রাশিয়ার সংসদের নিম্নকক্ষ ডুমার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া দল নিজ সংখ্যাশক্তি ধরে রেখেছে। কিংবা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষায়, নির্বাচনে ‘নেতৃত্বের প্রতি ভরসা পুনরায় ব্যক্ত হয়েছে।’
ডুমার ৪৫০ আসনের মধ্যে অর্ধেক দলভিত্তিক এবং বাকি অর্ধেক একক প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে রাশিয়া ইউনাইটেড দলভিত্তিতে ৪৯.৮২ শতাংশ ভোটে এবং একক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১৯৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ফলে ডুমার ৩২৪ আসন কব্জা করেছে ইউনাইটেড রাশিয়া।
নির্বাচনের আগেভাগে ইউনাইটেড রাশিয়ার জনপ্রিয়তা গলে ৩০ শতাংশে নেমে আসে। তা সত্ত্বেও পাঁচ বছর আগের নির্বাচনের মতোই সাফল্য আবার দেখাতে পারল এ দল। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে ইউনাইটেড ৩৪০টির বেশি আসন এবং ৫৪.২ শতাংশ ভোট জয় করেছিল।
তারপরও নির্বাচনের এ ফলাফলকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ ক্রিমিয়াকে রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করায় রুশ জনমতে ইউনাইটেড পার্টির পক্ষে যে জোয়ার ডেকেছিল গত নির্বাচনের আগে তাতে ভাটার টান লাগেনি। কিংবা অবসর নেওয়ার বয়স বাড়ানোর মতো জনপ্রিয়তাহীন সিদ্ধান্তও তখনো নেয়নি ক্রেমলিন সরকার।
এবারে নির্বাচনের বিজয় উৎসব পালনের মতো যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। কিন্তু সে উৎসব দেখা যায়নি। ইউনাইটেড রাশিয়া দলের নেতা প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ নির্বাচনী রাতে দলীয় সদর দফতরে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি ভিডিও লিংকের মাধ্যমেও দলের সদস্যদের নির্বাচনে বিজয়ের শুভেচ্ছা পর্যন্ত জানাননি তারা। পুতিনও শুভেচ্ছা জানাননি। অথচ খবরের পাতা উল্টালেই দেখা যাবে, ইউনাইটেড রাশিয়ার পক্ষে উদয়াস্ত নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন তিনি। গত দুই সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর দলটির সদর দফতরে হাজিরও হয়েছেন পুতিন। এদিকে ইউনাইটেড রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক নেতা দিমিত্রি মেদভেদভও সদর দপ্তরে ছিলেন না। (রোগে ভুগছেন, তাই তিনি যেতে পারেননি বলে ধারণা হচ্ছে।)
সমস্যা হলো ক্রেমলিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোষ্ঠী নির্বাচনী প্রচারকে গৎবাঁধা ছকে বেঁধে ফেলছে। তারা দলীয় নয় বরং একক প্রার্থীদের জোরে নির্বাচনে সংখ্যাশক্তি অর্জনের লক্ষ্য তুলে নিয়েছে। তবে একক প্রার্থীরা হলেনে স্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং মানবাধিকার কর্মী। অন্যদিকে দলীয় প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন পুতিন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তারা। ৫০ শতাংশের কম ভোট তাদের কাম্য নয়।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ফল নিয়ে এখানেই খদ্দের বা গ্রাহক (প্রেসিডেন্ট) এবং ঠিকাদার (অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোষ্ঠী)’র মধ্যে মত-ভিন্নতা গড়ে উঠেছে। ডুমায় দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠততা বা সংখ্যাশক্তি বজায় রাখার চাহিদা এক বছর আগেই তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট।
রাশিয়ার ফার্স্ট ডেপুটি চিফ অব স্টাফ সের্গেই কিরিয়েনকো বলেন, ৪৫ শতাংশ ভোট পাওয়াই হবে ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রধান কৃতি সূচক বা কেপিআই। একক প্রার্থীদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংখ্যাশক্তি অর্জন করা যাবে বলেও জানান তিনি। রুশ জনগণের ৩০ শতাংশ যখন ইউনাইটেড রাশিয়াকে সমর্থন করছে সে পটভূমিতে ভোটের হিসাবে ৪৫ শতাংশকে উচ্চ সফলতা বলতে হবে। কিন্তু বিরোধী ভাবাপন্ন রুশরা মনে করেন ৪৫ শতাংশকে মোটেও জৌলুসময় মনে হচ্ছে না। বরং মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তিদায়ক সংখ্যা ৫০ শতাংশের চেয়ে তা কম হচ্ছে।
এবারের ডুমা নির্বাচনে রাজধানী মস্কোতে কর্তৃপক্ষ অনলাইন ভোট দেওয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। রাষ্ট্রকর্মীদের অনলাইনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলকই হয়ে দাঁড়ায়। ফল হয় যে মস্কোর এক তৃতীয়াংশ ভোটই দেওয়া হয় অনলাইনে। অনলাইন ভোটের ফল যখন প্রকাশ করা হচ্ছিল তখন জালিয়াতি হয়েছে বলে ধারণা সৃষ্টির বিস্তর অবকাশ দেখা দেয়। রাষ্ট্রনির্ভর ভোটারদের নিয়ন্ত্রণে উল্টা বুঝলি রামের মতো এ পরিস্থিতি ডেকে আনে। অনেকটা অনুগত অভিধায় আখ্যায়িত কম্যুনিস্ট পার্টিই কেবল অনলাইন ভোট পুনঃগণনার দাবি তুলেছে। এ ছাড়া, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় কোনো প্রতিবাদ ঘটেনি।
ইউনাইটেড রাশিয়ার নির্বাচনী পর্বটি পুতিনের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া উতরানো সম্ভব হলে হয়ত ভালো হতো। প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠ মহল কাঙ্ক্ষিত ফল লাভের প্রত্যাশায় এ পদ্ধতির দিকে চোখবন্ধ রাখতে পারতেন।
এখন এগিয়ে যেতে হলে ক্রেমলিনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপকদেরকে হয় তাদের কাজ নেতৃত্বের তৈরি করে দেওয়া আদর্শ রেখার কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। আর না হয়, প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য তাদের সর্বপ্রচেষ্টাকে নিয়োজিত করতে হবে।
এবারের নির্বাচনে নিউ পিপলস পার্টির সফলতা এ দিকটাই তুলে ধরছে। ডুমায় আসন পেতে হলে শতকরা ৫ শতাংশ ভোটের দ্বার পেরোতে হবে। এ দলটি সে কাজে সফল হয়েছে। বহু বছরের মধ্যে এবার প্রথম ডুমায় পাঁচ দলের দেখা মিলবে। উল্লেখযোগ্য নেতা বা সমন্বিত আদর্শহীন নাম সর্বস্ব রাজনৈতিক দলকে অনেক রুশ নাগরিক ভোট দিয়েছেন। ভোট দিয়ে বেশ উৎফুল্লই বোধ করছেন তাঁরা।
অন্যদিকে ৫ শতাংশের বিধান ক্রেমলিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত পুরানো দলগুলোর কাছে ‘দুর্গম গিরি কান্তর মরু দুস্তর’ পারবার মতোই হয়ত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এতে মনে হচ্ছে, দলীয় ব্যবস্থাপনাকে বিপণন প্রকল্পের মতো গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে শ্লোগান বা পণ্যের মোড়ক বদলে দেওয়া যেতে পারে। এমনকি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্যও আনা যায়। জনপ্রিয়তা পেতে প্রয়োজন বুঝে, টিভি সঞ্চালক, নট-নটী বা সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মীদেরও নামানো যেতে পারে।
একই কথা খাটে ইউনাইটেড রাশিয়ার বেলায়ও। বিপণন প্রতিযোগিতার আদল নেবে রাজনীতি। প্রেসিডেন্ট সেখানে ব্যক্তিগত ভাবে পণ্য বিপণনের লড়াইয়ে অংশ নেবেন না। বরং তিনি সংসদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাশক্তি পেয়েই তৃপ্ত থাকবেন।
কিন্তু পুতিন মনে হয় গ্রাহক বা খদ্দেরের এমন আঁটসাঁট পোশাকে সীমিত থাকতে ইচ্ছুক নন। তিনি আগের মতোই একচ্ছত্র নেতা হওয়ার অভিলাষ পুষছেন। কারণটিও কারোই বোধের অগম্য নয়। ব্যবস্থাপকরা যে কোনো গ্রাহকের সেবাই নিয়োজিত হতে পারে। কিন্তু নেতার ভূমিকা হলো তর্কাতীত।
প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর প্রশাসন এ কারণেই এবারের ডুমার নির্বাচনকে ভিন্ন আলোয় দেখছেন।
[দ্য মস্কো টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]
