বর্তমানের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে প্রতিদিনকার যোগাযোগ রক্ষায় আমরা এখন পুরোপুরিভাবে যেন ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। বাড়ি থেকে বেড়িয়েই অল্প বা বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আমরা বেছে নিচ্ছি ইঞ্জিনচালিত বাস, কার, অটোরিকশা ইত্যাদি। পরিবেশ অধিদপ্তরের এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লক্ষ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহনের বেশিরভাগই ফিটনেসবিহীন এবং এগুলো থেকে নির্গত হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, সীসাসহ আরও ভয়ংকর নানা গ্যাস, যা ঢাকা শহরের বাতাসকে বিষিয়ে তুলছে।
অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহনের আধিক্যের জন্যে রাস্তায় দিনকে দিন যানজটের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় পরিবেশ দূষণ আর যানজট কমানোর জন্যে দরকার কিছু বিকল্প উপায় খুঁজে বের করা, আর এক্ষেত্রে অন্যতম ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারে দৈনন্দিন জীবনে যাতায়াতের কাজে সাইকেলের ব্যবহার। তবে শুধু পরিবেশ দূষণ বা যানজট নিরসন নয়, মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষাতেও সাইকেল চালানোর জুড়ি মেলা ভার। সাইক্লিংয়ের সুফলগুলো এক নজরে দেখে আসার আগে এই সাইকেল নামক যানটির উৎপত্তি হলো কোথায়, সেটি একটু জেনে আসা যাক। সফরের শুরুতে প্রাচীন মেসোপোটেমিয় সভ্যতার এক তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার ছিলো চাকা। পরবর্তীকালে যাতায়াতের জন্য এ চাকা ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সাইকেলের ধারণা পাওয়া যায় সর্বপ্রথম জার্মানিতে, তাও আবার ১৮১৭ সালের দিকে। জার্মানির কার্ল ভন ড্যারন দুই চাকার বাহন বানিয়ে আশেপাশের লোকজনকে তাক লাগিয়ে দেন। ড্যারনের এই বাহনটিই ছিলো দুই চাকার বাই সাইকেলের আদি নিদর্শন।
পরবর্তীতে ১৮৬০ সালের দিকে ফ্রান্সের পিয়েরে ল্যালামেন্ট, পিয়েরে মিশো আর আরনেস্ট মিশো ড্যারনের মডেলটির উন্নতি সাধন করেন ও দ্বিচক্রযানটির সামনের চাকায় প্যাডেল সংযোজন করেন। তাদের তৈরি বাহনগুলোই সর্বপ্রথম বাইসাইকেল নামে বাজারে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৮৯০ সালের দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় বাহন হিসেবে সাইকেলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। এবারে এই ইঞ্জিনবিহীন মানবচালিত দ্বিচক্রযানটির বহুমুখী সুফলের কথা জেনে নেয়া যাক।
পরিবেশ রক্ষায় সাইক্লিং
পরিবেশ অধিদপ্তরের এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এদেশের রাজপথের ইঞ্জিনচালিত যানবাহনগুলো প্রধানত তিন ধরনের জ্বালানি- ডিজেল, পেট্রোল ও সিএনজি ব্যবহার করছে। ইঞ্জিনের ডিজাইনে ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মানসম্মত জ্বালানি ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাই, নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট ব্যবহার ইত্যাদি কারণে এই ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড়-মার্কা গাড়িগুলো প্রতিনিয়ত বায়ু দূষণ ঘটাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে এ শহরের রাজপথে প্রতিদিন ঘুরে বেড়ানো ইঞ্জিনচালিত ফিটনেসবিহীন এই গাড়িগুলোকে দায়ী করা হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে উঠে এসেছে মূলত এ কারণে। এহেন অবস্থায় পরিবেশবিদরা দূষণ কমাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন সাইক্লিংয়ের ওপর। সাইকেল মানবচালিত দ্বিচক্রযান, তাই পরিবেশ দূষণে এর বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই। অধিকন্তু, ঢাকার রাস্তায় সাইকেলের ব্যবহার নগরবাসীকে দূষিত বায়ুর অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে, এ শহরের বাতাস থেকে কমিয়ে দিতে পারে সীসা বা পারদের মতো বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি।
যানজট কমাতে সাইক্লিং
বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’র প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯ এ যানজটের নগরী হিসেবে বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করেছিল ঢাকা। ২০২১ সালে এসেও মহানগরী ঢাকার যানজটের চিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এদেশের ছোটবড় বেশিরভাগ নগরীর রাস্তায় ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের আধিক্যের কারণে দেখা দেয় তীব্র যানজট। এ অবস্থার ফলে মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক মূল্যবান কর্মঘণ্টা, যা এড়াতে পারলে দেশের সমৃদ্ধির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেত। তাছাড়া ঢাকাবাসীও প্রতিদিনের এই নিদারুণ মানসিক অত্যাচার থেকে মুক্তি পেত।
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে সাইকেল হতে পারে এক যুগান্তকারী বাহন। দুই চাকার সাইকেল বেশ কিছু কম দূরত্বের রুটের বাস বা প্রাইভেট কারের জায়গাটি দখল করতে পারে সহজেই, বরং দামে কম আর চালানো সহজ দেখে এর গ্রহণযোগ্যতা অন্য যেকোনো বাহনের চেয়ে বেশি। তাই স্কুল বা অফিসগামী ব্যক্তিদের একটি নিজস্ব সাইকেল থাকা এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের কাজে এর ব্যবহার ঢাকা মহানগরীর যানজটের সমস্যা নিরসনে রাখতে পারে বড়সড় ভূমিকা।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাইক্লিং
সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন শরীরচর্চার বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে সাহা্য্য করতে পারে দৈনিক সাইক্লিংয়ের অভ্যাস। সাইক্লিং পা ও শরীরের বিভিন্ন পেশীর শক্তি বাড়ায়, দেহের পেশী সংবহনতন্ত্রকে আরো কার্যকর করে তোলে। সাইকেল চালানোর সময় হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পায় বলে সাইক্লিং হৃদপিণ্ডের সুস্থতা নিশ্চিত করে, উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়। শরীরের বাড়তি মেদ ঝড়িয়ে ‘ফিট’ থাকার জন্য সাইক্লিংয়ের জুড়ি মেলা ভার।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও সাইক্লিং রাখতে পারে কার্যকর ভূমিকা। মায়োক্লিনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনিক ৩০ মিনিট সাইক্লিংয়ের অভ্যাস ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৪০ ভাগ কমিয়ে দেয়। শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়, মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষাতেও সাইক্লিং খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লরি সান্তোস তার ‘দ্য সাইন্স অব সোশ্যাল ওয়েল বিইং’ প্রোগ্রামে বলেছেন, প্রতিদিন মাত্র আধঘণ্টার সাইক্লিং ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের রোগীদের জন্য কোনো অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্টের চেয়েও বেশি ফলপ্রসূ। মানসিক দুশ্চিন্তা, অবসাদ আর ক্লান্তি দূর করতে তাই সাইক্লিংয়ের অভ্যাস কোনো টনিকের চেয়ে নেহায়েত কম কাজ করে না।
সাইক্লিংয়ের এসব নানাবিধ সুফলের কারণে পৃথিবীব্যাপী এর জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপের নানা দেশের নাগরিকেরা নিজের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার তাগিদে বাস বা প্রাইভেট কারের পরিবর্তে সাইকেলকে বেছে নিচ্ছেন তাদের প্রতিদিনকার যাতায়াতের কাজে। জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী সাইকেলের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করতে ২০১৮ সাল থেকে ৩ জুনকে বিশ্ব সাইকেল দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ করে পরিবেশ রক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আদর্শ বাহন হচ্ছে সাইকেল। আর তাই সবকিছু বিবেচনা করে ২০২১ সালে ইউরোপ আমেরিকার ৫৬টি দেশ মিলে উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে সাইকেলের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়। তাই, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের একঘেয়ে জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে আমরাও বেছে নিতে পারি সাইক্লিং। অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতে ইঞ্জিনচালিত পরিবেশ দূষণকারী যানবাহনের পরিবর্তে সাইকেলের ব্যবহার যেমন পরিবেশ দূষণ রোধে ভূমিকা রাখবে, তেমন আমাদের মেদ-ভুরি কমিয়ে শরীর-মন চাঙা রাখতেও সাহায্য করবে দু’চাকার এই সফর।
তৌসিফা ফারহাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এম এ শিক্ষার্থী।
tousifa1995@gmail.com
