ঢাকাবদলের কড়চা


মোঃ ইমরান খান | Published: September 21, 2021 13:30:03 | Updated: September 23, 2021 17:49:44


ছবিতে এক টুকরো ঢাকা শহর। কৃতজ্ঞতাঃ ইমতিয়াজ আলম বেগ

"যেদিন থেকে বুঝতে শুরু করি, তখন থেকে আমি ঢাকায়। এই দয়াগঞ্জে আমরা থাকতাম। দুই ভাই, দুই বোন আর মা। ঢাকাতে বড় হই ঢাকা ও আমাদের সাথে বড় হয়।" রিকশা চালানোর সময় কথাগুলো বলছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। তার বয়স প্রায় ষাট।

মোঘল সময় থেকে শুরু করে ইতিহাসের অলিগলির আনাচে-কানাচে বিচরণ করা এক সময়ের মাঠ-ঘাট আর নদী-খালে পরিপূর্ণ ঢাকা শহর বর্তমানে গগণচুম্বী ইমারতের কয়েকটি ফ্ল্যাটের মধ্যেই হয়েছে সীমাবদ্ধ।

বড় বড় কক্ষ, চওড়া বারান্দা যেখানে কোনো এক সময় অবসরে মানুষ আকাশ দেখত কিংবা বাড়ির সামনে বাগান সমৃদ্ধ উঠোন, যেখানে আকাশের তারার মতো মিটমিট করে উড়তো জোনাকিরা। রাতের খাবার শেষে পায়চারি করতো বাড়ির লোকেরা। এরকম দৃশ্য ইতোমধ্যে বিলুপ্তপ্রায়। উঠোন আর বারান্দার জায়গায় এখন আরো একটি ভবন হয়তো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দশকে এরকম অনেক পরিবর্তন নিয়েই আজকের এই লেখা।

খেলার মাঠ

ঢাকার উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন দেখা যায় খেলার মাঠের দুষ্প্রাপ্যতার মাধ্যমে। চিরকালই কি ঢাকায় মাঠের শূন্যতা ছিল?

এই বিষয়ে বলেছেন মোঃ সজল আহমেদ, যিনি পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা। নিজের ছোট বেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সজল বলেন, "আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন ঢাকায় মাঠের অংশ এখন থেকে বহুগুণ বেশি ছিল। এলাকার শিশুরা সেখানে ক্রিকেট খেলতো, ফুটবল খেলতো। নারিন্দার এক ব্যাপারি মসজিদের পাশে কাবলিটোলা মাঠটি কমিউনিটি সেন্টার করার পরে এখন আগের তিনভাগের একভাগও অবশিষ্ট নেই।"

মোঃ সজল আহমেদ ডেফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন, বর্তমানে তিনি পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের ব্যবসা দেখছেন।

সজল তার পঁচিশ বছরের জীবনকালে ঢাকার যে পরিবর্তন দেখেছেন, তা ব্যক্ত করেছেন। বয়সে সজলের সাথে চল্লিশের অধিক পার্থক্য হলেও পুরান ঢাকার নারিন্দার অধিবাসী শওকত আলীও একই কথা ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি এই পরিবর্তন ‌দেখেছেন আরো প্রকট রূপে। প্রায় ষাট বছর আগের স্মৃতি তিনি এভাবে বলেন, "আমার ছোটবেলা কেটেছে লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ আর নবদ্বীপ বসাক লেনে। বন্ধুদের সাথে খেলার জন্যে মাঠের অভাব ছিল না। স্কুলের মাঠ, ভিক্টোরিয়া পার্ক (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক), ধূপখোলার ময়দান এসব জায়গায় ছিল আমাদের বিচরণ। চার আনার (২৫ পয়সার) বাদামে চলতো ভরপুর আড্ডা।"

তারই সমবয়সী, আশরাফ হোসেনেরও কথাতেও এর আভাস পাওয়া যায়। পেশায় তিনি একজন এসি মেরামতকারী, থাকেন শিরিশ দাস লেনে। তিনিও তার শৈশবের স্মৃতি পুঞ্জীভূত করেছেন অলিগলি ও টুকরো খেলার মাঠে। তিনি বলেন "আমি তখনও হাফপ্যান্ট পরি। এলাকার সব বন্ধুরা মিলে কয়েক আনা করে চাঁদা উঠিয়ে বাসার পাশের ধূপখোলা মাঠে খেলতে যেতাম। বর্তমানে মাঠের পরিবেশেও বিশাল পরিবর্তন আসছে।‌ খেলার মতো পরিবেশ নেই।"

বাসভবনে

ষাটোর্ধ্ব শওকত আরো বলেন, "তখন সাইকেল দিয়ে নারিন্দায় আসতাম ভুসি নিতে। তখন এই ধোলাই খালের রাস্তা ছিল না, ছিল খাল। তাছাড়া খেলার জন্য স্কুল মাঠ ছাড়াও অনেক জায়গা খালি পড়ে থাকতো। এখন একের পর এক অ্যাপার্টমেন্ট হওয়ায় এই জায়গাগুলো বাচ্চাদের থেকে কেড়েই নেয়া হয়েছে। আমাদের শ্যামাপ্রসাদ লেনের বাড়িটা বিক্রির পর এখন সেখানে ছয়তলা বাড়ি হয়েছে।"

সজল এ বিষয়ে বলেন, "আমিও লক্ষ করেছি যে, আগে এলাকাতে বেশিরভাগ বাড়িই ছিল দুই-তিন তলা। ঢাকার মানুষ তখন আকাশ দেখতে পেত। এখন আমরা আকাশ দেখতে পারি না। আমার নিজের বাসা সাততলা বিশিষ্ট কিন্তু আমার দেয়ালঘেঁষা যে কয়টা বাড়ি, এর মধ্যে দুটো নয়তলা ও একটি বারোতলা। সাততলায় থাকা সত্ত্বেও ছাদে উঠলে নিজেকে মনে হয় যেন গর্তে আছি।"

রাস্তাঘাট

"এই গলি (শিরিশ দাস লেন) বরাবর সোজা রাস্তাটিতে সাইকেল নিয়ে বন্ধুরা আসতো। একসাথে আড্ডা দিতাম, সুখে-দুখে পাশে থাকতাম। এখন আশেপাশের বিল্ডিংয়ে রাস্তাগুলো জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় আছে। একাত্তরে অনেকে মারা গেছে, কেউ বিদায় নিয়েছে আরো পরে"- কথাগুলো বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আশরাফ হোসেন।

ঢাকার রাস্তাঘাটের পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে শওকত জানান, "আমাদের এলাকা ছাড়াও নারিন্দা, ধোলাই খাল, এমনকি মতিঝিল, ফকিরাপুলের রাস্তাও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যেই মতিঝিল আর ফকিরাপুল এখন চওড়া রাস্তা সমৃদ্ধ আমার শৈশবে তা ছিল গাছপালায় পরিপূর্ণ। ফুফুর বাসায় থাকতে গেলে তখন রাতে শেয়ালের মতো ডাক শুনতাম, আসলেও শেয়াল ছিল কি না, জানি না। তাছাড়া নারিন্দা যেতে হলে ধোলাই খাল হয়ে যাওয়া লাগতো। তখন এখানেও খাদ ছিল, আমি পুল পাড়ি দিয়ে আসতাম।"

তাঁদের চোখে পরিবর্তন

বাড়ি-ঘর, খেলার মাঠ ও রাস্তা-ঘাটের এই পরিবর্তনকে তারা কেউই ভালোভাবে দেখেননি। শওকত আলী ও আশরাফ হোসেন দুজনই এর নেতিবাচক দিককে প্রাধান্য দিয়েছেন। শওকত বলেছেন, ঢাকায় এখন হাঁটার মতো রাস্তা নেই। অপরদিকে আশরাফ বলেছেন, "অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবস্থা ব্যক্তিগত সময় যাপনের জন্য খুবই ভালো, কিন্তু এর মাধ্যমে নিজেদের মাঝে অনেক দূরত্ব চলে এসেছে। এখনকার বাচ্চারা বাসায় মেহমান আসলে তাদের সামনেও যেতে চায় না। তারা তাদের মতো থাকে, আমরা আলাদা হয়ে থাকি।"

একই সুরে সজল বলেছেন, "আমি এই পরিবর্তনকে নেতিবাচকভাবেই দেখি। কেননা, আগে বাসার পাশে জায়গা থাকায় লোডশেডিং হলে বৃদ্ধ থেকে‌ শুরু করে বাচ্চারা সবাই রাস্তায় নামতো। বড়রা আড্ডা দিত, একে অপরের খোঁজ নিত, আমরা বাচ্চারা খেলতাম। এখন সবার জন্য হয়েছে পৃথক ইউনিট, ফলে দূরত্ব এসেছে আমাদের সম্পর্কে। এখন আমি নিজেও জানি না, আমার বাসার তিনতলায় যারা থাকেন, তাদের হাল-হকিকত কী।"

ঢাকার এই পরিবর্তন বর্তমান প্রজন্মের উপরেও প্রভাব বিস্তার করেছে। খেলার মাঠ নেই, আর যা আছে, তাও দূরে। মা-বাবা দূরে বাচ্চাদেরকে খেলতে দিতে চান না। খেলতে যেতে না পেরে তাই আক্ষেপ করে বসে থাকে অষ্টম শ্রেণীর দুই বন্ধু ফারহান আর শ্রাবণ।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছেন।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like