Loading...

তালেবানের পক্ষে বাজি ধরে পস্তাবে রাশিয়া!

| Updated: August 23, 2021 13:52:44


কাবুলে সশস্ত্র তালেবান যোদ্ধারা। ছবি: রয়টার্স কাবুলে সশস্ত্র তালেবান যোদ্ধারা। ছবি: রয়টার্স

আগস্ট মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু হটে আসার যে নীল-নকশা আমেরিকা করেছিল তার সাথে আফগানিস্তানের চলমান ঘটনা প্রবাহের কোন মিলই নেই।

এই নকশা অনুযায়ী মনে করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার দেশটিতে আরো ছয় মাস টিকে থাকবে। এরপর তালেবানরা শহর-দখল অভিযানে নামলেও সে ধকল কাটিয়ে আশরাফ গনির সরকার আরো অন্তত এক থেকে তিন মাস টিকবে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল।

আফগানিস্তানের ভবিষ্যত নিয়ে এমন আবহাওয়া বার্তা কেবল ওয়াশিংটনই দেয়নি। বরং দিয়েছিল মস্কোও! রাজধানী কাবুলে তালেবান ঢোকার মাত্র দিন কয়েক আগেই রুশ প্রেসিডেন্টের আফগান দূত জামির কাবুলাভ এমনি এক ঘোষণা দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কান্দাহার কব্জা করা মানে এই নয় যে কয়েকদিনের মধ্যেই  আফগান রাজধানী দখল করতে চলছে তালেবান!

জুলাইয়ের শেষ নাগাদ আফগানিস্তানের প্রায় সব গ্রামীণ জনপদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তালেবান। কাবুল, হেরাত, কান্দাহার এবং মাজার-ই-শরিফের মতো বড়ো বড়ো কয়েকটা নগরের নিয়ন্ত্রণ কেবল তখনো তালেবান নেয়নি। মস্কো এবং ওয়াশিংটনের পূর্বাভাসকে ধুলোয় উড়িয়ে দিয়ে এক শনিবার সকালে মাজার-ই-শরিফের অবস্থা উল্টে গেল।

তালেবানের সাথে মরণপণ যুদ্ধ করার জন্য সে সরকারি বাহিনী গঠন করা হয়েছিল দেখা গেল তারা লড়াইয়ের ধারে কাছে গেল না। মাজার-ই-শরিফ ফেলে রেখে তারা ভাগতে শুরু করল উজবেকিস্তান সীমান্তের দিকে। ১৯৮৯ সালে সাবেক সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে ভেগে যাওয়ার পথে সে দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল সেই একই দৃশ্যের অবতারণা হলো আফগানিস্তানের হারিতন থেকে উজবেকিস্তানের তারমেজ পর্যন্ত সংযোগ সেতুতে।

আগস্টের ১৫ তারিখে দুনিয়া অবাক হয়ে দেখতে পেলো, বিদেশি কূটনীতিবিদদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য কাবুল বিমান বন্দর থেকে যে সব উড়োজাহাজ যাচ্ছে তাতে ঝুলছে আফগানিস্তানের নিরুপায় দিশেহারা মানুষ।

এরই মধ্যে কাবুল অবরোধ করেছে তালেবান। তারপর ‘শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের’ জন্য আফগান সরকারের প্রতি শর্ত ঘোষণা করেছে। কাবুল কর্তৃপক্ষ কালবিলম্ব না করেই সে সব শর্ত কবুল করে। আর প্রেসিডেন্ট গনি বিমানযোগে অজানার পথে পাড়ি জমান। আফগান সরকারের কার্যত দ্বিতীয় ব্যক্তি এবং দেশটির জাতীয় সংহতি বিষয়ক উচ্চ পরিষদের প্রধান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ উড়ে গেলেন দোহায়। নতুন সরকার গঠন নিয়ে তালেবান প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ-আলোচনার করতে তিনি সেখানে গেলেন।

আর মাত্র একটি ধাপ পেরোলেই বিজয় এসে ধরা দেবে, সে অবস্থায়ও রক্তপাত এড়াতে আলাপে রাজি হলো তালেবান। তবে কাবুলে তালেবান ঢোকার সময় রক্তপাতের কোনো ঘটনা ঘটলে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যম তা গুরুত্ব দিয়ে প্রচারে নামবে – এমন একটি পরিস্থিতি এড়াতেই আলোচনায় বসার কথা তালেবান মেনে নেয় বলেই ধারণা করা হয়।

এর আগে যে কালিমামাখা ভাবমর্যাদা তৈরি হয়েছিল তা ঠেকাতে এবারে আরো কিছু পদক্ষেপ নেয় তালেবান। সব বিদেশি দূতাবাসকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। (এমনকি রাশিয়ার দূতাবাসে সশস্ত্র পাহারাদারও মোতায়েন করে।) নিজ যোদ্ধাদের লুট-তরাজ না করার হুকুম দেয়। তালেবান বিরোধীদের সাধারণ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দেয়। আফগান ছাড়তে চাইলে কাউকে বাধাও দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করে তালেবান।

আফগানিস্তানের ভবিষ্যত নিয়ে কোনো পূর্বাভাস দেওয়া এখন খুব সহজ কোনো কাজ হবে না। তলেবান ছাড়া দেশটিতে এখন আর কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। তবে বলা হচ্ছে, আফগান অভিজাত শ্রেণির সাথে জড়িত অনেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি দেশটির নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কল্কি পাওয়ার আশায় শুরু করেছেন হুড়োহুড়ি।

সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ, ইসলামিক পার্টির নেতা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার একটি পরিষদ গঠন করেন। বলা হচ্ছে, আফগানিস্তান ক্ষমতা হস্তান্তর তদারকি করবে এই পরিষদ।

এ সব ব্যক্তিত্ব ও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট গনির মধ্যে সুসম্পর্কই বিরাজ করছে। মস্কোর বৈঠকসহ নানা বৈঠকে তারা আগে একাধিকবার তালেবানের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন। নিজেদের শাসন ব্যবস্থাকে সভ্যতার মাপকাঠিতে ধোপদুরস্ত হিসেবে দেখানোর এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দ্রুত পাওয়ার জন্য তালেবানরা এ সব ব্যক্তিত্বের সেবাকে ব্যবহার করবে বলেই তারা আশা করছেন।

গনির সাথে মস্কোর সম্পর্ক সব সময়ই নানা জটিল সমীকরণে ভুগেছে। কাজেই তার গদিচ্যুত হওয়াকে ক্রেমলিন মোটেই আঘাত হিসেবে মনে করছে না।

বরং রুশ দূতাবাস কর্মীরাই সাংবাদিকদের কাছে রটিয়েছে যে আফগান প্রেসিডেন্ট ‘গাড়ি ভর্তি টাকাকড়ি’ নিয়ে স্বদেশ থেকে ভেগে গেছে। অন্যদিকে, কাবুলভ পরিষ্কার ভাষায় বলেন, আফগান সরকারের তুলনায় মস্কোর সাথে আলোচনা সহজতর বলেই আগে থেকে মনে করে তালেবান।

মস্কো বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যদি গঠন করা হয় তবে রাশিয়া তাকে অন্যতম সেরা সুফল হিসেবে গণ্য করবে। তালেবানকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে এর আগে উল্লেখ করেছে মস্কো। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হলে সম্পর্কের টানাপড়েন বা অবনতি না ঘটিয়েই তালেবান কর্তৃত্বকে সরাসরি মেনে নেওয়ার চক্ষু লজ্জা থেকে বেঁচে যাবে রাশিয়া। তদুপরি এ কথাও প্রমাণ হবে যে আমেরিকার হটে যাওয়ার সময় রুশ কূটনৈতিক তৎপরতা অনেক বেশি কার্যকর ছিল।

আফগানিস্তানের ঘটনাপ্রবাহে কেবল রাশিয়ায় নয় অন্যান্য প্রতিবেশী দেশও উদ্বেগ বোধ করে। আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চীন, ইরান এবং উজবেকিস্তান অনেক আগেই তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এসব দেশের কূটনৈতিকরা এখন আফগানিস্তানে তৎপর রয়েছেন। এমনকি কাবুল দখল করার অনেক আগেই দেশটির যে সব নগরী তালেবানের পদানত হয়েছে সেখানেও তৎপর ছিলেন এ সব দেশের কূটনীতিবিদরা। তবে এরপরও এ সদ্য অস্বীকারের জো নেই, আফগানিস্তানে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে আমেরিকা ও ন্যাটো বছরের পর বছর ধরে যে সব তৎপরতা চালিয়েছে তা এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরোই ধুলোয় মিশে গেছে।

বিশ্ব জুড়ে তালেবান বিরোধীরা আপাতত তুষ্ট থাকতে পারে। দেশটির সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থাৎ শরণার্থী সংকট এখনো পুরোপুরি দেখা দেয়নি। তালেবানই নিয়ন্ত্রণ করছে আফগানিস্তানের সব ভূ-সীমান্ত। কাজেই চেকপয়েন্ট পার হওয়ার মতো ভাগ্যপরীক্ষায় নামতে আফগান জনগণ এখনই তেমন ভরসা পাচ্ছে না।

চলতি মাসের ১৬ তারিখে দেওয়া এক বিবৃতিতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, তালেবান আবারো বলেছে তারা চীনের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে চায়। আফগানিস্তানের উন্নয়ন ও পুনর্নির্মাণে বেইজিং অংশ নেবে বলেও আশা করছে তালেবান। এ ছাড়া, চীনা মুখপাত্র আরো বলেন, আফগান ভূমি ব্যবহার করে চীনের কোনো ক্ষতি করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তালেবান।

রাশিয়া, চীন, ইরান এবং উজবেকিস্তানও হয়ত তালেবানের ক্ষমতায় আসার পক্ষেই বাজি ধরেছিল। তবে ইসলামিক এ যোদ্ধাদের ওপর তাদের বর্তমান ভরসা বেশি দিন নাও টিকতে পারে। আফগানিস্তানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তালেবান। কিন্তু প্রতিশ্রুত সে সরকারের নাম-গন্ধও আর দেখা যাচ্ছে না। বরং দেশটিতে মাদক চোরাচালান এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ ব্যাংয়ের ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

[ দ্য মস্কো টাইমস থেকে বাংলায়  রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like

Filter By Topic