নতুন একটি মডেলের আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো অনুমোদন পেল তিনটি 'একক ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান' (ওপিসি)। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করবে।
ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যদি কিছু সমস্যা দূর করা যায়, তবে ওপিসি সংক্রান্ত এমন উদ্যোগ ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের আওতায় আনার পাশাপাশি আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলবে এবং দ্রুত সময়ের মাঝে তাদের ব্যবসাও ত্বরান্বিত হবে।
এমন উদ্যোগ দেশি-বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও আকর্ষণ করবে বলে তাদের আশা।
এছাড়াও দেশের ব্যবসায়িক সংস্কৃতিতে গভীর মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশেরও উন্নয়ন ঘটবে।
নিবন্ধিত নতুন তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো, জেআর এভিয়েশন সার্ভিসেস ওপিসি, বোয়ালিয়া সার্ভিসেস ওপিসি এবং আক্কাস উদ্দিন মোল্লা ওপিসি।
যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্ম পরিদপ্তরের (আর জে এস সি) একজন কর্মকর্তা বলেন, "এটি হলো নতুন ধরনের ব্যবসা ব্যবস্থা, যেখানে মালিক হবেন কেবল একজন ব্যক্তি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোম্পানি আইন - ১৯৯৪ এর সংশোধনী অনুসারে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মহামারিকালীন বেসরকারি বিনিয়োগের নিম্নাবস্থায় এমন উদ্যোগ দেশি-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
আর জে এস সি’র তথ্যমতে, আরও কিছু ওপিসি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ওপিসি সম্পর্কিত বিধানের অভাবে পূর্বে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছিল।
এটি এমন একটি কোম্পানি, যা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয়, যেখানে বোর্ডের সদস্য হিসেবেও থাকেন তিনি একাই।
কোম্পানি আইন (২য় সংশোধনী)- ২০২০ সংসদে পাশ হয় গত নভেম্বরে, যার মাধ্যমে ওপিসি গঠনের আইনগত বাধা দূর হয়।
দুই বা ততোধিক ব্যক্তির বদলে কেবল একজন ব্যক্তির মাধ্যমে একটি ওপিসি গঠন করা যাবে, যেখানে প্রতিষ্ঠান নিজেই একজন ব্যক্তি বা সত্তা হিসেবে পরিচিতি পাবে।
একক মালিকানাধীন ব্যবসায় আগ্রহী ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট বিধানের অভাবে এতদিন তাদের প্রতিষ্ঠানকে সুগঠিত করতে পারেননি, যার সমাধান হিসেবে এই নতুন ব্যবস্থাটি কার্যকর হবে; এছাড়াও তা এ ধরনের ব্যবসাকে আরও জনপ্রিয় করে তুলবে বলে সকলের বিশ্বাস।
কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একটি ওপিসির পরিশোধিত মূলধন হতে হবে ন্যূনতম ২৫ লক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা এবং পূর্ববর্তী বছরের লেনদেনের পরিমাণ হতে হবে ১ কোটি টাকা।
আইন অনুযায়ী ওপিসিকে বছরে কমপক্ষে একটি বোর্ড সভার আয়োজন করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক মারা গেলে পরবর্তী মনোনীত ব্যক্তি এর সম্পূর্ণ মালিকানা পাবেন।
আইন অনুযায়ী, মালিকানা হস্তান্তর সংগঠিত হবে কমিশনের মাধ্যমে, যেখানে সংশ্লিষ্ট কাগজে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের প্রথম ওপিসি জে আর এভিয়েশন সার্ভিসেস এর স্বত্বাধিকারী রাজিব আহমেদ ভুঁইয়া ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, কেন তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন ব্যবস্থা বেছে নিলেন। তিনি বলেন, "ওপিসি ব্যবস্থা আমার ব্যবসাকে সহজতর করবে।"
তিনি আরও বলেন, তার জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা বহুদিন ধরে কিছু আইনী সমস্যার সম্মুখীন হয়ে রয়েছে, ওপিসি ব্যবস্থায় প্রবেশের মাধ্যমে এর সমাধান হবে বলে তিনি আশা করছেন।
অন্যদিকে ওপিসি সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মতে, সর্বনিম্ন পরিশোধিত মূলধনের নির্ধারিত পরিমাণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিসীমা উন্মুক্ত হওয়া উচিত বলে তাদের মত।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের সভাপতি ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, "পরিশোধিত মূলধনের উচ্চ পরিসীমা সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের ওপিসি তালিকায় প্রবেশে নিরুৎসাহিত করবে"।
তিনি মনে করেন, পরিশোধিত মূলধনের কোনো পরিসীমা না থাকা উচিত, তাহলে অনেক উদ্যোক্তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থায় নিবন্ধিত হয়ে ব্যবসাকে নিয়মের আওতায় আনার ইচ্ছা প্রকাশ করবে।
তিনি বলেন, "পরিশোধিত মূলধনের কোনো পরিসীমা না থাকলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই এই অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে"।
ফেরদৌস আরা বেগম, যিনি বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন, তিনিও প্রস্তাব করেন যে, উদ্যোক্তাদের ওপিসিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন উন্মুক্ত রাখা উচিত।
যেখানে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিধির মধ্যে আনাই হলো এর মূল উদ্দেশ্য, সেখানে তিনি বলেন, "পরিশোধিত মূলধনের এমন উচ্চ পরিসীমার কারণে ওপিসির উদ্দেশ্যই লঙ্ঘিত হয়েছে"।
তিনি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান যে, তারা আইনের এই ব্যাপারটি নিয়ে সরব রয়েছেন। "আমরা বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছি, তিনি এই ব্যাপারটি দেখবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন”।
যদিও তিনি স্বস্তির সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, সরকার ওপিসির জন্য কর্পোরেট কর কমিয়ে ২৫ শতাংশ করেছে।
jasimharoon@yahoo.com
