Loading...

তর্কে যাব, না বিতর্কে যাব?

| Updated: February 08, 2021 12:34:04


তর্কে যাব, না বিতর্কে যাব?

অনেকে ‘তর্ক’ এবং ‘বিতর্ক’ কে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এ দুটোর মাঝে আছে সূক্ষ্ম ফারাক। তর্ক যেকোনো ভিত্তিতে, যেকোনোভাবে করা যেতে পারে এবং তাতে যুক্তির বাধ্য-বাধকতা মোটেই নেই। তর্ক যদি হয় বাঁধনছেঁড়া স্বভাব, তবে বিতর্ক সুশৃঙ্খল অভ্যেস। ব্যাকরণগতভাবে ‘তর্ক’ শব্দটির আগে ‘বি’ প্রত্যয় যোগ হয়ে এতে যোগ করেছে অর্থের বিশেষ মাত্রা। এ বিশেষত্বের ভিত্তি যুক্তি। শুধুই যুক্তি। যুক্তিময় এই চর্চা ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করে। সাফল্যের পথে সহযোগিতা করে।

গভীর চিন্তা করা

শুধু তাকিয়ে দেখা এবং পর্যবেক্ষণ যেমন এক নয়, তেমনি চিন্তা এবং গভীর চিন্তার মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা গভীর চিন্তা যেকোনো বিষয় সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞান না রেখে তার মূলে প্রবেশ করার কথা বলে। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, সমালোচনা, আত্মমূল্যায়ন এবং সমাধানের মতো ধাপগুলো বিতর্ক চর্চার মধ্য দিয়ে এক এক করে ব্যক্তির চিন্তন প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে ভাববার কথাও বিতর্ক বলে। যখন প্রতিপক্ষ কোনো বিষয়ের সাধারণ দিকটি নিয়েই আলাপ করছে, তখন সে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে নতুন কোনো দিক তুলে নিয়ে আসার কাজটি যেন খানিকটা ডুবুরির মুক্তা খুঁজে আনার মতোই। কেননা মস্তিষ্কজাত ফসল মুক্তার চেয়ে কম কিছু নয়।

আত্মবিশ্বাসী হওয়া

বিতর্কের সময় কী বলা হচ্ছে, তা যেমন জরুরি, কীভাবে বলা হচ্ছে-সে বিষয়টিও কম জরুরি নয়। যখন কোনো পক্ষে থেকে যুক্তির মাধ্যমে সে পক্ষ সমর্থন করার ব্যাপার আসবে, তখন জোর দিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনই ফলপ্রসূ হয়। খুব ভালো বা জোরালো কথাও মিনমিন করে বললে এর প্রভাব আশানুরূপ হয় না। সেই একই কথা যখন কেউ জোর দিয়ে, আত্মবিশ্বাসের সাথে অপর পক্ষ ও দর্শক-শ্রোতাদের সামনে রাখতে পারবে, তখনই সবাই সে কথা মন দিয়ে শুনবে। বিতর্ক আমাদের শেখায় জোর দিয়ে কথা বলতে, আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে। এতে করে ব্যক্তিগত এবং কর্মজীবনে এ চর্চার একটা ছাপ রয়ে যায়।

যুক্তিবাদী হওয়া

বিতর্ককে সাধারণ তর্ক থেকে আলাদা করে একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, আর তা হচ্ছে যুক্তি। বাস্তবতায় পা ফেলে চলতে গেলে যে সবদিক হিসেব করে এগোতে হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সে হিসেব-নিকেশে আবেগী মানবমনকে সবসময় সাহায্য করে যৌক্তিক সত্ত্বাটি। সংযতভাবে যুক্তির চর্চায় বিতর্কের তুলনা হয় না। বিতর্ক শুধু যুক্তি দিতেই নয়, যুক্তি গ্রহণ করতেও শেখায়। একটি বক্তব্যকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন ধরনের যুক্তি দেয়া যায়, তবে বিতর্ক আমাদের বুঝতে সাহায্য করে-এর মধ্যে কোন যুক্তিটি সবচাইতে বেশি মানানসই এবং গ্রহণযোগ্য। অনেকগুলো বিকল্প উত্তরের মধ্যে সবচাইতে কম ভুল বা সবচাইতে বেশি সঠিক উত্তর খুঁজে নেয়ার জন্য যে বিশেষ যুক্তিবাদী মননের প্রয়োজন, তা নিয়মিত বিতর্কের অন্যতম ফলাফল।

প্রশ্ন করা

কী, কেন, কীভাবে-এমন সব প্রশ্নের মাধ্যমেই নতুন নতুন ভাবনার জন্ম হয় এবং পৃথিবীর ইতিহাসে আসে নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কার। যদি কেউ প্রশ্ন করা থামিয়ে দিত, তাহলে যা যেমন ছিল, তেমনই থাকত হয়তো। প্রশ্নই এমন এক উৎসুক হাতিয়ার, যা কিনা মানুষকে থেমে থাকতে দেয় না। প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অভিযানে নিত্যনতুন অভিযানে বেরিয়ে পড়ে কৌতূহলী মানবজাতি। আর বিতর্ক মানুষের মধ্যে থাকা প্রশ্নকে আরো জাগিয়ে তোলে, যুক্তির ধারে উৎসুক মনকে আরো শানিয়ে তোলে। বিতর্কে এক পক্ষ যখন অপর পক্ষের জন্য প্রশ্ন রেখে যায় পরবর্তী পর্বে উত্তর পাবার আশায়, তখন আলোচনায় নতুন মোড় আসে, কখনো কখনো এমন দিকও বেরিয়ে পড়ে, যার কথা আগে কেউ ভাবেনি। এভাবেই বিতর্কের চর্চা প্রশ্নের মাধ্যমে জ্ঞান অন্বেষণকে উজ্জীবিত করে তোলে।

দলগত কাজ

বেশিরভাগ বিতর্কই দলগত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে যেসব বিতর্ক হয়, তাতে সাধারণত তিনজনের দুটো দল থাকে। কোনো বক্তব্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান করে কেউ শুধু স্বতন্ত্র জয়ের জন্যই অংশ নেয় না, বরং দলগত অর্জনই মুখ্য হয়ে ওঠে সবার কাছে। একজনের বক্তব্যের দায় অন্য সদস্যরাও নেয়, একজনের বক্তব্যের সাফল্য সবাই উপভোগ করে। এভাবে একক সত্ত্বা অতিক্রম করে দলের জন্য হয়ে ওঠার যে যাত্রা, তা বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তিকে ক্রমশ ঋদ্ধ করে। একদিনের বিতর্কের জন্য অনেকদিনের প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, সে প্রস্তুতিকালেও দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত বন্ধন এবং দলগত কাজের স্পৃহা জন্ম নেয়।

বেশিরভাগ সময় স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিতর্কে অংশ নেয়া শুরু করে। কেউ কেউ পরবর্তী জীবনেও বিতর্কের সাথে যুক্ত থাকে, কেউ হয়তো ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিতর্কের অভিজ্ঞতা সবসময়ই বিতার্কিকদের মধ্যে থেকে যায় এবং জীবনের সব পর্যায়ে বিতর্ক থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো তাদের সহযোগিতা করে যায় যুক্তির মাধ্যমে মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে।

Share if you like

Filter By Topic