দুধেল কাহিনী


শুভদীপ বিশ্বাস | Published: May 09, 2021 11:03:51 | Updated: May 09, 2021 16:57:12


দুধেল কাহিনী

কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের একখানা কবিতা একসময়ে আমাদের বাংলা বইয়ে পাঠ্য ছিল। নাম আমার সন্তান সে কবিতার শেষের দিকে খেয়া নৌকার মাঝি ঈশ্বরী পাটনীকে যখন দেবীবর চাইতে বলেন, তখন তিনি বলেন, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে বোঝাই যাচ্ছে, তার কামনা হচ্ছে, তার সন্তান যেন সুখী-সচ্ছল থাকে। কিন্তু তা বোঝাতে দুধ-ভাত কথাটিই বলা কেন? ভাত নাহয় দীর্ঘকাল ধরে অঞ্চলের প্রধান খাদ্য, কিন্তু দুধ কেন? সেখানে বাগধারাটি তো মাছ-ভাতও হতে পারতো, নদীনালার দেশের মানুষ হিসেবে সেটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল।

হ্যাঁ, অন্য যেকোনো খাদ্যের বদলে দুধের কথা এজন্যই বলা হয়েছে যে, একটা দীর্ঘ সময় ধরে দুধ এবং দুগ্ধজাত খাদ্য অঞ্চলের মানুষের কাছে একইসাথে উন্নত পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় উৎসব-পার্বণ থেকে শুরু করে যেকোনো অনুষ্ঠানে দুধের গ্রহণযোগ্যতা দিনে দিনে এতটাই বেড়েছে যে, দুধ থেকে অগণিত খাদ্য খাদ্য উপকরণ তৈরি হয়েছে; শুধু আমাদের অঞ্চলেই নয়, গোটা পৃথিবী জুড়েই। তেমন কিছু দুগ্ধজাত খাদ্য খাদ্য উপকরণ নিয়ে আমাদের আজকের এই আলোচনা।

দুধ থেকে তৈরি সবচেয়ে প্রাথমিক খাদ্যটি খুব সম্ভবত দই। আজও বিয়েবাড়ি হোক বা অন্য যেকোনো অনুষ্ঠান, ভরপেট খাওয়াদাওয়ার পর শেষপাতে দই-মিষ্টি পরিবেশন করা হয়। আর এই দই শুধু আমাদের অঞ্চলেরই একচেটিয়া নয়, খাদ্য এবং খাদ্য সুস্বাদুকরণের প্রধান একটি উপকরণ হিসেবে দইয়ের খ্যাতি বিশ্বখ্যাত। দইয়ের প্রচলন অবশ্য আজ হয়নি, কিংবা আমাদের অঞ্চলেও হয়নি। প্রথমবারের মতো দই তৈরি হয় আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে, নোম্যাডিক নামক এক যাযাবর জাতির হাত ধরে। বলাই বাহুল্য, মানুষ তখনও তথাকথিত অসভ্য প্রাণী বৈ আর কিছুই নয়।

প্রাণীর দুধ এক স্থান থেকে অন্যস্থানে বহন করার জন্য পাত্র হিসেবে তারা ব্যবহার করত কোনো প্রাণীর পাকস্থলি দিয়ে তৈরি থলেতে। সে পাকস্থলিতে রাখা দুধই পাকস্থলিতে জন্মানো ব্যাকটেরিয়ার কবলে পড়ে গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দইয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। দই তৈরি করতে প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়ার নাম ল্যাকটোব্যাসিলাস বুলগারিকাস এবং স্ট্রেপ্টোকক্কাস থার্মোফিলাস। কালে কালে দই পাতার প্রক্রিয়াটির উন্নতি অবশ্যই ঘটেছে, এমনকি প্রযুক্তির হস্তক্ষেপে দই তৈরির যন্ত্রও জন্ম নিয়েছে, কিন্তু সনাতনী প্রক্রিয়ায় দই পাতার জন্য এখনও সেই দুধ জ্বাল দিয়ে তারপর ঠাণ্ডা করে পাঁচ থেকে বারো ঘণ্টা ফেলে রাখতে হয়। অবশ্য এভাবে স্রেফ টক দইই তৈরি করা যায়। যত বেশিক্ষণ দুধ ফেলে রাখা হবে, ব্যাকটেরিয়ার গাঁজনের মাধ্যমে তত টক দই- তৈরি হবে।

দই থেকে তৈরী যে খাদ্য উপকরণটি আমাদের দেশে পিঠাপুলি তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেটি খুব সম্ভবত ক্ষীর। অবশ্য ক্ষীরের ইংরেজি প্রতিশব্দ অনুসন্ধান করে রাইস পুডিং কথাটি পাওয়া যায়, যা দুধের সাথে চাল সহযোগে রান্না করা হয়, যেটি কিনা সোজা বাংলায় অন্য একটি মিষ্টান্ন, যাকে আমরা পায়েস বলি।

অবশ্য আমাদের অঞ্চলের ক্ষীরে কখনোই চালজাতীয় শস্য ব্যবহার করা হয়নি, আমরা শুধু দুধকে জ্বাল দিয়েই ক্ষীর তৈরি করি, যদিও ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষীরে স্বাদ গন্ধের জন্য কিসমিস, চেরি ইত্যাদি বিভিন্ন ফল, সাথে এলাচ-দারুচিনি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে, ক্ষীর তৈরির জন্য দুধকে জ্বাল দিয়ে ঘন করতে করতে অন্তত তিনভাগের একভাগ করে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে সেটি হবে অর্ধতরল ক্ষীর, যা বিভিন্ন মিষ্টি, যেমন রসমালাইয়ে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া, দুধ জ্বাল দিতে দিতে পরিমাণ যদি চারভাগের একভাগে নেমে আসে, তাহলে তার থেকে অপেক্ষাকৃত শুকনো খোয়া ক্ষীর তৈরি হয়, যা শুকনো মিষ্টি, যেমন ক্ষীরের বরফি, কানসাট ইত্যাদি তৈরিতে কাজে লাগে।

অবশ্য ক্ষীর নিজেও মিষ্টি হিসেবে কম যায় না। অন্তত আমাদের অঞ্চলে ক্ষীরের প্রচলন মিষ্টি হিসেবেই হয়েছিল। ক্ষীর শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ক্ষীরিকা থেকে, যার অর্থ হচ্ছে দুধ থেকে উৎপন্ন খাদ্যদ্রব্য। এর উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায়, চতুর্দশ শতকে গুজরাটে রচিত পদ্মাবত নামক বইয়ে। অবশ্য ধারণা করা হয়, এরও অনেক আগে থেকেই অঞ্চলে ক্ষীর অন্যতম মিষ্টদ্রব্য হিসেবে প্রচলিত ছিল।

পায়েস কে না চেনে! মিষ্টিযুক্ত দুধের সাথে চালের মিশ্রণে তৈরী অপূর্ব এই খাবারটি বাঙালির ঠিক একচেটিয়া না হলেও এর সাথে বাঙালির সম্পর্ক বহুদিনের। শুরুতে অবশ্য এর নাম ছিল মিষ্টান্ন, পানির বদলে মিষ্টি দুধে চাল দিয়ে অন্ন রান্না করা হতো বলেই খুব সম্ভবত নাম। শুরুতে এই দুধ, চিনি আর চালই পায়েসের প্রধান উপকরণ থাকলেও কালে কালে আরও যুক্ত হয়েছে কর্পূর, গোলাপজল, বাদাম, কিসমিস, এমনকি ডালিমও। সাথে সাথে এর কয়েকটি উন্নততর সংস্করণও আবিষ্কৃত হয়েছে; যেমন, আমের পায়েস, কাঁঠালের পায়েস ইত্যাদি।

পায়েসের উৎপত্তি খুব একটা পরিষ্কার নয়। আমাদের অঞ্চলে পায়েসের সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখ আছে খুব সম্ভবত রামায়ণের আদিকাণ্ডে। বোঝাই যাচ্ছে, জিভে জল আনা এই খাদ্যটি আমাদের অঞ্চলে বিশাল একটা সময় ধরে রান্না করা হচ্ছে। একসময় যে খাদ্যটি শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধর্মের পূজা-পার্বণে রান্না করা হতো, আজ তা পৌঁছে গেছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির ঘরে ঘরে। জন্মদিন হোক বা বিবাহবার্ষিকী, যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠানেই আজ সম্ভাব্য খাবারের তালিকায় পায়েসের সগৌরব উপস্থিতি অনায়াসে লক্ষ করা যায়।

আজকাল পিজ্জা থেকে পাস্তা, যেকোনো ফাস্টফুডে যে ট্রেন্ড সেটার খাদ্য উপাদানটি দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের স্বাদের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়, সেটি হচ্ছে পনির। অনেকে হয়তো চিজ বললেই ভালো চিনবেন। এটিও দুগ্ধজাত একটি খাদ্য উপাদান। পনির সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন দুগ্ধজাত খাদ্য। ধারণা করা হয়, আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে প্রথম পনির তৈরি করা হয়। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে পনিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাছাড়া পনির এবং পনির বানানোর প্রক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়, সে- প্রায় চার হাজার বছর আগেকার কথা।

দইয়ের মতোই পনির তৈরিতেও পশুর পাকস্থলিতে করে দুধ পরিবহনের ঘটনার কথা বলা হয়। জাবর-কাটা পশুদের পাকস্থলিতে রেনেট নামক একধরনের এনজাইম থাকে, যা দুধ থেকে দই আর ঘোলকে আলাদা করে। সেই দধিকৃত দুধকে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করার মাধ্যমেই পনির তৈরি শুরু হয় বলে অনেকে মনে করেন।

আজকের বিশ্বে পনির বা চিজ সবচেয়ে পরিচিত একটি খাদ্য উপাদান, এবং এর রকমফেরও অবাক করার মত। মোজারেলা, শেডার, পারমিজান আরও অনেক রকমের পনির ব্যবহারে বিভিন্ন খাদ্য অবধারিতভাবে হয়ে ওঠে সুস্বাদু, সে ঘরেরই হোক, বা রেস্তোরাঁর।

সকালের নাস্তায় পাউরুটির সাথে, কিংবা ভারি খাবার রান্নায় তৈলজাতীয় দ্রব্য হিসেবে হোক, মাখনের বিকল্প খুব সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। সব কাজের কাজী এই দুগ্ধজাত খাদ্যটির বয়সও কিন্তু খুব একটা কম নয়। প্রাচীন রোমে কারো ঠাণ্ডা লাগলে পথ্য হিসেবে রোগীকে মাখন গেলানো হতো। তাছাড়া আমাদের উপমহাদেশে গত তিন-হাজার বছর ধরে হিন্দুরা মাখন থেকে ঘি প্রস্তুত করে তা নানান দেবতাদের প্রতি উৎসর্গ করছেন। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবতে মাখনের কথা বলা হয়েছে, তাছাড়া বাইবেলেও মাখনের উল্লেখ আছে উদযাপনের খাদ্য হিসেবে।

প্রাচীন এই খাদ্যটির প্রস্তুতপ্রণালী অবশ্য এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সনাতন, যদি না তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হয়। পাত্রের মধ্যে দুধ রেখে তা অনবরত মন্থনের মাধ্যমে দুধ ঘন করা হয়, অতঃপর তা থেকে তৈরি হয় উৎকৃষ্ট শ্রেণির মাখন। যদিও আমাদের দেশে মাখন অবশ্য ততটাও জনপ্রিয় নয়, সেটার কারণ খুব সম্ভবত আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত শ্রেণি, যাদের কাছে এখনও মাখন দ্রব্যটি অনেকটাই বিলাসিতার শামিল।

এগুলো ছাড়াও দুগ্ধজাত আরও অনেক খাদ্য খাদ্য উপাদান আছে। যেমন, ঘোল, দুধ থেকে পাওয়া একটি উপজাত, যাকে আমরা মাঠাও বলে থাকি। যদিও দুগ্ধজাত দ্রব্যের মধ্যে আমাদের ঘোলকে সবচেয়ে নিচু আসনে বসানো হয়, কিন্তু প্রচণ্ড গরমের সময় ক্লান্তি দূর করতে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে এর কোনো জুড়ি নেই।

তো গেলো আমাদের অঞ্চলে পরিচিত কয়েক রকম দুগ্ধজাত খাদ্যের কথা। এরকম হাজার হাজার দুগ্ধজাত খাদ্যদ্রব্য ছড়িয়ে আছে গোটা পৃথিবী জুড়ে, এবং সেগুলো যে সবসময়ই আমাদের স্বাভাবিকভাবে চেনা গবাদি পশুদের দুধ থেকে তৈরি হয়, তা কিন্তু একদমই নয়। সেই প্রাচীনকাল থেকেই গবাদিপশুদের দুধ থেকে তৈরি হওয়া খাদ্য মানুষের খাবারের তালিকায় নিজের জায়গা করে নিয়েছে, পুষ্টিতে তাকে করেছে সমৃদ্ধ। এই পুষ্টিমান স্বাদের কল্যাণে দুধ দুগ্ধজাত খাদ্যগুলো মানুষের জীবনের আরও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ুক, প্রত্যেক বাঙালির সন্তানই থাকুক দুধে-ভাতে, এটাই কাম্য।

শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com

Share if you like