এক স্বামী তার স্ত্রীকে প্রতিদিন আঘাত করে, অত্যাচার করে। কখনো খাবারে লবণ কম হলে, কখনো তার কথা মতো না চললে অর্থাৎ স্ত্রী তার ইচ্ছানুযায়ী কিছু করলেই গায়ে আঘাত, মুখে তিরষ্কার আর ভর্ৎসনা করে তথাকথিত ‘স্বামী’। এসবের প্রতিবাদস্বরূপ স্ত্রী কী করতে পারেন? তিনি কি আইনী ব্যবস্থা নিবেন নাকি নিজে ওই সব আঘাত তার স্বামীকে ফিরিয়ে দিবেন যা তিনি এতোদিন যাবত সহ্য করে আসছেন? এই প্রশ্নগুলোর তুলনামূলক বিভিন্ন আঙ্গিকে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছে বলিউড সিনেমা ডারলিংস।
প্রেক্ষাপট ও চরিত্র
ডারলিংস সিনেমাটি বোঝার জন্য এর গল্প বোঝা জরুরি।
মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেনীর স্ত্রীদের প্রতিনিধত্ব করে বদরুন্নেসা। বদরুন্নেসর চরিত্রে অভিনয় করেন আলিয়া ভাট। সিনেমায় বদরুন্নেসা একজন শক্তিশালী নারী যিনি এটুকু বোঝেন যে অন্যায় সহ্য করা মানে অন্যায়কে লালন করা। শুধু তাইই নয়, প্রতিবাদের ভাষাস্বরূপ তিনি যে প্রলয়ঙ্কর রূপ ধারন করতে পারে হয়তো এটিও তার চরিত্রের বাস্তবতার অংশ।
সিনেমায় হামজার চরিত্রে অভিনয় করেন বিজয় ভার্মা। এই হামজার পরিচয় কী?
হামজার পরিচয় সে একসময়ের বদরুন্নেসার প্রেমিক। তার প্রথম পরিচয় একজন প্রেমিক, দ্বিতীয় পরিচয় সে সরকারি চাকুরীজীবি। তবে হামজার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সে একজন নির্যাতক।
তার পরিচয় সে স্ত্রী বদরুন্নেসার গায়ে কথায় কথায় হাত তোলে। পরের দিন হয় চকলেট নতুবা টেডি বিয়ার উপহার দিয়ে তার ঘৃণ্য অপরাধের দায় সারিয়ে ফেলে।
সিনেমায় এই দুই চরিত্র ছাড়া আরো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলেন শামসুন্নেসা। তিনি বদরুন্নেসার মা। এই চরিত্রে অভিনয় করেন শেফালী শাহ। মেয়ের কষ্টে মা কী করে শ্রেষ্ঠ অবলম্বন হতে পারে তা শামসুন্নেসাকে না দেখলে বোঝা যায় না। সিনেমায় তিনিই বদরুন্নেসাকে তৈরি করেন।
তালাক ও পুলিশের নিকট অভিযোগ করতে বলা হলে শামসুন্নেসা বুঝিয়ে দেন যে তাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য এসব বিলাসিতা। তবে তিনি বদরুন্নেসাকে মামলা করতেও উৎসাহ দেন। তার এই আচরণ সমাজে গৃহনির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধে সাধারণ নারীরা কতটা বঞ্চিত ও অবহেলিত তাই প্রকাশ পায়।
ডারলিংসের বক্তব্য কীভাবে ভিন্ন?
ডারলিংসের গল্প খোদ সিনেমার মূল বক্তব্যের সাথে কিয়দংশ সাংঘর্ষিক হয়। যেমন: সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করলে বদরু আর শামসু সিদ্ধান্ত নেয় হামজাকে অপহরণ করার। অপহরণ আসলে সমাজের দৃষ্টিতে। মূল উদ্দেশ্য তাকে বন্দী করে নিজের ওপর হওয়া সব অত্যাচারের ফিরতি দেয়া।
তবে এখানে সিনেমার গল্প বর্ননায় আছে বিশাল পার্থক্য যা ডারলিংসে ‘শুধুই প্রতিশোধ নেয়া’ থেকে আলাদা করে। আর এই পার্থক্য তৈরি করে কমেডি আর অত্যাচারিত হওয়ার দৃশ্যায়ন। আলিয়া ভাটের মুখভঙ্গি নিপীড়িত শ্রেনীর করুন অবস্থাকে যেমন ধারন করে একই সাথে তার ঘুরে দাঁড়ানো এবং ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে যে অন্তর তৈরি করে তা অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা মূলক।
গৃহনির্যাতন আর ভালোবাসার ফাঁদ বিছিয়ে একটি তিক্ত সম্পর্ক বজায় রাখার যে কৌশল আমাদের যাপিত জীবনে বিদ্যমান সিনেমায় তারই এক হাস্যরসাত্মক রূপ দেয়া হয় ডারলিংসে। সিনেমার খোঁচা দিয়ে বলা একেকটি সংলাপ মনে করিয়ে দেয় চারপাশের অসংগতিগুলো।
তবে কি হামজাকে অপহরণ করে নিজের সাথে হওয়া অত্যাচার ফিরত দেয়া অন্যায় নয়?
সিনেমায় বদরুন্নেসা হামজাকে হত্যা করতে চায় না। তার মতে সে যদি হত্যা করে, তাহলে হামজা আর তার মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না। কিন্তু বক্তব্যটি সিনেমার মূল ভাষার সাথে সাংঘর্ষিক।
হামজাকে বিচ্ছুর সাথে তুলনা করে বদরুন্নেসা বলে "আমি বিচ্ছু নই, আমি বিচ্ছু হতেও পারবো না। আজকে তাকে (হামজাকে) হত্যা করলে বাকি জীবন আফসোস হবে, তার স্মৃতি আমাকে তাড়া করে বেড়াবে।" সিনেমার এই অংশই ন্যায় আর অন্যায়ের মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করে। এছাড়া হামজাকে অপহরণ করে প্রতিশোধ নেয়ার দৃশ্যগুলো নিতান্তই কমেডির আদলে দেখানো। তারপরেও এখানে প্রশ্নটি থেকেই যায় আর তা হলো একটি অন্যায়কে আরকেটি অন্যায় দিয়ে ঢাকা তা সেটা যতই কমেডি হোক।
অস্পষ্টতা
মদ্যপ অবস্থায় স্ত্রীর গায়ে হাতে তুলে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে তাকে সম্পর্কে আটকে রাখা সমাজের একটি সাধারণ চিত্র। তবে হামজার চরিত্রের এমন রূপ ধারণ করলো কী করে?
তার চরিত্রের বিভিন্ন স্তরের ব্যাখ্যা, মদ্যপ হলে শুধু প্রহার নয় যেকোনো ধরনের দুর্ব্যবহার করা বৈধ হয়ে যায়; প্রচলিত এমন ধারনা যে ভুল সিনেমায় এটিও অস্পষ্ট। কর্মক্ষেত্রে হামজার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার সাথে যে ধরনের আচরণ করে তারও কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই সিনেমায়।
প্রাসঙ্গিকতা
গৃহনির্যাতনের মতো জঘন্য বিষয় কমেডির আবরণ দেয়া সিনেমার প্রাসঙ্গিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেননা বদরু ও শামসুর দেশের যে নিপীড়ত শ্রেনীকে প্রতিনিধিত্ব করে তারা গৃহ নির্যাতনকে হাস্যরসের খোরাক হিসেবে দেখে না।
যে নারী রাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে পরের দিন ওটিটি মাধ্যমে এই সিনেমাটি দেখবে তার কাছে কেমন লাগতে পারে এই চিন্তাটুকু হয়তো অনুপস্থিত ডারলিংসের কলাকুশলীদের মাঝে। এছাড়া আইনী সমাধানে না গিয়ে নিজেই শাস্তি দেয়ার ভূমিকায় যাওয়া কিছুটা হলেও এই গম্ভীর বিষয়টিকে খেলো করে তোলে।
ন্যায় কি অন্যায়, হামজা অপরাধী হলে বদরুন্নেসা কতটা নির্দোষ এসব কিছুই এক পাশে রেখে বলা যায়, পোশাক কমেডির হলেও ডারলিংসের বার্তা সুস্পষ্ট। নারী মানে দায়িত্ব ও মেকি ভালোবাসার জন্য অত্যাচারিত হওয়া নয় আর সমাজের বদরুন্নেসারা সবসময় অমাবস্যার চাঁদ নয়, পূর্ণিমার আলোও।
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে পড়াশোনা করছে।
imran.tweets@gmail.com
