ইতিহাস রচনার কথকথা
তেহরানের একটি হোটেলের হলঘর গানের সূর উদ্বেলিত হয়ে উঠল। তারপরই মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করলেন বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পী আনিসুল ইসলাম হিরো। আর সাথে সাথেই রচিত হলো এক ইতিহাস। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো নৃত্য শিল্পীর শৈলীময় উপস্থাপনা প্রত্যক্ষ করল ইরানের রাজধানী। কোভিড-১৯ বিশ্বমারীর প্রকোপে দুই বছর সংবর্ধনা বন্ধ থাকার পর এবারে প্রথম তেহরানের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সংবর্ধনা আয়োজন করা হয়। তবে এ আয়োজন আর গৎ বাধা পথে হাঁটল না। বরং নতুন পথ নির্মাণ করল।
ইরানের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব নওরোজ বা ইরানি নববর্ষ উদযাপনের কাছাকাছি সময়ে পড়ে যাওয়ায় ২৬ মার্চের অনুষ্ঠান এপ্রিলে করার রেওয়াজ রয়েছে তেহরানে। তবে এবারে পবিত্র রমজানের কারণে মে মাসে এসে ঠেকেছে সে অনুষ্ঠান। দীর্ঘ সবুরের পর বলতে হবে এবারে চমৎকার মেওয়া নিয়েই হাজির হয়েছে সে অনুষ্ঠান।
শুরুর কথা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ৯ এপ্রিল এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইরানের খনি ও বাণিজ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী এবং বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার প্রধান আলী রেজা পেইমান পাক। পেইমান পাক তার ভাষণে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪৭ বছর ধরে দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান বন্ধুত্ব ভ্রাতৃত্ব ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন।

(ছবিতে দুদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনকালে উপমন্ত্রী পেইমান পাক ও রাষ্ট্রদূত গওসল আযম সরকারকে দেখা যাচ্ছে)
তিনি আরো বলেন, ইরানের ওপর আরোপিত এক তরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং এবং অর্থনৈতিক খাতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সহযোগিতা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতার উন্নয়ন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তিনি তার ভাষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করেন।
এর আগে, ইরানের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ. এফ. এম. গওসল আযম সরকার তার ভাষণে দেশের প্রবৃদ্ধির বিবরণ তুলে ধরেন। বাংলাদেশ-ইরান সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিসংঘ, ন্যাম, জি-৭৭, ওআইসি, ডি-৮সহ বহুমুখী আন্তর্জাতিক কাঠামোর আওতায় দেশ দু’টি ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও পরস্পরের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে ইরানের ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে বলেও জানান তিনি। ডি-৮’এর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আবদুল্লাহহিয়ান ঢাকা সফর করবেন বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
পরে বিশাল কেক যৌথ ভাবে কাটেন ইরানের উপমমন্ত্রী পেইমান পাক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গওসল আযম এবং তার স্ত্রী সাদিয়া আযম।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি, সামরিক বাহিনী, বেসামরিক নানা সংস্থার শীর্ষ স্থানীয় কর্তারাসহ তেহরানে অবস্থিত নানা দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া, বাংলাদেশিদের নির্বাচিত অংশকে এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছে।
এবার ইরানের খনি ও বাণিজ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী এবং বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার প্রধান আলী রেজা পেইমান পাকের ফারসি ভাষণের সময় যেভাবে ইংরেজি অনুবাদ পিছনের পর্দায় ভেসে উঠেছে, একই ভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের ভাষণের ফারসি অনুবাদ ফুটে উঠেছে।
গান ও নাচ মাতিয়ে তুলল
গান ও নাচের তালে দুলে উঠল গোটা হলঘরের বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশ। এক পর্যায়ে দেখা গেল নেচে উঠলেন বাংলাদেশ দূতাবাসের অনেকেই আর তাল মেলাল সমবেত সবাই।

গান পরিবেশন করেন স্বপ্নীল সজিব এবং কবিতার দুর্দান্ত আবৃত্তি পরিবেশন করেন সামিউল ইসলাম পলক। আবৃত্তি, নাচ ও গান সব মিলিয়ে স্বল্প পরিসরে সাংস্কৃতিক অয়োজন শেষ হওয়ার পর চারদিকে হাততালির নহর বয়ে গেল।
তেহরানে দীর্ঘদিন যাবত বসবাসকারী এবং ইরান ডেইলির অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সাংবাদিক এবং স্বাধীন বাংলা বেতারের গর্বিত কর্মীদের অন্যতম এজাজ এক প্রশ্নের জবাবে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, ইরানের বুকে এর আগে এমন সুন্দর নাচ ও গানের অনুষ্ঠান বিপ্লবের পর কখনো করেনি বাংলাদেশ দূতাবাস। এ আনন্দধারা অব্যাহত থাকবে বলেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
