ভুট্টার উপকারিতা নিয়ে কোনো সন্দেহ সচরাচর থাকে না। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভুট্টা উপকারী কি না কিংবা কতটা উপকারী তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। ভুট্টা যেহেতু শর্করা জাতীয় খাবার তাই অনেকেই মনে করেন যে হয়তো ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এর খারাপ প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু গবেষণায় উঠে এসেছে যে ভুট্টা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী।
প্রতি ১০০ গ্রাম ভুট্টায় ১৯ গ্রাম শর্করা, ২ গ্রাম ফাইবার, ৩ গ্রাম প্রোটিন, ১.৫ গ্রাম এর কম ফ্যাট এবং ৮৬ ক্যালোরি থাকে। এছাড়া ভুট্টায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে যা রক্তের লোহিত কণিকার প্রয়োজনীয় খনিজের চাহিদা দূর করে।
ভুট্টার উচ্চ পুষ্টিগুণ এবং এতে কম ক্যালরি থাকার কারণে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে হ্রাস করে। এটি রক্তের শর্করার পরিমাণ কমায় বলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
এ ব্যাপারে খুলনা মেডিকেল কলেজের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডাঃ মুহাম্মাদ আলী সিদ্দিকী বলেন, “ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রক্তের ব্লাড স্যুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই আমাদের প্রতিদিনের খাবার-দাবার কিভাবে আমাদের রক্তের শর্করা বা ব্লাড স্যুগারের উপর প্রভাব ফেলে তা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এটা জানার জন্য আমাদের খাবারের গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (জিআই) বুঝতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (জিআই) এর উপর ভিত্তি করে মূলত খাবারকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। গ্লাইসেমিক সূচকের মান ৫৫ এর নিচে থাকলে সেসব খাবারকে নিম্ন গ্লাইসেমিক খাদ্য বলে যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সবচেয়ে উপকারী। আর ভুট্টার জিআই মাত্র ৫২। কিন্তু ভুট্টা দিয়ে তৈরি অন্যান্য খাবার যেমন কর্নফ্লেক্স এর গ্লাইসেমিক সূচক ৮১, আর গ্লাইসেমিক সূচক ৭০ এর উপরে যে কোনো খাবার কে উচ্চ গ্লাইসেমিক খাদ্য হিসেবে ধরা হয়। আবার পপকর্নের গ্লাইসেমিক সূচক ও ৬৫। আর ৫৬ থেকে ৬৯ জিআই এর খাবারগুলোকে মধ্যম গ্লাইসেমিক খাদ্য হিসেবে ধরা হয়। তাই ভুট্টা যে কোনো ভাবে খেলেই যে ডায়াবেটিস রোগীদের ঝুঁকি কমে যাবে তা ঠিক নয়।“
মূলত উচ্চ জিআই সমৃদ্ধ খাবারগুলো রক্তে দ্রুত শর্করা উৎপন্ন করে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের নিম্ন জিআই সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিৎ। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভুট্টা খুব বেশি উপকারী বলে মনে করেন না অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। কিন্তু কোনো সন্দেহ ছাড়াই টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভুট্টা খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করে। তবে টাইপ-১ এবং টাইপ-২ উভয় ডায়াবেটিস রোগীরাই ভুট্টা খেতে পারেন।
সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভুট্টার মত খাবার যেগুলোতে ফ্ল্যাভোনয়েডের পরিমাণ বেশি থাকে সেগুলো ডায়াবেটিসের মত দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়। গবেষণায় আরও দেখা যায় যে প্রতিদিন প্রায় ১০ গ্রামের মত ভুট্টা খেলে তা রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও প্রতিদিন নিয়মিত ভুট্টা খেলে হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় এবং স্থুলতা হ্রাস করে। এছাড়া এই গবেষণায় ভুট্টার আরও নানা উপকারী দিক উঠে এসেছে।
কিন্তু টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ভুট্টা সমানভাবে উপকারী ভূমিকা পালন করতে পারে না। এর কারণ হলো টাইপ-১ ডায়াবেটিস একটি জিনগত সমস্যা আর তাই এই ডায়াবেটিস রোগীদের দেহে ইনসুলিন তৈরি হয় না বললেই চলে। আর তাই ভুট্টা এ রোগীদের রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে না।
ভুট্টা অত্যন্ত উপকারী হলেও ব্যবহারের উপর এটা ক্ষতিকরও হয়ে উঠতে পারে। বাইরে অস্বাস্থ্যকর তেলে ভাজা পপকর্ন কিংবা মিষ্টি কর্ন সিরাপ ডায়াবেটিস রোগীদের উল্টো ক্ষতি করতে পারে। তাই ভুট্টা খেতে হবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে যাতে এর খাদ্যগুণ অটুট থাকে।
সাধারণত ভুট্টা বাসায় রান্না করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। অল্প তেলে ভুট্টা ভাজা যেতে পারে। তবে সয়াবিন তেল না ব্যবহার করে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা উচিৎ। সাথে এটাও খেয়াল রাখতে হবে লবণ কিংবা চিনি যাতে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা না হয়।
সঠিক নিয়ম মেনে নিয়মিত এবং পরিমাণমত ভুট্টা ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়েটে যোগ করলে এ রোগের ঝুঁকি কমে যায়। একজন সুস্থ মানুষ ও প্রতিদিন যদি নিয়মিত ভুট্টা খায় পরিমাণমত (প্রতিদিন ১৫-২০ গ্রামের মত) তাহলে তার টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি কমে যায়।
মোঃ ওমর ফারুক তপু খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com
