ডুবে যাওয়া ফেরি শাহ আমানতের মেয়াদ ফুরিয়েছিল আগেই


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: October 28, 2021 10:11:21 | Updated: October 28, 2021 16:33:42


ছবিঃ ফোকাস বাংলা

পাটুরিয়ায় দুর্ঘটনায় পড়েছিল যে শাহ আমানত, ফেরি হিসেবে এর মেয়াদই ফুরিয়ে গেছে।

গত শতকের ৮০ এর দশকে ডেনমার্ক থেকে আনা রো রো ফেরিটি বিআইডব্লিউটিসির বহরে যুক্ত হয়।

এর মেয়াদ ৩০ বছর হলেও মেরামতের পর তা ১০ বছর বেড়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তারা।

তবে এভাবে মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলে মত দিচ্ছেন বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুবায়ের ইবনে আউয়াল, যিনি এই দুর্ঘটনা তদন্তে সরকার গঠিত কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যানবাহন নিয়ে বুধবার সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর পাটুরিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল শাহ আমানত। পদ্মা পার হয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পরপরই সেটি কাত হয়ে নদীতে উল্টে যায়।

৮০০ টন ওজনের শাহ আমানত ফেরি ২৫টি যানবাহন বহন করতে পারে। দুর্ঘটনার সময় ফেরিতে ছিল ১৭টি ট্রাক, একটি প্রাইভেটকার ও আটটি মোটরসাইকেল। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

বাংলাদেশের ইতিহাসের রো রো ফেরির এভাবে দুর্ঘটনা পড়া এটাই প্রথম বলে জানালেন বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এই ফেরিটি পুরনো এটা সত্য। তবে এর আগে কখনও রো রো ফেরি এরকম দুর্ঘটনায় পড়েনি।

বিআইডব্লিউটিসির উপপরিচালক (জনসংযোগ) নজরুল ইসলাম মিশা জানান, ১৯৮০ সালে শাহ আমানতসহ আটটি রো রো ফেরি ডেনমার্ক থেকে আনা হয়েছিল।

তাজুল বলেন, এমনিতে একটি ফেরির ইকোনমিক লাইফ ৩০ বছর। এই ফেরির (শাহ আমানত) সার্ভিসে আসার বয়স ৩৫ বছরের ওপরে।

তবে এগুলো অনেক শক্ত পোক্ত, তাই মন্ত্রণালয় এগুলো অতিরিক্ত ১০ বছর ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিল।

এ বছরে জুলাই মাসে ডক থেকে শাহ আমানত ফেরিটির টুকটাক মেরামত হয়েছিল জানিয়ে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক মো. আশিকুজ্জামান বলেন, এর ফিটনেসে কোনো ত্রুটি নেই।

বুয়েটের শিক্ষক জুবায়ের বলেন, সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদ হলেই তা (ফেরি) বাদ দিতে হয়। আপাতত মনে হচ্ছে ফেরিগুলো তো অনেক পুরনো।

মেরামতের পর ১০ বছর মেয়াদকাল বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, মেরিনে এমন কোরো রিকভারি টার্ম নেই যে মেরামত করে ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানো যায়।

কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ফেরিটি যাত্রা শুরুর পরপরই এতে পানি উঠেছিল।

বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক আশিকুজ্জামান বলেন, ভেতরে পানি ঢুকলে তো ফেরি ঘাটে আসতে পারত না, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেত। আবার এভাবে কাত হয়ে যাওয়ায় মনে হচ্ছে ভেতরে পানি ঢুকছে হয়তো। কিছুই বুঝতে পারছি না।

ফেরি ছাড়ার আগে তার ফিটনেস যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকে জানিয়ে বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিটা ফেরি যানবাহন নিয়ে ছাড়ার আগে একবার করে চেক করার নিয়ম রয়েছে। এই ফাইলটি ছাড়ার আগে নিয়ম মেনে চেক করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করবে এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত দল।

এই নৌ দুর্ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিআইডব্লিউটিসি, যার আহ্বায়ক করা হয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুলতান আব্দুল হামিদকে।

বুয়েট শিক্ষক জুবায়ের ছাড়া কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকছেন-বিআইডব্লিটিএএর পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন সাইদ আহমেদ, ফরিদপুর অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন ও বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম।

এই কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

পানি উঠছিল আগে থেকে

ফেরিতে থাকা ট্রাকচালক ও মালিকরা ফেরিতে আগেই পানি ওঠার কথা বলছেন।

ফেরিতে ডুবে থাকা আফজাল সার্ভিসেস নামে একটি সংস্থার কভার্ড ভ্যানচালক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ফেরিটি দৌলতদিয়া ছাড়ার কিছুক্ষণ পর পাটাতনে পানি দেখতে পান তিনি। তখন তিনি ভেবেছিলেন হয়ত তার ট্রাকের রেডিয়েটার ফেটে পানি বেরিয়েছে।

পরে তিনি হেলপারকে জানান, হেলপার এসে জানায় রেডিয়েটর ফাটেনি, ফেরির বাম পাশ থেকে ডান পাশ পানি গড়িয়ে যাচ্ছে।

তখন ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি সেলিম। ফেরি ঘাটে ভেরার আগে ট্রাকের লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে দেখেন পেছনে অনেক পানি। ফেরির চালক সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফেরিটি পাটুরিয়া ঘাটে ভেড়ায়। দ্রুত তিনটি ট্রাক নেমে যায়। চতুর্থ ট্রাকটি ছিল সেলিমের। কিন্তু ডুবতে থাকা ফেরির সঙ্গে সেলিমের ট্রাকের একটা অংশও শেষমেশ ডুবে যায়।

কাত হয়ে উল্টে যাওয়া শাহ আমানত ফেরি এবং এতে থাকা যানবাহনগুলো উদ্ধারে কাজ করছে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। গতকাল বিকেল পর্যন্ত হামজা দুটি ট্রাক টেনে তুলতে সক্ষম হয়।

বিআইডব্লিউটিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, মূল সমস্যাটা হচ্ছে ফেরিটিকে উদ্ধার করা। পানি ঢুকে পেটের ওজন হাজার টনের বেশি দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু হামজার সক্ষমতা মাত্র ৬০ টন।

দেশে ৫৫টি ফেরি

বিআইডব্লিটিসির উপপরিচালক নজরুল ইসলাম মিশা জানান, দেশে ১৪টি রো রো ফেরিসহ মোট ৫৫টি ফেরি রয়েছে।

এর মধ্যে মাঝারি ফেরি রয়েছে ১৪টি, ডাম্ব ফেরি ৮টি, ইউটিলিটি ফেরি ৯টি, মিনি ইউটিলিটি ফেরি ২টি, ছোট ফেরি ৪টি। ফেরি টানার জন্য ১০টি টাগবোটও রয়েছে।

নজরুল জানান, ১৯৮০ সালে শাহ আমানতসহ আটটি রো রোর ফেরি ডেনমার্ক থেকে এসেছিল। চীন থেকে আসে দুটি। বহরের বাকি ফেরিগুলো দেশে তৈরি।

আশিকুজ্জামান জানান, রো রো ফেরির মধ্যে শাহ আমানত ছাড়াও বরকত, শাহ আলী, খান জাহান আলী, শাহ মখদুম, কেরামত আলী, এনায়েতপুরী, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন, বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, ভাষা সৈনিক গোলাম মাওলা পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে চলাচল করে। এছাড়া এই রুটে আর ১১টি মাঝারি আকারের ফেরি চলে।

এছাড়া আরিচা-কাজিরহাট রুটে মাঝারি আকারের ১২টি ফেরি চলাচল করে।

Share if you like