Loading...

তল্লা থেকে মগবাজার: ‘হেলায় হেলায়’ বাড়ছে প্রাণহানি

| Updated: June 30, 2021 15:31:35


ফাইল ছবি ফাইল ছবি

দুদিন আগের রাজধানীর মগবাজার এলাকার তিনতলা এক ভবনের নিচতলায় ভয়াল বিস্ফোরণের পর বরাবরের মতোই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

তবে পরিষেবা সংস্থাগুলো যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে এবং জনগণের দুর্দশা লাঘবে আন্তরিক হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনাই হয়ত দেখতেই হতো না বলে মনে করেন স্থানীয়রা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

তাদের অভিযোগ, সেবা সংস্থাগুলো দুর্ঘটনা ঘটার পর দৌড়ঝাঁপ দেখায়। অথচ বহুদিন থেকেই এই এলাকায় ‘গ্যাস লিকেজের’ সমস্যা বিরাজমান ছিল। তাছাড়া ছোট মাত্রার একাধিক বিস্ফোরণও ঘটেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই গা করেনি।

এমনিভাবেই নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লার মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর অবহেলার মাশুল দিতে হয়েছিল ৩৪ জনকে।

বায়তুস সালাত মসজিদের আশপাশে গ্যাসের গন্ধ পাওয়ার কথা স্থানীয়রা আগে জানালেও তা আমলে নেয়নি তিতাস। তার ফল হল গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ভেতর জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণ।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান সোমবার বলেন, নারায়ণগঞ্জের মসজিদের বা অন্যান্য জায়গায় যে বিস্ফোরণগুলো হয়েছিল, মগবাজারের বিস্ফোরণটি তার সমপর্যায়ের; আলামতেরও কিছুটা মিল আছে।

রোববার সন্ধ্যায় বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে রাজধানীর ব্যস্ত মগবাজার ওয়্যারলেস গেইট এলাকা। বিস্ফোরণে আউটার সার্কুলার রোডের ৭৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের তিনতলা একটি ভবন ধসে পড়ার মতো দশা হয়।

রাস্তার উল্টো দিকে আড়ং, বিশাল সেন্টার, নজরুল শিক্ষালয়, রাশমনো হাসপাতালসহ আশপাশের ডজনখানেক ভবনের কাচ ভেঙে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তায় থাকা তিনটি বাস ও যাত্রীরা।

ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন চার শতাধিক। এখনও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন কয়েকজন।

তিনতলা ওই ভবনের দোতলায় সিঙ্গারের বিক্রয়কেন্দ্র ছিল। বিস্ফোরণে ওই বিক্রয়কেন্দ্রের দেয়াল ভেঙে পণ্যের কার্টন বেরিয়ে পড়তে দেখা যায়।

নিচতলায় খাবারের দোকান শর্মা হাউজ ও বেঙ্গল মিটের বিক্রয় কেন্দ্র ছিল, যা মোটামুটি মিশে গেছে। লোহার গ্রিল, আসবাবপত্র, ভবনের বিভিন্ন অংশ ছিটকে যায় রাস্তায়।

বড় মগবাজার এলাকায় নালার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এখানে প্রায়ই গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যেত বলে জানালেন সেখানকার বাসিন্দা জামিল হাসান।

তিনি বলেন, এর আগে একবার গ্যাসের বিস্ফোরণে স্যুয়ারেজ ড্রেনের স্লাব ভেঙে ওপরে উঠে আসে। বিষয়টি প্রথমে সিটি কর্পোরেশনকে জানানো হয়। সিটি কর্পোরেশন তিতাসকে জানাতে বলে। কিন্তু তিতাসকে জানিয়েও কোনো ফল হয়নি।

মগবাজারে বড় হওয়া মো. রাজু ওই এলাকাতেই ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকে স্যুয়ারেজে গ্যাস বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

“সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসে মগবাজার মোড় এলাকায় (মৌচাকমুখী রাস্তায়) একটি স্যুয়ারেজের স্লাব বিস্ফোরিত হয়ে একটু দূরে ছিটকে পড়ে। এর আগে ডিসেম্বরেও স্লাব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।”

২০১৯ সালের ২৩ জুলাই মগবাজারের ফুটপাথে একটি স্লাব বিস্ফোরণের ভিডিও ফুটেজও (সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা) সাংবাদিকদের দিয়েছেন স্থানীয় মানুষ।

কিন্তু ওই ভিডিও সিটি কর্পোরেশন বা তিতাসের চোখে পড়ল না বা কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটাই স্থানীয়দের প্রশ্ন।

বিস্ফোরণের পর ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনও তিতাস কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

ফায়ার সার্ভিস বলেছে, তিনতলা ওই ভবনে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছে। আর সোমবার ধ্বংসস্তূপের বাতাস পরীক্ষা করে ‘হাইড্রোকার্বন গ্যাসের’ উপস্থিতি পেয়েছেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

তবে কেন, কীভাবে ওই বিস্ফোরণ ঘটল, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু কেউ বলেননি।

এর মধ্যে মঙ্গলবার বিস্ফোরণের ওই ঘটনায় ‘অবহেলার’ অভিযোগ এনে রমনা থানায় মামলা হয়েছে, কিন্তু তা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল বাশার বলেন, স্লাব বিস্ফোরণ বা গ্যাস লিকেজের গন্ধ পাওয়ার কোনো ঘটনা তার জানা নেই। ঘটনা ঘটলে নিশ্চয়ই তিনি জানতেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মেরীনা নাজনিন (উপসচিব) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গ্যাস নিঃসরণের বিষয়ে সাধারণত তিতাসের কাছে অভিযোগ করার কথা। তাদের কাছে এ ধরনের লিখিত বা অলিখিত অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেননি।

“আর যদি কেউ স্থানীয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছে বিষয়টি বলে থাকেন, তাহলে তাদের পর্যন্ত বিষয়টি আসার কথা না।”

গ্যাস লিকেজের বিষয়টি তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী ইকবাল মোহাম্মদ নুরুল্লাহও স্বীকার করেননি।

সোমবার ঘটনাস্থলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওই ভবনে শরমা হাউজ রেস্তোরাঁ ও তার দুই পাশের দোকানে তিতাসের কোনো গ্যাস সংযোগ নেই। দুটি এলপিজি সিলিন্ডার দিয়ে সেখানে রান্নার কাজ হত।

“ছোট্ট ওই ভবনটিতে পৌনে এক ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ দিয়ে ২ পিএসআই চাপের একটা তিতাসের লাইন রয়েছে। ওই মাত্রার চাপের গ্যাসে এত বড় বিস্ফোরণ হওয়ার কথা নয়।”

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে এই ঘটনা ঘটতে পারে তিনি ধারণা করেন।

বিস্ফোরণে বর্ণনা দিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, তাদের কাছে ভূমিকম্পের মতো মনে হয়েছিল। অনেকের কানে তালা লাগার মতো অবস্থা হয়েছিল।

অবহেলায় ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ

ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্যাস লাইন ও গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ৯৫৭টি আগুনের ঘটনা ঘটে; নিহত হয় চারজন। তার আগের বছর ৮১৮টি গ্যাস দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত হয়।

নারায়ণগঞ্জের মসজিদের বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর তিতাসের আটজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সেখানে মসজিদের পাশে তিতাস গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে বের হয়ে মসজিদের ভেতরে জমে গ্যাসকে বিস্ফোরণে উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ করা হয়েছে।

ওই ঘটনার পর গত ২৩ এপ্রিল রাতে পশ্চিম তল্লারই একটি তিনতলা ভবনে ফ্ল্যাটে একইভাবে গ্যাস বিস্ফোরণে ১১ জন দগ্ধ হন, যাদের দুইজন পরে মারা যান। ওই ঘটনার পর অবহেলার মামলা হলেও তদন্ত শেষ হয়নি।

এর আগে ২০১৮ সালের ২৪ মার্চ ময়মনসিংহের ভালুকার মাস্টারবাড়ি এলাকায় একটি ভবনে গ্যাসের বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা যান চারজন শিক্ষানবীস প্রকৌশলী।

নিহতরা হলেন- তৌহিদুল ইসলাম, দীপ্ত সরকার, শাহীন মিয়া ও হাফিজুর রহমান। তারা সবাই খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বস্ত্র প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলে। ইন্টার্ন হিসেবে ভালুকার একটি বস্ত্র কারখানায় যোগ দিয়েছিলেন তারা।

ওই ঘটনায় ভালুকা মডেল থানায় ‘অবহেলায়’ মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা হলেও পুলিশ কারও দায় খুঁজে পায়নি।

Share if you like

Filter By Topic