Loading...

দণ্ডিত আসামি বাইরে, মাসিক ৫ হাজার টাকায় সাজা ভোগ করছেন আরেকজন

| Updated: January 31, 2022 16:02:31


সোহাগের নামে কারাগারে রয়েছেন এই হোসেন। সোহাগের নামে কারাগারে রয়েছেন এই হোসেন।

দণ্ডিত ব্যক্তি রয়েছেন বাইরে, টাকার বিনিময়ে তার হয়ে সাজা খাটছেন আরেকজন। এ যেন আয়নাবাজি সিনেমার বাস্তব রূপ!

প্রায় ১১ বছর আগের একটি হত্যাসহ দুটি মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সোহাগ (৩৪) এখন গ্রেপ্তার হলেও তিন বছর ধরে সোহাগ সেজে কারাগারে রয়েছেন আরেকজন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

কোভিড টিকা নিতে যাওয়া সোহাগকে গ্রেপ্তারের পর রোববার র‌্যাব জানিয়েছে, কারাগারে যিনি রয়েছেন তিনি সোহাগেরই ফুপাত ভাই মো. হোসেন (৩৫)। মাসিক ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে জেল খাটছেন তিনি।

২০১০ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকার কদমতলী থানার আউটার সার্কুলার রোডের নোয়াখালী পট্টিতে হুমায়ুন কবির টিটু নামের এক ব্যক্তিকে মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।

কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। তাতে বড় সোহাগকে এক নম্বর এবং মামুন (৩৩), ছোট সোহাগসহ (৩০) অজ্ঞাতনামা আরও চারজনকে আসামি করা হয়।

সে মামলায় সেই বছর ২২ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হন বড় সোহাগ। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ মে জামিনে মুক্তি পেয়ে গা ঢাকা দেন তিনি।

২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর মামলার রায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় বড় সোহাগকে। কিন্তু তখনও তিনি ছিলেন পলাতক।

সোহাগের নামে কারাগারে রয়েছেন এই হোসেন।সোহাগের নামে কারাগারে রয়েছেন এই হোসেন।

রায়ের পর ‘সোহাগ’ ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠায়।

কিন্তু এখানে সোহাগ নামে হোসেনই আসলে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন বলে র‌্যাব জানিয়েছে।

র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক মাহফুজুর রহমান রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদকাসক্ত হোসেন অর্থাৎ, নকল সোহাগ মাসিক ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে জেল হাজতে যায়।

 “হোসেন মাদকাসক্ত হওয়ায় এবং আসল সোহাগ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে সখ্য গড়ে উঠে। হোসেনকে জেল হাজতে পাঠানোর আগে তাকে দুই-তিন মাসের মধ্যেই বের করে নিয়ে আসবে বলে আশ্বস্ত করে সোহাগ।”

র‌্যাব কর্মকর্তা মাহফুজুর বলেন, “গত বছরের মাঝামাঝি এক সাংবাদিক টিটু হত্যা মামলায় একজনের পরিবর্তে অন্যজন জেলা খাটার বিষয়টি আদালতের নজরে নিয়ে আসলে আদালত কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চায়। প্রতিবেদনে ২০১০ সালে গ্রেপ্তার আসামি সোহাগ আর বর্তমানে হাজতে থাকা নকল সোহাগের অমিলের বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের রিপোর্টে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়।"

বিষয়টি জানার পর গত বছরের অগাস্ট থেকে র‌্যাব-১০ এর অপারেশন টিম ও র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা দল কাজ শুরু করে। এরই মধ্যে আদালত প্রকৃত আসামি সোহাগের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

এদিকে অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৮টায় ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকা থেকে বড় সোহাগকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক মাহফুজুর। এরপর রোববার বিকালে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি।

টিকা নিতে গিয়ে ধরা

র‌্যাব কর্মকর্তা মাহফুজ বলেন, প্রকৃত সোহাগ দেশত্যাগের চেষ্টা শুরু করেছিল। এর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র পরিবর্তন করে পাসপোর্ট তৈরি করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসাও সংগ্রহ করেন।

 “দেশ ছেড়ে পালাতে এনআইডি কার্ড সংশোধন করে বাবার নাম গিয়াস উদ্দিনের জায়গায় মামা শাহ আলমের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন সোহাগ। সেই এনআইডি কার্ড ব্যবহারে ১০ হাজার টাকা খরচ করে দালালের সহযোগিতায় পাসপোর্ট তৈরি করেন। মামাত ভাইয়ের মাধ্যমে ভিসা করতে তিনি খরচ করেন আরও ৫০ হাজার টাকা।”

“দেশ থেকে পালানোর জন্য সব কাজ শেষ করেই ফেলেছিলেন সোহাগ। কিন্তু কাল হয়ে দাঁড়ালো করোনাভাইরাস। দেশত্যাগের ক্ষেত্রে করোনার টিকা বাধ্যতামূলক হওয়ায় শনিবার করোনাভাইরাস টিকার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ নেওয়ার জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখান থেকেই তাকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই,” বলেন এই র‌্যাব কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, সোহাগ অটো চালক হলেও তিনি মূলত পেশাদার অপরাধী। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় দুটি হত্যা মামলা, দুটি অস্ত্র মামলা ও ছয়টি মাদক মামলাসহ ১০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে টিটু হত্যাসহ দুটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়ছে তার।

এনআইডির তথ্য পরিবর্তন করে ও পাসপোর্ট  তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক বলেন, “প্রথমত আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আসল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলাম। এখন ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি দেখভাল করবেন।

“জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে র‌্যাব সদর দপ্তর যদি মনে করে এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি র‌্যাবের তদন্তাধীন বিষয়, তাহলে আবেদন করে মামলার তদন্তভার চাওয়া হবে।”

কীভাবে আসল সোহাগের পরিবর্তে নকল সোহাগ আদালতে জামিন চাইল এবং কারাগারে গেল, এ পেছনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আইনজীবীর দায় কতটুকু, সেই প্রশ্নও করা হয় র‌্যাব কর্মকর্তাকে।

মাহফুজুর বলেন, “আদালতে আসামি বদলে ফেলার বিষয়টি ধরতে পারা কঠিন। তবে এইক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের সেটি পারার কথা। কারণ তাদের কাছে ডাটাবেইজ আছে ও আসামি সনাক্তকরণের বিবরণিও সংরক্ষিত থাকে। তবে এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রকৃত আসামির আইনজীবী জেনেই নকল সোহাগের জামিন চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিল। তার দায় তদন্তকারী কর্মকর্তা নিশ্চয় খুঁজবেন।”

Share if you like

Filter By Topic