ইংল্যান্ডের একজন তরুণ আইনজীবী জনাথন হারপার। ব্যাবসার কাজে তাকে যেতে হয় ট্রানসিলভেনিয়ায়, মধ্য রোমানিয়ার পাহাড়ে ঘেরা এক রাজ্যে। সেখানে কাউন্ট ড্রাকুলা নামের এক ব্যাক্তির সাথে সাক্ষাত হয় তার।
এক বিশাল দূর্গের মালিক এই ব্যাক্তি। সৌভাগ্যক্রমে সেখানেই হয়ে যায় থাকার ব্যাবস্থা। পরবর্তীতে জনাথন বুঝতে পারেন কাউন্ড ড্রাকুলা আসলে এক রক্তপিপাসু ভ্যাম্পায়ার। জীবন বাঁচাতে হলে তার এখান থেকে পালাতে হবে।
ব্র্যাম স্টোকারের লেখা ড্রাকুলা উপন্যাসটি বের হয় ১৮৯৭ সালে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জনাথন হারপার, যাকে লড়তে হয়েছিল রক্তপিপাসু কাউন্ট ড্রাকুলার সাথে। হরর প্রেমীদের কাছে প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করে এই ড্রাকুলা চরিত্রটি। অনেকগুলো সিনেমাও নির্মিত বিখ্যাত এই চরিত্রটি নিয়ে।
ভ্যাম্পায়ার হলো পশ্চিমা লোককাহিনীর এক পিশাচ। এরা সাধারণত মানুষের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। কথিত আছে, ভ্যাম্পায়াররা দিনের আলো সহ্য করতে পারে না। রাতের আঁধারে এরা শিকারে বের হয়।
বলে হয় ব্র্যাম স্টোকার নিজে এই ড্রাকুলা চরিত্রটি তৈরি করেননি। রোমানিয়ার এক রাজপুত্র ভ্লাদ দা থার্ড, যাকে বলা হতো ‘ভ্লাদ দা ইম্পেলার’, তার থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই বিখ্যাত চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন। রোমানিয়ান ভাষায় ড্রাকুলা শব্দের অর্থ শয়তান।
ভ্লাদ দা থার্ড কে ‘ইম্পেলার’ বলার কারণ সে মানুষকে অভিনব উপায়ে হত্যা করতো। তার হত্যার পদ্ধতি ছিল খুবই নিষ্ঠুর। মানুষের পশ্চাৎ দিয়ে বর্ষা ঢুকিয়ে তা সামনে দিয়ে বের করে আনা হতো। অসহ্য যন্ত্রনায় মানুষটির মৃত্যু হতো। এই যন্ত্রনা সে উপভোগ করতো। তার এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পেত না নারী ও শিশুরাও।
কে এই ভ্লাদ দা থার্ড?
ভ্লাদ দা থার্ড ছিলেন ওয়ালেসিয়ার (বর্তমান রোমানিয়া) রাজা ভ্লাদ দা ড্রাকুল এর সন্তান। সেই হিসেবে ভ্লাদ দা থার্ডকে বলা হতো ড্রাকুলা বা ড্রাকুলের ছেলে।
তখন ইউরোপের অটোমান সাম্রাজ্য ছিল ক্ষমতার তুঙ্গে। অটোমানদের সুলতান ছিলেন মুরাদ দা সেকেন্ড। ওয়ালেসিয়ার রাজা ভ্লাদ দা ড্রাকুল অটোমানদের সাথে সম্পর্ক রক্ষার জন্য তার দুই ছেলে রাদু ও ভ্লাদকে সুলতান মুরাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখনে তারা অটোমান রাজপ্রাসাদে সুলতান মুরাদের পুত্র মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল ফাতিহ) এর সাথে বেড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে অনেক সখ্যতা তৈরি হয়ে যায়।
ছোট ভাই রাদু ঠিক থাকলেও ভ্লাদের মধ্যে শৈশব থেকেই নিষ্ঠুরতার ছাপ লক্ষ করা যেত। সে নিষ্ঠুর উপায়ে পশুপাখি হত্যা করে আনন্দ পেত। তখনো কেউ জানতো না, অটোমান রাজপ্রাসাদে বেড়ে ওঠা এক যুবক ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম শাসকে পরিণত হবে।
১৪৪৭ সালে ভ্লাদ দা ড্রাকুল আততায়ীর হাতে নিহত হন। হত্যাকারীরা ওয়ালেসিয়া দখল করে নিয়ে যায়। ১৪৪৮ সালে অটোমানদের সহায়তায় ভ্লাদ দা থার্ড তার পিতারর হারানো রাজ্যে আক্রমণ করে এবং জয়ী হয়। সে নিজেকে ওয়ালেসিয়ার রাজা ঘোষণা করে।
ভ্লাদ দা থার্ড ওয়ালেসিয়ায় কঠিন সব নিয়ম কানুন চালু করে। তার রাজ্যে কেউ মিথ্যা কথা বললে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো। ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ ছিল। রাজ্যের সকল ভিক্ষুকদের ধরে ধরে হত্যা করা হতো। চোর ডাকাতদেরও মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো। তার ভয়ে ওয়ালেসিয়ায় কখনো চুরি হতো না।
ভ্লাদ দা থার্ড তার পিতার খুনিদের শায়েস্তা করার জন্য ওয়ালেসিয়ার অভিজাত পরিবারের ২০০ জন ব্যাক্তিকে এক ভোজ সভায় নিমন্ত্রণ করে। পরিপূর্ণ আপ্যায়নের পর এদের সবাইকে একসাথে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হয়।
এখান থেকেই শুরু হয় ভ্লাদ দা ড্রাকুলার এর হত্যাযজ্ঞ।
তার সময় ওয়ালেসিয়ায় সেক্সন নামের জার্মান অভিবাসীরা বসবাস করতো। ১২০০ সালে হাঙ্গেরি জার্মানি আক্রমণ করলে সেক্সনরা ওয়ালেসিয়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু ভ্লাদ দা ড্রাকুলা তাদেরকে ওয়ালেসিয়ার শত্রু হিসেবে ঘোষণা করলো। প্রায় ত্রিশ হাজার সেক্সনকে হত্যা করা হলো। সেক্সনদের পুরো গ্রামকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল।
সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ ও ড্রাকুলা
এদিকে মুরাদের পর অটোমানদের নতুন সুলতান হন মুহাম্মদ। তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করার পর তাকে ‘মুহাম্মদ আল ফাতিহ’ বলা হতো।
সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ ড্রাকুলার সাথে মিত্রতার খাতিরে ৩০০ যুবককে কিছু উপহার সমেত ওয়ালেসিয়ায় পাঠান।
তাদের মাথায় ছিল পাগড়ি। ড্রাকুলা তাদের পাগড়ি খুলে ফেলতে বললে তারা অস্বীকৃতি জানায়। ড্রাকুলা তাদের সবাইকে হত্যার নির্দেশ দেয়। তাদের শিরশ্ছেদ করে মাথা সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ড্রাকুলার এই আচরণের পেছনে সঠিক কোনো কারণ খুজে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার পর থেকেই অটোমানদের সাথে তার যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
মুহাম্মদ আল ফাতিহ তাকে দমন করার জন্য বেশ কয়েকবার বাহিনী প্রেরণ করে ব্যর্থ হন। এতে দুই পক্ষেরই অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
১৪৬২ সালে সুলতান মুহাম্মদ নব্বই হাজার সেনাবাহিনীর একটি দল নিয়ে ড্রাকুলাকে তাড়া করেন। এত বড় বাহিনীর সাথে মোকাবেলা সম্ভব না জেনে ড্রাকুলা পিছু হটতে বাধ্য হয়। যাওয়ার পথে সেই অঞ্চলের প্রায় তেইশ হাজার বন্দিকে একসাথে শূলে চড়িয়ে রেখে যায়। অটোমানরা যখন এসে পৌছায় তখন নারী ও শিশু সহ প্রায় বিশ হাজারের মানুষের অর্ধ গলিত মৃতদেহ শূলে বিধিয়ে রাখা হয়েছিল। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে সুলতান বাকরুদ্ধ হয়ে যান।
এরপর দীর্ঘদিন ড্রাকুলার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। জানা যায়, সে ১২ বছর হাঙ্গেরিতে কারাবন্দি অবস্থায় ছিল।
কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর সে পুনরায় তার সহজাত প্রবৃত্তিতে ফিরে আসে। অটোমান সীমান্তের এক জনপদ আক্রমণ করে প্রায় আট হাজার মানুষকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করে ড্রাকুলা বাহিনী।
১৪৭৬ সালের ডিসেম্বরে সুলতান ড্রাকুলাকে দমন করার জন্য আলী বে এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। ড্রাকুলা তখন তার বাহিনী নিয়ে ভোজের আয়োজনে ব্যাস্ত। অটোমানদের অতর্কিত আক্রমণে তার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ড্রাকুলা তার বাহিনী সমেত নিহত হয়। তার মাথা সুলতান মুহাম্মদের কাছে উপহার স্বরূপ পাঠিয়ে দেয়া হয়।
ড্রাকুলার কাটা মাথা শূলে গেঁথে ইস্তাম্বুলের সদর দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল ছয় মাস।
ধারণা করা হয়, ড্রাকুলা তার সারাজীবনে প্রায় ৮০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল।
বিশ্ববাসী ভ্লাদ দা ড্রাকুলাকে একজন রক্তপিপাসু হিসেবে দেখলেও রোমানিয়ানদের কাছে এখনো সে একজন বীর হিসেবেই পরিচিত। কারণ সে নিষ্ঠুর উপায়ে হলেও তার মাতৃভূমিকে রক্ষা করেছিল।
সাজিদ আল মাহমুদ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
shajidmahmud11@gmail.com
