অন্নদাশঙ্কর রায় তার ‘পথে প্রবাসে’ বইয়ে প্যারিস সম্পর্কে বলেছিলেন "অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা"। এ কথাটি আমরা পড়েছিলাম ‘পারী’ প্রবন্ধে, নবম-দশম শ্রেণিতে। সে ভ্রমণকাহিনীতে পারী নগরীর বর্ণনা এতটা সুন্দর যে মনে হচ্ছিল, লেখকের হাত ধরে আমরাও পারী নগরীর বড় বড় রাস্তার আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি। গল্পটি পড়েছি প্রায় এক দশক পূর্ণ হলেও এর ছাপ এখনো আমাদের হৃদয়ে বর্তমান। ভেবে দেখুন, একটি ভ্রমণ কাহিনী আমাদের এতটা স্পর্শ করতে পারলে, সরাসরি ভ্রমণ কতটুকু ছাপ রাখতে পারে?
ভ্রমণই একমাত্র বিনোদন, যার হয়তো কোনো নেতিবাচক দিক নেই। আমাদের শরীর-মন, স্বাস্থ্য, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা ও সমগ্র জীবন জুড়েই এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এরকম ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত নানা দিক নিয়ে আজকের এই লেখাটির আয়োজন।
১. নিজেকে আবিষ্কার
জোয়া আখতার এর পরিচালনায় বলিউডের সিনেমা ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? সেইসাথে সিনেমায় হৃত্বিক রোশন অভিনীত অর্জুনের চরিত্রটির কথাও? সিনেমায় বাস্তবতায় অতি বিশ্বাসী অর্জুনও যখন প্রথমবার সমুদ্রের গভীরে বিচরণ করে আসে, তখন কিছুক্ষণের জন্যে সে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। কারণ, এই হিসাব-নিকাশের যুগে সে প্রথমবারের মতো নিজেকে আবিষ্কার করেছিল।
শন পেন পরিচালিত সিনেমা ‘ইনটু দ্য ওয়াইল্ড’-এও সদ্য পড়াশোনা শেষ করা ছেলেটিকে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দেখা যায়। পথে সে নানা ধরনের মানুষের সাথে মেশে, বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। একটা পর্যায়ে সে নিজেকে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করে।
ভ্রমণ ঠিক এমন অভিজ্ঞতাই দেয় আমাদের। যখন হিমালয়ের এক অচেনা শিশু ভিক্ষুর সঙ্গে সময় কাটাবেন, তখন তাদের হাসির মাঝে আপনি যেন স্বর্গীয় সুখ পাবেন। আবার মরুভূমির গায়কের সুরে পাবেন তীব্র দাবদাহে বেঁচে থাকার মন্ত্রনা।
২. অজানাকে জানা
অজানাকে জানার শেষ নেই। আর অজানাকে জানায় মানুষের আগ্রহের কমতিও নেই। বই বা ভ্রমণ ব্লগের মাধ্যমে এর কিয়দংশ জানার সুযোগ থাকলেও সত্যিকার অর্থে এর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় সরাসরি ভ্রমণের মাধ্যমে।
সরাসরি ভ্রমণ করে আপনি একটি জায়গার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- সেখানকার মানুষ সম্পর্কে জানতে পারবেন। এতে নিজের জানার খোরাক মেটে। আর আপনি যদি লেখক হন, তাহলে আপনার মাধ্যমে অন্যেরাও জানবে।
তাই আপনি যদি মানুষের সাথে মিশতে পছন্দ করেন, নতুন নতুন জায়গা সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক হন তাহলে দেরি না করে কোনো এক কাজের ফাঁকে ভ্রমণে বেড়িয়ে যান।
৩. স্বাস্থ্যগত উন্নতি
সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে ভ্রমণের বিকল্প নেই। শারীরিক-মানসিক উভয় প্রকার স্বাস্থ্যের জন্য ভ্রমণ জরুরি। অন্য যেকোনো টোটকার থেকে এটি বেশি কার্যকর। রবি ঠাকুরের বিখ্যাত গল্প ‘হৈমন্তী’তে ডাক্তারবাবুর উপদেশ মনে আছে কি? তিনি বলেছিলেন, হৈমন্তীর দরকার হাওয়াবদল; অর্থাৎ, ভ্রমণ।
প্রতিনিয়ত ঘরবন্দী থাকলে মানুষ শারীরিক-মানসিক উভয় দিক থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে। ঘরে থাকতে থাকতে বিষণ্ণতা জেঁকে বসে। জীবন হয়ে পড়ে ফ্রেমে বন্দী পুরাতন ছবির মতো, যার প্রিন্টও এতদিনে নষ্ট হয়ে গেছে। তাই ছবির নতুন করে বাঁধাই করা দরকার। ভ্রমণ আমাদের জীবনকে নতুন করে সাজাতে সহায়তা করে।
ইন্টার্ন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথের গবেষণা মোতাবেক, ভ্রমণের ফলে মানুষের মানসিক চাপ কমে। গ্লোবাল কমিশন অন এজিং অ্যান্ড ট্রান্স আমেরিকা সেন্টার ফর রিটায়ারমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড দ্য ইউএস ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের একটি যৌথ গবেষণায় জানা যায়, ভ্রমণের ফলে হার্ট অ্যাটাকের মাত্রা ৩০ শতাংশ কমে এবং ২০ শতাংশ হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি কমে যায়। ভ্রমণের ফলে স্বাস্থ্যগত উপকারিতা একটি গবেষণালব্ধ সত্য।
৪. নতুন কিছু ভাবা
ভ্রমণের ফলে আপনি আপনার নির্দিষ্ট ছকের বাইরে গিয়ে ভাবতে পারবেন। আপনার মধ্যকার সুপ্ত প্রতিভার সঞ্চার হবে সেই মুক্ত সময়ে, আপনি সৃজনশীল কাজের জন্য অনুপ্রেরণা পাবেন। ভ্রমণ কাহিনীর উপর ভিত্তি করে এখন পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে বহু গল্প, নাটক ও সিনেমা। ইবনে বতুতা যেমনটা বলেছিলেন “ভ্রমণ আপনাকে প্রথমে বাকরুদ্ধ করবে, তারপর আপনাকে বানাবে গল্পকার”।
এই কথাটির বাস্তব প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই মুহাম্মদ আবদুল হাইয়ের ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ দিন’, অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘পথে প্রবাসে’ এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘আরব মুল্লুকের মতো’ ইত্যাদি বইগুলোতে। জীবনানন্দের গ্রামবাংলার প্রকৃতি নিয়ে কবিতা, নজরুলের কবিতায় যথাযথ আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ অথবা শরৎচন্দ্রের বাস্তবধর্মী উপন্যাসগুলো; সবই কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবনব্যাপী দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনি নিজেও নতুন করে কাজ শুরু করতে পারবেন। বর্তমানের এই ডিজিটাল সময়ে ভ্রমণ ব্লগ অনেক জনপ্রিয়। তাই যখন যেখানেই যাবেন, আপনার সঙ্গে ক্যামেরা থাকলে আপনিও দারুণ সব ভ্রমণ ব্লগ তৈরি করতে পারবেন। সাথে যদি ভিডিও এডিটিংয়ের দক্ষতা থাকে, তাহলে তো আরো ভালো। ভ্রমণ আপনাকে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয়ার পাশাপাশি মনকে প্রফুল্ল রাখতে সহায়তা করবে। ফলে, আগামী দিনগুলোতে নতুন কিছু শুরু করতে অনুপ্রাণিত হবেন।
৫. নতুন সম্পর্ক
নতুন জায়গায় ভ্রমণের ফলে আপনার ওই জায়গার মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে। নতুন বন্ধু তৈরি হবে। ভাষা-সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অটুট বন্ধনে আবদ্ধ হবেন আপনি। নতুন জায়গার নতুন বন্ধু ছাড়াও আপনার ভ্রমণসঙ্গীদের নিয়ে গড়ে ওঠতে পারে এক নতুন বন্ধুবৃত্ত। অপরিচিত জায়গার অপরিচিত মানুষই হয়তো একসময় হয়ে যাবে আপনার একান্ত ঘনিষ্ঠ সঙ্গী।
ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষের সাথে সম্পর্কের পাশাপাশি নতুন জায়গার সাথেও সম্পর্ক তৈরি হবে। প্রকৃতির রাজ্যে নিজেকে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করবেন। প্রকৃতিকে ভিন্নভাবে দেখতে শিখবেন। তখন একেকটি জায়গা হবে একেকটি অভিজ্ঞতা। আর এসব নিয়েই গড়ে ওঠবে আপনার স্মৃতির কারখানা। দিনশেষে যখন বাড়ি ফিরবেন, তখন এই স্মৃতিগুলোই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। দূরে কোথাও আপনার বন্ধু আছে, তাই নিজেকেই কখনই একা মনে হবে না। এটাও ভ্রমণের বহু সৌন্দর্যের একটি।
ভ্রমণ থেকে মানুষ কখনো খালি হাতে ফেরে না। নির্ঘাৎ অসাবধানতাবশত ব্যাগ, টাকা, মুঠোফোনের চার্জার ইত্যাদি খোয়া গেলেও বিনিময়ে নিয়ে আসবেন দুর্লভ অভিজ্ঞতা, হাজারো স্মৃতি, নব জীবনের অনুপ্রেরণা ও বন্ধু। দিনশেষে আবিষ্কার করবেন নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক ‘অন্য আমি’কে। সাধু অগাস্টিন তাই যথার্থ বলেছেন, "সমগ্র বিশ্ব হলো একটি বই আর যারা ভ্রমণ করেনি, তারা যেন এর একটি পৃষ্ঠা পড়ল মাত্র”।
লেখক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
ইমেইল: mohd.imranasifkhan@gmail.com
