আমরা করবো জয়!
ঢাক ডুম ঢাক ডুম বাজে বাংলাদেশের ঢোল গানটা বেজে উঠল আর মঞ্চে আপন মনে, মুক্ত তালে নেচে উঠল কয়েকজন বাংলাদেশি শিশু। তেহরানের ইসিও মিলনায়তনে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সমবেত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ নানা দেশের রাষ্ট্রদূত, শিক্ষাবিদ, কূটনৈতিক, ইরানের পবিত্র নগরী কোম থেকে আগত অতিথিবৃন্দ, রেডিও তেহরানের সাংবাদিকরাসহ প্রবাসী ও ইরানি মিলিয়ে নানা ব্যক্তিত্বের মানুষের মধ্যে আনন্দের সাড়া পড়ে গেল। আর ইরানের বসন্ত দিনের নিশিতে যোগ হলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মেলার একটি রাত।
বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দীন সেকান্দর শাহ (৭৬৮ হি.) সিংহাসনে আরোহণের পর বুলবুলে সিরাজি, গজল সম্রাট কবি হাফিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সোনার বাংলায় তাঁর রাজধানীতে। কবি আসতে পারেননি, কিন্তু সুদূর ইরান থেকে তাঁর অন্তরের নির্যাসস্বরূপ কবিতার মিছরিটুকরা পাঠিয়েছিলেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হাফিজের সে কাব্যমিছরির মর্ম অনুবাদ করেছেন:
“আজকে পাঠাই বাঙলায় যে ইরানের এই ইক্ষু-শাখা,
এতেই হবে ভারতের সব তোতার চঞ্চু মিষ্টিমাখা।
দেখ গো আজ কল্পলোকের কাব্যদূতীর অসম সাহস,
এক বছরের পথ যাবে যে, একটি নিশি যাহার বয়স।”
কবি হাফিজের কাব্যবার্তার জবাব দেওয়া হলো কি এই শিশুদের মনোহর সরল নাচের মধ্য দিয়ে! বোদ্ধা মহলের অনেকেই বিস্ময়চিত্তে ভেবেছেন সে কথা। বলেছেনও কেউ কেউ। ইরানে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক এ পরিবেশনার আয়োজনে ছিল তেহরানের বাংলাদেশ দূতাবাসের ছন্দ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।
আপন মনে, মুক্ত তালে নৃত্যরত কয়েকজন বাংলাদেশি শিশু
নতুন রূপে বাংলা নববর্ষ
বাংলা নববর্ষ উদযাপন নতুন কিছু নয়। বহু বছর প্রতিটি বাংলা নববর্ষ উৎসব মুখরিত ভাবেই তেহরান দূতাবাস উদযাপন করছে। বিশ্বমারী শুঁয়া(করোনা) ভাইরাসের প্রকোপ থেকে সৃষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় চলা আর স্বাস্থ্যবিধির বাধ্য বাধ্যকতার গিলোটিনে দুবছরের যাবতীয় উৎসব কাটা পড়েছে। চলতি বছর থেকে বিশ্বমারি দুর্বল হওয়ায় আবার উৎসবে ফিরতে পারছে পৃথিবী। পবিত্র রমজানের কারণে এ বছর সঠিক দিনটিতে নববর্ষ উদযাপন করা সম্ভব হয়নি। চলতি মাসের ১২ তারিখে বকেয়া সেই উৎসব পালন করা হলো বেশ আনন্দঘন ভাবেই।
উৎসব পালনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পী আনিসুল ইসলাম হিরো,গায়ক স্বপ্নীল সজিব এবং আবৃত্তিকার সামিউল ইসলাম পোলক তেহরানে আসেন দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায়।
নাচ পরিবেশন করছে সিফাত ও সারা
এ দিনে ছন্দ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার প্রথম পরিবেশনা ছিল বাংলাদেশে যমজ ভাইবোন কিশোর সারা আজমি এবং এস. এম. সিফাত হোসেন তাক লাগানো বোধন নৃত্য। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি নানা চমকে ভরপুর ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো শেখ সাদির কবিতার তালে লোকনৃত্য পরিবেশনা। আর এ নাচ পরিবেশন করে দর্শকদের মাত করে দিলেন আনিসুল ইসলাম হিরো। মঞ্চ থেকে পাওয়া অনুরোধের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বরচিত ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করেন রাষ্ট্রদূত গওসল আযম সরকার।
আবৃত্তির গুণে এবং কবিতার সৌন্দর্যের কারণে “তুমি আছো সেখানে” নামের কবিতা দর্শক শ্রোতাকুলকে রুদ্ধ শ্বাসে রেখেছে। তার কবিতার কয়েকটি পঙক্তি ছিল নিম্নরূপ:
“এই দিনটিতে শত বর্ষ আগে নরম পানিভেজা পলি মাটির বাংলায়
মধুমতি নদীটির তীরে অম্লান সবুজ ভূমিতে নেমে এলো এক শিশু সন্তান।
তুমি নেমে এলে যেন শক্তিমত্ত সূর্যের গৌরবে, হটিয়ে দিতে হাজার বছরের নিঃসীম অন্ধকার
আদিগন্ত ধানক্ষেত, কাদামাটি, মৌসুমি পানির উৎসব, ঝড়ো বাতাস ঘুরে ঘুরে এলো ডাকল বারবার সে বিস্ময় বালককে।
ধাবমান নদী মৃদু তরঙ্গে ডাকল তাকে বহমান বক্ষে তুলে নিতে।“
…
“হে আমাদের মহানায়ক! ঘাতকরা তোমাকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে- নিয়ে গেছে আমাদের ছায়াঘেরা মায়াভরা শান্তির বট বৃক্ষ
কিন্তু তুমি রয়ে গেছ আমাদের হৃদয় জুড়ে, রয়ে গেছ আমাদের রঙিন স্বপ্ন ঘিরে,
আমরা তোমার পথ ধরেই চলেছি এগিয়ে, তোমার দেখান পথ ধরে পতাকা হাতেই চলেছি,
নিশ্চিত আজ তোমার দেখানো স্বপ্নপুরীতে একদিন আমরা পৌঁছে যাবোই।”
স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়েছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মিডলি, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা, রবীন্দ্র সঙ্গীত, ভারত নাট্যম। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান চলেছে রাত সাড়ে নয়টা অবধি। ইরানে বাংলা সাংস্কৃতিক
ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় হোটেল এভিনের পর সাক্ষী হয়ে রইল ইসিও মিলনায়তন। অনুষ্ঠান শেষে মনে হলো, আয়োজন আরো দীর্ঘ সময়ের হলে নির্মল এ আনন্দলহরীও হতো দীর্ঘতর।
