর্তন হিসেবে খরচের পরিমাণ হয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা এবং দেড় বছর পিছিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ এর ডিসেম্বরে পৌঁছায়।
কিন্তু এই সময়ের মধ্যেও বিবিএ কাজ শেষ করতে না পারায় নতুন মেয়াদ হিসেবে চলতি বছরের জুন মাসকে ধার্য করা হয়।
একইভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে (বিআর) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি। প্রকল্পের অর্ধেকেরও বেশি অসম্পূর্ণ রয়েছে, যা ২০২৩ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।
এই রেল প্রকল্পটি ২০১৬ সালের মে মাসে ইসিএনইসি থেকে অনুমোদন পায়, যেখানে খরচের পরিমাণ থাকে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি এবং প্রকল্প শেষ করতে সময় দেওয়া হয় ২০২২ এর জুন মাস পর্যন্ত।
দুই বছর পর, ২০১৮ সালের মে মাসে ইসিএনইসি ব্যয়ের পরিমাণ ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা এবং সময় ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়ায়।
প্রকল্পে জড়িত কর্মকর্তারা বলেন যে, রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালের অক্টোবরে শুরু হলেও শেষ অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে এর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি।
গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে প্রকল্প নকশার মধ্যে কিছু ত্রুটি পাওয়া গেলে সেগুলো সংশোধন করা হয়েছে।
সেতু বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, মাওয়া ও জিঞ্জিরার রেললাইনের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৪.৮ মিটার ও ৫.২ মিটার ঠিক করা হয়, যেখানে মানদণ্ড ছিল ৫.৭ মিটার। এছাড়াও প্রস্থের আদর্শ মাপ ১৫.৫ হওয়া সত্তেও তা জিঞ্জিরায় ৯.৫ মিটার এবং মাওয়ায় ১০ মিটার দেখানো হয়।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে কর্মরত একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন যে, চলমান কোভিড অতিমারীসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে খরচ ও সময়সীমা উভয়ই সামনে বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, “প্রকল্প নকশার সাম্প্রতিক পরিবর্তন, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে কাজের ধীর গতি, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের নানা দাবি নির্দিষ্ট সময় ও বাজেটের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধা হিসেবে কাজ করেছে”।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ভারতের এনটিপিসি বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে গৃহীত আরেকটি ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্প রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাস্তব অগ্রগতি এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে যথাক্রমে ৬৮.৮৫ শতাংশ এবং ৬৯.২০ শতাংশ।
কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে জানা যায় যে, প্রকল্পের প্রথম ইউনিট ৬৬০ মেগাওয়াটের কাজ সম্পাদন করার কথা ছিল সেপ্টেম্বরে, যা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতোমধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছে।
তবে কোভিড-১৯ অতিমারীর আগেও বিএইচইএল-এর অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল না; এখন সেটাও আরো পিছিয়ে গেছে।
আরেকটি ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্প দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেল প্রকল্পও অনেক বিলম্বের সম্মুখীন হয়েছে কেননা এ বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটি মাত্র ৩২.২২ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি ও ৬১ শতাংশ বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
আইএমইডি এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার পরামর্শ দিয়েছে।
৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পও এগোচ্ছে শম্বুকগতিতে। বর্তমানে এর বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগ্রতি ৫০ শতাংশে রয়েছে। প্রকল্পটির সময়সীমা ২০২৩ এর জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে; অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি।
ইসিএনইসি-অনুমোদিত ‘মাতারবাড়ি ২x৬০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার পাওয়ার’ প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, যার মোট খরচ ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেন যে, কোভিডের কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিঘ্ন ঘাটায় তাদের সময়সীমা বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রাথমিক আর্থসামাজিক-উন্নয়ন প্রকল্প পায়রা বন্দরের কাজও বাড়তি খরচসহ দুই বছর পিছাবে।
জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য অতিরিক্ত ব্যয়ভার নিতে এই প্রকল্পের শেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ হাজার ৩৫০ কোটি থেকে আরো ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গত বছর নভেম্বরে ইসিএনইসি তৃতীয় পরিমার্জিত প্রস্তাবে এই পরিবর্তনগুলো অনুমোদন করে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত হওয়া এই প্রকল্প গৃহীত হয় ২০১৫ সালে, যখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১ হাজার ১২৮ কোটি। প্রথম পরিমার্জনায় এই হিসাব বেড়ে ৩ হাজার ৩৫০ কোটিতে পৌঁছায়।
পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও নেদারল্যান্ডের একটি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করার ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এখনো পর্যন্ত এই পরিকল্পনার মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
পায়রা বন্দরে একটি কোল টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ২১৪ কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এখনো পরিকল্পনাটিকে পুনর্গঠন করেনি।
২০১৯-এর জানুয়ারিতে ৩ হাজার ৯৮২ কোটি টাকার আরেকটি পায়রা বন্দর সংক্রান্ত প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল এবং প্রকল্পটি এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এখন এর ব্যয় ৪ হাজার ৫১৬ কোটি পর্যন্ত বাড়াতে এবং মেয়াদ দেড় বছর পেছাতে নতুন প্রস্তাবনা দেওয়া হবে।
ইতোমধ্যে জুলাই মাস পর্যন্ত রাশিয়ার সহায়তায় চলমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অগ্রগতি হয়েছে ৩৭.৯৯ শতাংশ।
২০২৫ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বলেছেন যে, এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে; নির্ধারিত সময় ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে পুরো উত্তরা-আগারগাঁও-ফার্মগেট-মতিঝিল রুটের ২০.১ কিলোমিটার লাইনের কাজ শেষ হয়ে যেতে পারে।
kabirhumayan10@gmail.com
