ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক জায়গাতেই চোখে পড়ে দেয়ালচিত্র, গ্রাফিতি, দেয়াল লিখনের মতো কাজ। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একরকম বার্তা পৌঁছানোর অংশ হিসাবে করা হয়ে থাকে এই আঁকার বা লেখার কাজ।
সাধারণত চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাই দেয়াল আঁকানোর এই কাজের সাথে জড়িয়ে থাকেন বেশিরভাগ সময়। তবে আগ্রহী হলে বা আঁকার দক্ষতা থাকলে অন্যান্য বিভাগের আঁকিয়েরাও যোগ দেন, নেমে পড়েন দেয়াল রাঙানোর আয়োজনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী শিমুল কুম্ভকার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন দেয়াল অঙ্কন বা গ্রাফিতি করার সাথে যুক্ত আছেন বছর কয়েক হলো। তবে তিনি নিজে এঁকেছেন কম, নির্দেশনা দিয়েছেন বেশি। তার সাথে বিভিন্ন সময় কাজ করেছেন জাহিদ জামিল, মং সোনাই, মাঈন আহমেদ, আকিফ আহমেদসহ আরো কয়েকজন।
শিমুল বললেন, “ক্যাম্পাসে প্রথম কাজ ছিলো হাকিম চত্বরের বড় দেয়ালে করা শহীদ রাজুর গ্রাফিতি। তার নামে টিএসসির ওখানে ভাস্কর্য আছে। ১৯৯২ সালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মূলধারার প্রধান দুটো ছাত্রসংগঠনের পেশিশক্তি ও অস্ত্রের রাজনীতির বলি হয়েছিলেন তিনি।”
রাজু চাইতেন ক্যাম্পাস হবে শিক্ষার্থীদের। তাই সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল বের করেছিলেন। তারপর ক্যাডারদের গুলিতে শহিদ হন তিনি।
রাজুর ছবিটি অবশ্য এখন আর নেই। হাকিম চত্বরের সে দেয়ালটিতে এখন শোভা পাচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি রঙিন ছবি।
স্মৃতিময় এই প্রথম কাজটি না থাকলেও তাদের করা আরো কিছু দেয়ালচিত্র রয়ে গেছে এখনো। যেমন - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহিদ তাজুল ইসলামকে নিয়ে করা তাদের কাজ রয়ে গেছে ডাকসু ভবনের দেয়ালে।
এই অমিত প্রতিভাধর মানুষটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও পাটকল শ্রমিক হয়েছিলেন। গণমানুষের রাজনীতি করার জন্য, তাদের সংগঠিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
এখানে আঁকার কাজে মং সোনাই ও জাহিদ জামিলকেই মূল কৃতিত্ব দিলেন তিনি। শহিদ তাজুলের আত্মত্যাগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো ও গণমানুষের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যে দায়বদ্ধতা, সেটি তাদের কাছে তুলে ধরার জন্যই এই চিত্র আঁকা।

তাদের কাজের নিশানা ছড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শ্যাডো থেকে শুরু করে টিএসসি অবধি। ক্যাম্পাস শ্যাডোতে গেলে চোখে পড়ে দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছেন নোয়াম চমস্কি। লেখা আছে - শত শত কোটি টাকা প্রতিদিন খরচ হচ্ছে তোমার ও আমার ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। পাশেই আরেকটি দেয়ালে তারা এঁকেছিলেন মিশেল ফুঁকো-কে। সেটিও অবশ্য এখন আর নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সঞ্জীব চত্বর বলে বিশেষায়িত একটা জায়গাই আছে। সেখানে গেলেই দেখা মেলে প্রখ্যাত সাংবাদিক, কবি, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর একটি চমৎকার ছবির। এই ছবিও তাদের আঁকা।
তবে আগে এখানে পাশাপাশি ছিলো দুটো ছবি – সঞ্জীব চৌধুরী আর জন লেননের। মাঝে এই ছবিগুলো মুছে দেয়া হয়। পরে আবার তারা উদ্যোগ নিয়ে সঞ্জীব চৌধুরী বা তাদের প্রিয় 'সঞ্জীব দা'-কে এঁকেছেন।
শিমুল যোগ করলেন, “এই ছবিটা এঁকেছেন আকিফ আহমেদ আর মাঈন আহমেদ মিলে। আমি আঁকায় ছিলাম না। যা দেখছেন আরকি আশেপাশে, এসব বেশিরভাগ জাহিদের (জাহিদ জামিল) বা মং-এর (মং সোনাই) আঁকা।”
জাহিদ জামিল শুধু দেয়াল অঙ্কনে নয়, বরং কার্টুনিস্ট হিসেবেও বেশ পরিচিত। সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কার্টুন এঁকে থাকেন। তিনিও ২০১৫-১৬ সেশনের ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী। মং সোনাই পড়াশোনা করছেন চারুকলা অনুষদের ড্রয়িং এন্ড পেইন্টিং বিভাগে। তাদের ভেতর তুলনামূলক নবীন তিনি, ২০১৯-২০ সেশনের।
শিমুলের কথার সূত্রে আরো জানা গেল, তারা নিছক বিনোদনের জন্য এটা করছেন না। কো্নো একটি জিনিস পড়তে যে সময় লাগে, দেখতে লাগে তার চেয়ে কম। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তাদের ইতিহাস নিয়ে, জ্ঞানচর্চার জায়গা নিয়ে ভাবানো বা জানানোর তাগিদ থেকেই তারা দেয়ালে আঁকা বা লেখার কাজ করে থাকেন।

এবার যাওয়া যাক দেয়ালচিত্রের আরেক তীর্থক্ষেত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রায় ৭০০ এককের সুবিশাল ক্যাম্পাস ভরে আছে দেয়ালচিত্রে, এমনকি গাছে আঁকা ছবি দিয়ে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলোকে রঙে রাঙানোর মূল কারিগর আবদুল্লাহ মামুর। তিনি চারুকলায় ভর্তি হন ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী হিসেবে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতির ঘেরাটোপে আটকে থাকতে ভালো লাগেনি তার।
তাই প্রথম বর্ষের পর আর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া এগিয়ে নেননি। তিনি জানালেন, “আমি এখানে নতুন নতুন ভর্তি হয়ে দেখতাম দেয়ালে বিভিন্ন পোস্টার। বিভিন্ন ছাত্রনেতাদের, বিসিএস কোচিংয়ের, আরো অনেক কিছুর। আমি ভাবলাম দেয়ালগুলোকে একটু রাঙিয়ে দেয়া যাক। যারা দেখবেন ভালো লাগবে, বিশ্ববিদ্যালয়টাকেও আরো সুন্দর দেখাবে। সেই ভাবনা থেকেই কাজ করা।”

মামুর এরকম বিভিন্ন দেয়াল অঙ্কনের কাজ করেছেন। একেকটা ছবিতে একেকরকম বিষয় এসেছে। হুমায়ূন ফরীদি, এটিএম শামসুজ্জামান ও দিলদারকে পাশাপাশি এঁকেছেন তিনি। আবার, ফেলুদা-ঘনাদাকে ও পাশাপাশি দেয়ালে এঁকে তাদের যুগলবন্দি ঘটিয়েছেন।
মামুর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচ - ৪২ এর শিক্ষার্থী। তার ব্যাচ নিয়ে সর্বশেষ একটা কাজ করেছেন; যাতে লেখা আছে, “অন্তরে মধু, মুখে বিষ / আমরা বিয়াল্লিশ”

এছাড়াও তার বিভিন্ন দেয়াল অঙ্কনে বিভিন্ন বিষয়কে বিমূর্তরূপে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। জাকসু ভবন সংলগ্ন বড় একটি দেয়ালের একদিকে যেমন আঁকা দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে উদ্যত একটি পায়েরর ছবি, আবার তার পাশেই আছে বুদবুদে ডুবে থাকা নিবিষ্ট এক তরুণীর মুখ। তারপর বিভিন্ন খুলি, আকাশে জাগা আধিভৌতিক চাঁদ। একপাশে প্রতিবাদ, একপাশে ভয় আর তার মাঝে এক আত্মমগ্ন সত্তা।

মামুরের দেয়ালচিত্রে উঠে এসেছে সমকালীন প্রসঙ্গও। দানবীয় প্রতীক তৈরি করে নারী নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা কিংবা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনও এসেছে দেয়াল ছবিতে। এভাবে নান্দনিকতার সাথে সাথে আনন্দের উপকরণ কিংবা ভাবনার খোরাক দিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসের এই দেয়ালচিত্রগুলো।
পাশাপাশি এই দেয়ালচিত্রগুলো আরো অনেক জায়গাতেই নবীন শিল্পীদের দেয়াল অঙ্কন করার কাজে অণুপ্রেরণা দিচ্ছে। শিমুল, জাহিদ, মামুর বা মং – তাদের মতই আরো অনেক তরুণ শিল্পী তাদের এসব কাজ থেকে অণুপ্রাণিত হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেয়ালে আঁকছেন চমৎকার সব ছবি।
এভাবে ছবির মাধ্যমে ভাষা পাচ্ছে ইট-পাথরের দেয়াল। ছবিগুলোও হয়ে থাকছে কখনো আনন্দের উপকরণ, কখনো সময়ের স্বাক্ষর।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com
