দুজন বিখ্যাত পর্বতারোহী পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। ঠিক তার এক বছর পর ১৯৫৪ সাল দ্বিতীয় পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট কে-২ জয়ের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তবে এবার অবশ্য ছিলেন ভিন্ন দুইজন। ইতালিয়ান পর্বতারোহী আচিলে কম্পাগননি এবং লিনো লাসেডেলি সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছান।
কে-২ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে ২৩৭ মিটার বা ৭৭৮ ফুট ছোট হলেও ৮ হাজার মিটারের পর্বতগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে দূর্গম এবং কঠিনতম জয় করার জন্য। কে-২ পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং বর্বর হওয়ার দরুন এটি জংলি পর্বত নামেও পরিচিত। অন্নপূর্ণা পর্বতশৃঙ্গের পর আট-হাজারি পর্বতশৃঙ্গগুলোতে আরোহণে মৃত্যুর হারের দিক থেকেও কে-২ এর অবস্থান দ্বিতীয়।
তবে এ কে-২ বন্দনার বিশেষ কারণ খোলসা করা হোক। এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীন প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কে-টুর চূড়ায় পা রেখেছেন ইতোমধ্যে। তবে একই সাথে এই সামিটে প্রথমবারের মত অংশগ্রহণ করেন আরো ৯ নারী পর্বতারোহী।
তারা হলেন- পাকিস্তানের সামিনা বেগ ও নায়লা কিয়ানি, অ্যান্ডোরার স্টেফি ট্রগুয়েট, ইরানের আফসানা হাসামিফার্দ, লেবাননের নেলি আত্তার, নরওয়ের ক্রিস্টিন হারিলা, তাইওয়ানের গ্রেস সেং এবং চীনের হাই জিং। পাকিস্তানের গিলগিত - বালতিস্তান ও চীনের জিংজিয়ানের তাক্সকোরগান সীমান্তে অবস্থিত হলেও এবারই কিন্তু প্রথম কোনো পাকিস্তানী নারী কে-২ এর চূড়াতে আরোহণ করেছেন। সামিনা বেগের পূর্বে পাকিস্তানের অনেকেই কে-২ পর্বতে উঠলেও নারী হিসেবে সামিনার প্রথম হওয়া নিয়ে তার প্রশংসাতেও মশগুল দেশটির গণমাধ্যম।
ওয়াসফিয়া নাজরীন দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে ২০১২ সালে এভারেস্ট চূড়া জয় করেন। এরপর বাংলাদেশের প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সেভেন সামিট ও জয় করেন তিনি। নাজরীনের ফেসবুকের স্ট্যাটাস থেকেই জানা যায় এবারে কে-২ জয়ের লক্ষ্যে বেরিয়েছেন তিনি। ১৭ জুলাই রাতে এ পর্বতারোহী কে-২ এর চূড়ায় ওঠার জন্য যাত্রা শুরু করেন। তিন বিখ্যাত পর্বতারোহী মিংমা তেনজি শেরপা, মিংমা ডেভিড শেরপা ও নির্মল পুরজা এ দুঃসাহসিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন।
অবশ্য আভাস পাওয়া গিয়েছিলে গত জুন মাসেই। সে সময়ে ফেসবুক লাইভে এসে জানিয়েছিলেন নয়া অভিজানের কথা পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বসে। জানিয়েছিলেন ব্রড পিকের চূড়া আরোহনের উদ্দ্যেশ্যে বের হবেন তিনি। এখানে সফলতা এলেই ছুট দেবেন কে-২ জয়ের অভিমূখে। তারই ধারাবাহিকতায় এ সফলতা এলো এবারে।
এবার ওয়াসফিয়া নাজরীনের সঙ্গে প্রথমবার কে-২ জয় করেছেন ইরানি আফসানেহ হাসামিফার্দ, লেবানিজ-সৌদি নাগরিক নেলি আত্তার ও পাকিস্তানের সামিনা বেগ। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের প্রথম নারী পর্বতারোহী হিসেবে কে-টু জয় করেছেন।
ইরান থেকে, আফসানেহ হাসামিফার্দ প্রথম মহিলা যিনি কে-২ সামিটে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি শখের বসে পর্বতারোহণ করে থাকেন। ইরানের মত দেশ থেকে পর্বতারোহন করার চ্যালেঞ্জ ও এএফপির কাছে তুলে ধরেছেন কথায় কথায়। একইভাবে, লেবানিজ-সৌদি ফিটনেস বিশেষজ্ঞ নেলি আত্তার প্রথম আরব মহিলা হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করে একটি নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছেন।
অ্যান্ডোরা স্টেফি ট্রগুয়েট কোনো সম্পূরক অক্সিজেন ছাড়াই কে-২ সামিট জয় করেছেন এবং তার এ জয় তিনি সের্গি মিংগোতে, আলি সাদপারা এবং অ্যান্টোনিও আতানাসকে উৎসর্গ করেছেনন যারা গত বছর কে-২ সামিট চলাকালীন মারা গিয়েছিলেন প্রতিকূল পরিবেশ ও আবহাওয়ার দরুন।
চীনের হাই জিং যিনি এর পূর্বেও অক্সিজেন ছাড়া আট হাজার মিটার উচ্চতা সম্পন্ন পর্বত আরোহন করেছেন তিনিও এবারে কোনো অক্সিজেন ছাড়াই সামিট শেষ করেন।
আন্তজার্তিক গণমাধ্যমের তথ্য মতে ২২ তারিখ শুক্রবার এ দুঃসাহসিক অভিজান কে-২ এর চূড়া জয় করে শেষ হয়। ১৯৫৪ সাল থেকে মাত্র ৪২৫ জন এটির চূড়ায় উঠেছেন, যার মধ্যে ২০ জন নারী। তবে এ অভিজান কতটা ভয়ানক তা একটি পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায়। এর চূড়ায় আরোহণকারী প্রতি চার জনের মধ্যে মৃত্যুর হার একজন। ফলে বোঝাই যায় কে-২ কত ভয়ংকর পর্বত। সেই পর্বত জয় করে আবারো বিশ্বের কাছে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে অদম্য সাহসী নারীদের এই যাত্রা।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
anmrifat14@gmail.com
