মাঝরাতে কি আচমকা ঘুম ভেঙে গেছে? কোনো এক দুঃস্বপ্নের তাড়নায় জেগে উঠেছেন? এমন দুঃস্বপ্ন, যা কিনা বাস্তবের চাইতেও অনেক বেশি দুঃসহ, তাড়া করে বেড়িয়েছে কি আপনাকেও? আশপাশের সবাই যখন শান্তির ঘুমে ডুবে আছে, আপনি তখন ঘাম জবজবে শরীর নিয়ে এক গ্লাস পানির কাছে আশ্রয় খুঁজছেন। এর কিছুটা পর আপনি হয়তো আবার ঘুমিয়েও পড়ছেন, কিন্তু সেই দুঃস্বপ্নের ঘোর হয়তো এত সহজে কাটেনি, রেশ রয়ে গেছে পরদিন সকালেও।
আমরা সবাই কখনো না কখনো এমন দুঃস্বপ্নের শিকার হয়েছি। কেউ হয়তো ভুলে গিয়েও ভালো থাকি, কেউ আবার বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখতে চাই। এই খতিয়ে দেখতে চাওয়া লোকেদের জন্যই আজকের এই লেখাটি।
দুঃস্বপ্ন কেন দেখছেন, এ প্রশ্নটি মাথায় আসার পর গতরাতে দেখা দুঃস্বপ্নটি বিশ্লেষণ করুন। দুঃস্বপ্নে দেখা ঘটনা, তার মধ্যে থাকা চরিত্রেরা আপনার বাস্তবজীবনের সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত-সে যোগসূত্র খুঁজুন। দুঃস্বপ্নে আসা আতঙ্ক আপনার অবচেতনের কোন ভয়কে আপনার সামনে উপস্থাপন করতে চাইছে, তা বুঝতে পারলে আপনি আপনার দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা পাবেন।
স্বপ্ন মূলত আসে ঘুমের আরইএম (REM) স্তরে, আর দুঃস্বপ্নের আগমন ঘটে এ স্তরের শেষ দিকটায়। দুঃস্বপ্নের জন্ম কোনো অবাস্তব বা অলীক জগতে নয়, এ আমাদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘটনার মিশেলে সৃষ্টি হওয়া বিকৃত এক রূপ। বেশির ভাগ দুঃস্বপ্নের পর কোনো দৃশ্য বা ঘটনা প্রবল হয়ে ধরা দেয়, তাই সত্যি-মিথ্যার পার্থক্য ঠাহর করে উঠতে সময় লাগে।
বড়দের চেয়ে ছোটরাই দুঃস্বপ্ন বেশি দেখে। মায়ো ক্লিনিকের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোটামুটি তিন থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে দুঃস্বপ্নের আনাগোনা শুরু হয়ে যায় এবং ১০ বছর বয়সের পর তা কমতে শুরু করে। এটি সাধারণ বিবৃতি, ব্যতিক্রম ক্ষেত্র নিশ্চয়ই রয়েছে। ছোটদের দুঃস্বপ্ন বেশি দেখার কারণ হতে পারে তাদের কাল্পনিক জগতে মুহুর্মুহু বিচরণ। সময়টা যখন পরী-ভূত আর দৈত্য-দানো নিয়ে ভেবেই কাটে, ঘুমেও যে তারা হানা দেবে, এ তেমন আশ্চর্যের নয়।
এ নিয়ে জন লেননের বেশ উপভোগ্য একটি উক্তি রয়েছে—
‘অপ্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আমি সবকিছুই বিশ্বাস করি। তাই আমি পরী, কিংবদন্তি, ড্রাগন-সবই বিশ্বাস করি। এদের সবার অস্তিত্ব আছে, যদি আপনার মস্তিষ্কে হয়, তবুও। এটা কে নিশ্চিত করবে যে স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন আমাদের বর্তমানের মতোই বাস্তব নয়?’
দুঃস্বপ্ন নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত হতে পারে। তবে যত নিয়মিতই হোক, দুঃস্বপ্নের সঙ্গে অভ্যস্ততা কারও না হওয়াটাই কাম্য। ‘ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস’ বইয়ে তো সিগমুন্ড ফ্রয়েড সেই কবেই দিয়ে গেছেন স্বপ্নের বিশদ ব্যাখ্যা।
তাই স্বপ্নের যেকোনো শাখা নিয়ে আলোচনায় তাঁকে স্মরণ করা আবশ্যক। তাঁর মতে, মনের অবদমিত কামনা-বাসনা চেনা রূপে কল্পনার মিশেল ঘটিয়ে আমাদের স্বপ্নে আসে, আর দুঃস্বপ্নও তার বাইরে নয়।
স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের মাঝের ফারাক এ-ই যে, সকল দুঃস্বপ্নই স্বপ্ন; তবে সকল স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন নয়। আপনি যদি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে থাকেন, তবে এই লাইন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার মনে পড়বে হাইস্কুলে পড়া রসায়নের সেই বিখ্যাত কথা ‘সকল ক্ষারই ক্ষারক, তবে সকল ক্ষারক ক্ষার নয়’! অর্থাৎ দুঃস্বপ্ন স্বপ্নের ‘নেতিবাচক’ রূপ, যা আপনাকে ভয় পাইয়ে দেবে এবং নেতিবাচক ভাবনাগুলোকে উসকে দেবে। সেটির ফলাফল ও প্রভাব কতটুকু থাকবে, তা আপনার মস্তিষ্কের সহ্যশক্তির ওপর নির্ভর করবে।
সাইকোলজি টুডে’র একটি প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে জেনে নেওয়া যাক দুঃস্বপ্নের উপসর্গগুলো:
১. স্বপ্নটি আপনার কাছে প্রবল বাস্তব ও ভয়াবহ মনে হবে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপনি জেগে উঠতে চাইবেন, কিন্তু পারবেন না যদি না বাহ্যিক কোনো সংস্পর্শে আসেন।
২. দুঃস্বপ্ন একটা সময় পর আপনাকে জাগিয়ে দেবে।
৩. অনেক ঘাম হবে ও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাবে।
৪. জাগার পর আপনি পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারবেন না এবং দুঃস্বপ্নে কী দেখেছেন, তা নিয়ে বারবার ভাবনা চলে আসবে।
৫. দুঃস্বপ্নের ধরণ বা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আপনার পরবর্তী মানসিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। সেটা রাগ, গভীর দুঃখ, বিরক্তি, ঈর্ষা-নেতিবাচক যেকোনো অনুভূতিই হতে পারে।
দুঃস্বপ্নকে একটা সীমা পর্যন্ত স্বাভাবিকই ধরা যেতে পারে, কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাকে মানসিক সমস্যার ঘরানায় ফেলা যায়। এখন একটু জেনে নিই, ঠিক কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে আমরা দুঃস্বপ্নকে মানসিক সমস্যার আখ্যা দেব—
১. নিয়মিত দুঃস্বপ্ন দেখা
২. শুধু ঘুম বা জেগে ওঠার পরই নয়, দিনের অন্যান্য সময়ও এই দুঃস্বপ্ন নিয়ে বারবার ভাবতে থাকা, ভুলতে না পারা ইত্যাদি। অর্থাৎ দুঃস্বপ্ন যদি আপনার রাতের ঘুম হারাম করার পর দিনের শান্তিও নষ্ট করে, তবে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।
৩. দিনের বেলা বা কাজের সময় প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভূত হওয়া, বারবার ঘুমিয়ে পড়া, চোখের সামনে থেকে ঘুমের পর্দা না সরা ইত্যাদি।
৪. অন্ধকারে ভয় পাওয়া
৫. একা ঘুমোতে ভয় পাওয়া
৬. স্মৃতিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া
ওপরের এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে প্যারাসমনিয়া বলে। এর নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি, তবে এমন অনেক ঘটনা বা চিন্তা রয়েছে যা এই সমস্যাটিকে উসকে দেয়। এর মধ্যে থাকতে পারে ব্যক্তিগত দুঃখ, কারও ওপর বহুদিন ধরে পুষে রাখা রাগ, প্রিয়জনের মৃত্যুভয়, সম্পর্কের বিচ্ছেদ, অপরাধবোধ, কেউ ছেড়ে যাওয়ার ভয়, শারীরিক অসুস্থতা, পুরোনো কোনো ক্ষত ইত্যাদি এবং আরও অনেক কিছুই। অতিমাত্রায় মাদকদ্রব্য বা ড্রাগ গ্রহণের কারণেও প্যারাসমনিয়া হতে পারে। ভূতের বই বা সিনেমা অনেকেরই পছন্দের তালিকায় থাকে, তবে সেগুলো শুধু দেখার সময় ‘ভয়ের আনন্দ’ সৃষ্টিই করে না, বরং দেখার পর ঘুমের মধ্যে এসে উদ্রেক করতে পারে ভয়াবহ সব দৃশ্য ও চরিত্রের।
নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ‘দ্য গুড সাইড অফ ব্যাড ড্রিমস’ নামক একটি ভিডিও প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে এক মজার তথ্য। কিছু গবেষক ধারণা করছেন যে, দুঃস্বপ্ন কিছু ক্ষেত্রে আমাদের নেতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। দুঃস্বপ্নের কারণে নেতিবাচক অনুভূতি ও ঘটনাগুলো স্মৃতিতে পরিণত হয় এবং আমরা ভাবতে শুরু করি, যা হয়েছে, তা অতীতেই রয়ে গিয়েছে। এতে করে দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে মানবমস্তিষ্কে গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত ডিফেন্স মেকানিজম।
দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি কীভাবে পাওয়া যাবে—এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার নিজের অবচেতনেই। দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পেতে গেলে নিজের শরীর ও মন সুস্থ রাখার বিকল্প নেই। ক্ষতিকারক ঘটনা, মানুষ ও দ্রব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে শিখুন। দুঃস্বপ্নে নয়, এবার থেকে স্বপ্নে বাঁচুন!
